স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে ইউরোপের বাজারে বাণিজ্য সুবিধা ধরে রাখতে এবং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণে বহুমুখী তৎপরতা শুরু করেছে সরকার। এর অংশ হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এগিয়ে নিতে নেদারল্যান্ডসের জোরালো সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) দেশ ওমানের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সিইপিএ) স্বাক্ষরের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পৃথক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা করেন বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। প্রথমে তিনি নেদারল্যান্ডসের বৈদেশিক বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতাবিষয়কমন্ত্রী স্যোয়ার্ড স্যোয়ার্ডসমার নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে বাংলাদেশে নিযুক্ত ওমানের রাষ্ট্রদূত জামিল বিন হাজি বিন ইসমাইল আল বালুশির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় করেন। উভয় বৈঠকে বাণিজ্যসচিব মো. আতাউর রহমান খানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
নেদারল্যান্ডসের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক : নেদারল্যান্ডসের মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, নেদারল্যান্ডস বাংলাদেশের পরীক্ষিত উন্নয়ন অংশীদার। এই সম্পর্ককে এখন প্রথাগত বাণিজ্যের বাইরে নিয়ে প্রযুক্তি হস্তান্তর, শিল্প আধুনিকায়ন এবং টেকসই বিনিয়োগে রূপ দিতে চায় বাংলাদেশ। এলডিসি উত্তরণের পর ইউরোপে বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে ইইউর সঙ্গে প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির কারিগরি আলোচনা জোরদার ও শুল্কবহির্ভূত বাধা দূর করার আহ্বান জানান তিনি।
বৈঠকে কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ খাতে ডাচ উন্নত বীজপ্রযুক্তি এবং সিলেটসহ সম্ভাবনাময় অঞ্চলগুলোতে বিশেষায়িত সবজি চাষ ও আধুনিক সাপ্লাই চেইন গড়ে তোলার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। এ ছাড়া পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং ও মিশ্র তন্তুর বস্ত্র উৎপাদনে উন্নত পাটবীজ উদ্ভাবন ও যৌথ গবেষণাগার স্থাপনে ডাচ সহযোগিতা চাওয়া হয়।
ডাচ প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান ‘স্ট্যামিকার্বন’-এর মাধ্যমে বাংলাদেশের সার কারখানাগুলোর আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি, সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়া টার্মিনালসহ সামগ্রিক বন্দর অবকাঠামো ও আধুনিক লজিস্টিকস খাতে ডাচ বিনিয়োগের বিষয়গুলো উঠে আসে।
এ ছাড়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনায় বিখ্যাত ডাচ সংস্থা ‘ডেল্টারেস’-এর কারিগরি দক্ষতা কাজে লাগানোর ওপর জোর দেওয়া হয়। ডাচ মন্ত্রী স্যোয়ার্ড স্যোয়ার্ডসমা এসব সম্ভাবনাময় খাতে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহায়তায় ইতিবাচক সাড়া দেন।
ওমানের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক : ওমানের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্য ব্যবধান কমানো ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব জোরদারে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সিইপিএ) স্বাক্ষরের ওপর গুরুত্বারোপ করেন বাণিজ্যমন্ত্রী।
বৈঠকে ওমানের রাষ্ট্রদূত ভারতের সঙ্গে তাদের সম্পাদিত অর্থনৈতিক চুক্তির অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বাংলাদেশের সঙ্গেও অনুরূপ অংশীদারত্ব চুক্তির প্রস্তাব দেন। বাণিজ্যমন্ত্রী এ প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়ে প্রয়োজনীয় সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও কারিগরি প্রস্তুতির মাধ্যমে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার কথা বলেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী দুই দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ বাড়াতে এফবিসিসিআই ও ওমান চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সমন্বয়ে ‘বাংলাদেশ-ওমান যৌথ বিজনেস কাউন্সিল’ গঠনের প্রস্তাব দেন। এ লক্ষ্যে প্রাথমিক ভার্চুয়াল আলোচনা ও পরবর্তীতে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের সফরের সিদ্ধান্ত হয়।
ওমানে কর্মরত প্রায় সাত লাখ প্রবাসীর অবদানের কথা স্মরণ করে রাষ্ট্রদূত জানান, ওমানের ঐতিহ্যবাহী ‘কুমা’ টুপি তৈরিতে বাংলাদেশি নারী কারিগরদের অবদান প্রশংসনীয়। এ ছাড়া ওমানের সোহর, দুকম ও সালালাহ বন্দর এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে (এসইজেড) বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ সুবিধা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়, যা মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় পণ্য রপ্তানির বড় প্রবেশদ্বার হতে পারে। বৈঠকে ভিসা সহজীকরণ ও শ্রমবাজার সম্প্রসারণ নিয়েও আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
