সাদাছড়ি দেখেও থামে না গাড়ি, মেলে না কাজ
বাংলাদেশ কণ্ঠ ডেস্ক :
- আপডেট সময় : ০৭:০৮:০৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ১৭ বার পঠিত
জাহিদ হাসান ভূঁইয়া, গাজীপুর প্রতিনিধি:
ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন মুকলেসুর রহমান। শিক্ষকতা করেছেন, বই লিখেছেন, জীবিকার তাগিদে ছোট ব্যবসাও করেছেন। কিন্তু এত কিছুর পরও এখন তিনি বেকার। তাঁর অভিযোগ, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতা তাঁর যোগ্যতাকে বারবার আড়াল করে দিয়েছে; কর্মক্ষেত্রে জায়গা হয়নি প্রাপ্য মর্যাদারও। শিক্ষার প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর লড়াই চালানো এই মানুষটির সামনে এখন একটাই প্রশ্ন- যোগ্যতা অর্জনের পরও কাজের সুযোগ কোথায়?
ময়মনসিংহের ত্রিশালের বাণিয়াপাড়া গ্রামের মুকলেসুরের বয়স এখন প্রায় ৪৩ বছর। শৈশবে টাইফয়েডে আক্রান্ত হওয়ার পর আড়াই বছর বয়সে দৃষ্টিশক্তি হারান বলে জানান তাঁর পরিবার। দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন তিনি। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন। পরে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেছেন। তবু তাঁর জীবনের দীর্ঘ অধ্যায়ের শেষ প্রান্তে এসে স্থায়ী কর্মসংস্থানের বদলে জুটেছে অনিশ্চয়তা।
মুকলেসুরের ভাষ্য, ২০২৩ সালে টাঙ্গাইলের বিবেকানন্দ হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজে খণ্ডকালীন ইংরেজি সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দেওয়ার সুযোগ পান। মাসিক বেতন ছিল ১০ হাজার টাকা। কিন্তু যোগদানের পর থেকেই নানা বৈষম্যের মুখে পড়েন বলে অভিযোগ তাঁর। প্রথমে ইংরেজি পড়ানোর সুযোগ পেলেও পরে সেই দায়িত্ব থেকে সরিয়ে অন্য বিষয় পড়াতে বলা হয়। সহকর্মীদের কাছ থেকেও প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাননি বলে দাবি করেন তিনি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ আনন্দ মোহন দে পদত্যাগ করলে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ তাঁকে এবং অন্য খণ্ডকালীন শিক্ষকদের বাদ দেন বলে জানান মুকলেসুর। ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে তিনি বেকার।
তাঁর অভিযোগ, চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রেও বিভিন্ন সময় ঘুষ দাবি করা হয়েছে। এমনকি একটি নিয়োগের জন্য ১০ লাখ টাকা চাওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
মুকলেসুরের জীবনের গল্প শুধু চাকরি হারানোর নয়; কাজের সুযোগ খুঁজতে খুঁজতে বারবার নতুন করে শুরু করার গল্পও। একসময় বাসে চকলেট বিক্রি করেছেন। পরে ছোট কম্পিউটার, মোবাইল রিচার্জ ও বিকাশের দোকান চালিয়েছেন। নিজের জীবনের কথা নিয়ে লিখেছেন ‘আমার জীবনী’ বই। এখনো তাঁর স্বপ্ন-অভিনয়, গান কিংবা রাজনীতির মাধ্যমে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা এবং প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। কিন্তু স্বপ্নের পাশে দাঁড়ানোর মতো একটি স্থায়ী কাজই এখনো অধরা।
মুকলেসুরের এই লড়াইয়ের আরেকটি দৃশ্য দেখা যায় গাজীপুরের জয়দেবপুর রেলগেটে। হাতে সাদাছড়ি নিয়ে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী রাজু হোসেন। চারপাশে যানবাহন চলছিল, মানুষও পার হচ্ছিল; কিন্তু তাঁর নিরাপদে রাস্তা পার হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা মিলছিল না। সাদাছড়ি তাঁর দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতার পরিচয়, আবার চলাচলের স্বাধীনতারও প্রতীক। অথচ সেই ছড়ি দেখেও পথ যেন তাঁর জন্য সহজ হয় না।

