আগের রাতে বড় ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলেছিলেন জুয়েল মাদবর। জানিয়েছিলেন, ব্যবসার মালামাল কিনতে নাটোর যাবেন। সবাই মিলে পদ্মা সেতুর গোড়া থেকে বাসে উঠবেন। কিন্তু সেই কথোপকথনের কয়েক ঘণ্টা পরই আসে তার মৃত্যুর খবর। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন জুয়েল। বাড়িতে বাবার ফেরার অপেক্ষায় রয়েছে তার চার বছরের মেয়ে রিদিতা ও দুই বছরের ছেলে সাইফান।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) ভোরে নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়া এলাকায় নাটোর-পাবনা মহাসড়কের সরকারপাড়া এলাকায় যাত্রীবাহী বাস ও বালুবোঝাই ট্রাকের সংঘর্ষে জাজিরার পাঁচ ব্যবসায়ীসহ ১৪ জন নিহত হন। আহত হন আরও কয়েকজন।
নিহত পাঁচ ব্যবসায়ী হলেন, জুয়েল মাদবর (৪০), শালাল মোল্লা (৪৫), সোহাগ শিকদার (৩০), সামাদ ফকির (৬৫) ও শাহিন বেপারী (৩০)। তারা ব্যবসার কাজে নাটোরের তাহেরপুরে ভুট্টা, পেঁয়াজ, রসুন ও ধনিয়াসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য কিনতে যাচ্ছিলেন।
নিহত জুয়েল মাদবরের বড় ভাই শাহজাহান মাদবর বলেন, ‘গত রাতে জুয়েল আমাকে ফোন দিয়ে বলেছিল, ভুট্টা কিনতে নাটোর যাবে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কীভাবে যাবি? সে বলেছিল, সবাই একসঙ্গে পদ্মা সেতুর গোড়া থেকে বাসে উঠবে। এরপর সকালে ফোন পাই, আমার ভাই নাটোরে মারা গেছে। রাতে যে ভাইয়ের সঙ্গে কথা হলো, সকালে শুনলাম সে আর নেই।’
‘বাবা কই, মা কখন আসবে?’ জুয়েলের চার বছরের মেয়ে রিদিতা ও দুই বছরের ছেলে সাইফানের প্রশ্ন। তারা হয়তো জানে না, তাদের জীবন থেকে হারিয়ে গেছে বাবার সান্নিধ্য। যে বয়সে শিশুরা বাবার কোলে চড়তে চায়, ছোট ছোট আবদার করে, হাত ধরে হাঁটতে শেখে, সেই বয়সেই তারা হারিয়েছে তাদের সবচেয়ে কাছের আশ্রয়।
শিশুরা মাকে জিজ্ঞাসা করে, ‘বাবা কই, মা কখন আসবে?’ তাদের সরল প্রশ্নের মধ্যে লুকিয়ে আছে এমন এক শূন্যতা, যার গভীরতা বোঝার বয়স এখনো হয়নি তাদের।
এদিকে, প্রায় দুই যুগ ধরে কাজিরহাট এলাকায় ব্যবসা করতেন জুয়েল। ভুসামালের পাশাপাশি রড-সিমেন্টের ব্যবসাও ছিল তার। প্রায় এক বছর আগে তার বাবাও মারা যান। এবার জুয়েলের মৃত্যুতে পরিবারটি আরও বড় সংকটে পড়েছে। তার দুই শিশু সন্তান এখনো বুঝতে পারেনি, বাবা আর কখনো ফিরবেন না।
নিহত সোহাগ শিকদারের বাবা ইউনুস শিকদার বলেন, ‘আমার পাঁচ মেয়ে দুই ছেলে। দুই ছেলের মধ্যে সোহাগ বড়। পরিবারের সোহাগই একমাত্র উপার্জনকারী। আমি একসময় ছোটখাটো ব্যবসা করতাম। এখন কোনো কাজকর্ম করতে পারি না। ওরা কয়েকজন মিলে একসঙ্গে পেঁয়াজ, রসুন, ভুট্টা, ধনিয়াসহ মৌসুমি ব্যবসা করত। গতকাল সন্ধ্যায় তারা একসঙ্গে পেঁয়াজ কেনার জন্য নাটোর যায়। আজ সকাল ৮টার দিকে ওই এলাকার থানার ওসি ফোনে দুর্ঘটনার খবর দেন।’
সোহাগের মৃত্যুতে পরিবারের উপার্জনের প্রধান অবলম্বন হারিয়ে গেছে। এখন সংসার কীভাবে চলবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় স্বজনরা।
সাত সন্তান রেখে যান শালাল
নিহত শালাল মোল্লার পাঁচ মেয়ে ও দুই ছেলে রয়েছে। তার বড় ভাইয়ের স্ত্রী নাছিমা বেগম বলেন, ‘ব্যবসার মালামাল কিনতে গতকাল নাটোরে যায় আমার দেবর। তার সঙ্গে ব্যবসার আরও কয়েকজন ছিলেন। আজ সকালে নাটোর থেকে এক দারোগা ফোন করে জানান, সড়ক দুর্ঘটনায় আমার দেবর মারা গেছেন। খবরটি শুনে আমরা ভেঙে পড়েছি। তার পাঁচ মেয়ে ও দুই ছেলে রেখে গেছেন। ওরা এখন কীভাবে চলবে?’
নিহত পাঁচ ব্যবসায়ীই জাজিরার কাজিরহাট ও আশপাশের এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করতেন। পরিবারের জন্য আয় করতে বের হয়ে তাদের আর বাড়ি ফেরা হয়নি। তাদের মৃত্যুতে স্বজনদের পাশাপাশি স্থানীয় ব্যবসায়ী মহলেও শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
জাজিরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সালেহ আহম্মেদ বলেন, ‘দুর্ঘটনার বিষয়টি জেনেছি। তবে এখনো নাটোরের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে আমাদের আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। শুনেছি নিহতদের পরিবারের লোকজন মরদেহ আনতে গিয়েছেন। মরদেহ জাজিরায় নিয়ে আসার বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
একটি ব্যবসায়িক যাত্রা শেষ হয়েছে মহাসড়কে। কিন্তু জুয়েলের দুই শিশুসন্তানসহ নিহতদের পরিবারের সদস্যদের জন্য শুরু হয়েছে দীর্ঘ অনিশ্চয়তা। স্বজনদের কাছে এখন রয়ে গেছে শেষ কথোপকথন, অসমাপ্ত পরিকল্পনা আর প্রিয়জনকে হারানোর গভীর শোক।
