সনাতন হিন্দুধর্মাবলম্বী বাঙালির কাছে দুর্গা ‘বিপত্তারিণী দেবী’ নামেও পরিচিত। যে কারণে বাংলায় এমন কোনো জনপদ নেই, যেখানের হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে দুর্গতিনাশিনী মা দুর্গার উপস্থিতি নেই। আর এ কারণেই শারদীয় দুর্গোৎসব তাদের সবচেয়ে বড় উৎসব বা পার্বণ।
দুর্গা পৌরাণিক দেবী। তিনি আদ্যাশক্তি, মহামায়া, শিবানী, ভবানী, দশভুজা, সিংহবাহিনী নামেও পরিচিত। বারোয়ারি থিমভিত্তিক পূজার দৌলতে দেবীপ্রতিমা আর চালচিত্রের হাল আজ যেমনই হোক না কেন, পূজার সাবেকিয়ানায় বিশ্বাসীরা নিশ্চয়ই বলবেন, এ মোটেই হালকা করে নেওয়ার বস্তু নয়।অষ্টমীর অঞ্জলি বা নবমীর ধুনুচি নাচের মতোই বনেদি বাড়িগুলোয় পূজার অপরিহার্য অঙ্গ ছিল চালচিত্র। ‘ছিল’ বলছি কেন, আছে এবং থাকবে বলেই মনে হয়। চালচিত্র ছাড়া বাড়ির পূজা অকল্পনীয়! শুধু তাই-ই নয়, ধর্মীয় তাৎপর্যের জায়গাটুকু বাদ দিলেও, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলার দীর্ঘকালীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।
লোকাচারের পাঁক পেরিয়ে এসে সমাজ এখন আধুনিক। নারীশক্তি, নারী স্বাধীনতার বিষয়গুলো অ্যাকাডেমিক পরিসরের বাইরে বেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে ঘরে ঘরে। কিন্তু আজ থেকে একশো-দুশো বছর বা তার আগে এই বিষয়গুলি এত সহজ ছিল না। সেই সময়ে প্রগতিশীল ভাবনায় পটচিত্র হয়ে উঠেছিল সময়ের থেকে এগিয়ে থাকা শিল্প। শুধু নান্দনিকতাতেই নয়, সমাজ সচেতনতাতেও। আর এখানেই দুর্গা হয়ে ওঠেন বাংলার ঘরের মেয়ে, বা বাংলার ঘরের মেয়েরাই হয়ে ওঠেন দুর্গতিনাশিনী।
‘চালচিত্র’ শব্দটি ব্যাকরণ মতে মধ্যপদলোপী কর্মধারয়। চালির ওপর আঁকা চিত্র। উৎসগতভাবে বাংলা পটচিত্রেরই এ এক রকমফের বিশেষ, যাকে দুর্গাপট বা দেবীপট বলা হয়। আর পট মানেই ছবির মাধ্যমে বলে যাওয়া গল্প। তাই চালচিত্র আঁকার কাজটিকেও ‘পট লেখাই’ বলা হয়। এখন অবশ্য সরাসরি চালচিত্রে আঁকতে পারেন এরকম শিল্পীর সংখ্যা কমে যাওয়ায়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কাগজে আগে ছবি এঁকে চালচিত্রে তা জুড়ে দেওয়া হয়। তবে কোনো কোনো বনেদি পরিবার আজও প্রতিমার চালিতে সরাসরি ছবি আঁকার রীতি বজায় রেখেছে। হরিমাটি, মেটে সিঁদুর, ভুসোকালি প্রভৃতি প্রাকৃতিক রং ব্যবহার করা হয় চালচিত্রে। মূলত পৌরাণিক এবং দেবী দুর্গার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এমন ছবিই ঠাঁই পায় চালচিত্রের বিষয়বস্তু হিসেবে।
কৈলাসী চালচিত্রে থাকেন নন্দীভৃঙ্গীসমেত পঞ্চানন শিব, মহিষাসুরবধে রত দেবী দুর্গা প্রমুখ। থাকে শুম্ভ-নিশুম্ভকে পরাজিত করার দৃশ্যও। দশাবতারী চালচিত্রের বিষয় তার নামেই স্পষ্ট। তবে কৈলাসী দশাবতারী– এই ভাগগুলো তো বিষয়বস্তু অনুসারে। চালির আকারের ওপর নির্ভর করেও বদলে যায় চালচিত্রের ধরন। আর চালির আকার নির্ভর করে স্থাপত্যশিল্পের নানা আদলের ওপর। সেদিক থেকে দুর্গাপূজায় প্রধানত চার-পাঁচ রকমের চালি দেখা যায়। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘দেবী চৌধুরাণী’-তে আছে ব্রজেশ্বর দেবী চৌধুরাণীর কামরায় ঢুকে দেখলেন কামরার কাঠের দেওয়ালে বিচিত্র চারুচিত্র। এ যেন দশভূজার চালা। ‘শুম্ভ-নিশুম্ভের যুদ্ধ, মহিষাসুরের যুদ্ধ, দশাবতার, অষ্টনায়িকা, সপ্তমাতৃকা, দশমহাবিদ্যা, কৈলাশ, বৃন্দাবন, লঙ্কা, ইন্দ্রালয়, নরনারীকুঞ্জর, বস্ত্রহরণ সকলই চিত্রিত।’
বাংলায় মাটির মূর্তি গড়ে দুর্গাপূজার চল কবে থেকে শুরু হলো তা নিয়ে নানা পণ্ডিতের নানা মত। তবে এটা ঠিক যে প্রথম থেকেই দুর্গার উপরে চালচিত্র ছিল। চাল মানে আচ্ছাদন। বাংলায় দু-তিনশো বছরের পুরোনো যে ছবি আমরা দেখতে পাই তাতে চিত্রিত একটি পশ্চাৎপটের কেন্দ্রে রয়েছেন সিংহবাহিনী দেবী। তিনি অসুরকে বধ করছেন ত্রিশূল দিয়ে বিদ্ধ করে। তাঁর ডানপাশে লক্ষ্মী-গণেশ, বাঁ পাশে সরস্বতী-কার্তিক। চিত্রিত পৃষ্ঠপট বা চালচিত্রে স্থাপিত এই মূর্তি একচালা নামে পরিচিত। এ ধরনের মূর্তি এখনও প্রত্নবস্তু হয়ে যায়নি। মোটামুটি উচ্চবিত্ত কিছু পরিবারে এখনও দুর্গাপূজা হয়। মূর্তিটি অবশ্যই একচালা, তবে ‘ডাকের সাজ’ প্রতিমার মত দেবী সেখানে অতটা রত্নবিভূষিতা নন। দেবীর গাত্রবর্ণে হাল্কা কমলা রঙের আভাস দেখা যায়। হাতের তালু রক্তবর্ণ। অসুরের গায়ের রং সাধারণত হয় গাঢ় সবুজ। পুরোনো দিনের একচালা প্রতিমায় দেবদেবীর মাথার ওপরে একটা যে চাল রাখা হতো তা পূর্ব-ভারতীয় ভাস্কর্যের একটা বৈশিষ্ট্য। শুধু দেবদেবী নয়, পশুদের মূর্তিতেও একটা অর্ধচন্দ্রাকৃতি চাল থাকতো। যখন মাটির প্রতিমা গড়া শুরু হলো তখন পশুদের মাথার ওপরের অর্ধবৃত্তটি চালে রূপান্তরিত হলো। চাল তো ফাঁকা রাখা যায় না, তাই ভরাট করতে গিয়ে প্রথম দিকে হয়তো ফুল-লতা-পাতা আঁকা হতো ঐ চালের ভিতরে। অতঃপর চালচিত্রের মধ্যে আঁকা হতে লাগলো নানারকমের দেবদেবী, রাম-রাবণের যুদ্ধ, দশাবতার ইত্যাদি।
গত দশ-পনেরো বছর ধরে এই যে থিম পূজার এত রমরমা— এই থিমের চিন্তার সূত্রপাত মনে হয় ঐ চালচিত্র ঘিরে। প্রথমে দুর্গাপূজা হতো রাজবাড়ি, জমিদার বাড়ি কিংবা ধনীর গৃহে ধুমধাম করে। পূজায় সর্বসাধারণের প্রবেশাধিকার না থাকায় এক শ্রেণীর উদ্যোগী পুরুষ দুর্গাপূজার মতো ব্যয়বহুল একটি পূজা প্রবর্তনের কথা চিন্তাভাবনা করতে লাগলেন। বারোজন ইয়ার বা বন্ধুর মাথায় দুর্গাপূজার আইডিয়াটা সর্বপ্রথম এলো। সেজন্য পাড়ার প্রত্যেকের কাছ থেকে কিছু কিছু অর্থ অনুদান হিসাবে নিয়ে সূচনা হল বারোয়ারি পূজার। এ ভাবে ধনীগৃহের পারিবারিক পূজার রন্ধ্রপথে বারোয়ারি পূজার প্রবেশ।
জমিদার বাড়ির দুর্গাপ্রতিমার চালচিত্রে পৌরাণিক চিত্র ছাড়াও সামাজিক কিছু কিছু ছবিও থাকতো কিন্তু দুর্গাপ্রতিমা জমিদার বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার পরে বারোয়ারি পূজার রমরমার পরে সামাজিক প্রক্ষেপ আরো বেশি করে দেখা গেল। বারোয়ারি পূজায় জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে সকলে অংশগ্রহণ করতে পারায় পূজামণ্ডপ হয়ে উঠলো সবার পরশে পবিত্র করা এক তীর্থক্ষেত্র। শুরু হলো দুর্গাপূজার ইতিহাসে পালাবদলের আরেক অধ্যায়। দুর্গামূর্তি এবং দুর্গা পরিবারের মধ্যে একটা মুক্ত হাওয়া ঢুকে পড়লো। অর্থাৎ পণ্ডিতদের শাস্ত্রীয় বিধান যেন কিছুটা আলগা হয়ে গেল।
আশির দশকে বারোয়ারি প্যাণ্ডেলগুলিতে একচালা নয়, বিচ্ছিন্ন পরিবারকেই দেখা যায়। একটা সময় কার্তিক-গণেশ-লক্ষ্মী-সরস্বতী চালার ভিতর থেকে বেরিয়ে এলেন। প্রত্যেকের জন্য আলাদা আলাদা খোপ। বারোয়ারি পূজার জাঁকজমক যেমন বাড়ির পূজাকে ম্লান করে দিয়েছে তেমনি আলাদা আলাদা মূর্তিপূজার চলন এসে যাওয়ায় চালচিত্রের সংখ্যাও শোচনীয়ভাবে কমে গিয়েছে। সুধীর চক্রবর্তীর ‘চালচিত্রের চিত্রলেখা’ বইটিতে যে বিভিন্ন রকমের চালের বর্ণনা আছে তাতে ‘বাংলা চালে’ দেবদেবীর ছবিই বেশি পাওয়া যায়।
তবে সব চালচিত্রই যে অর্ধবৃত্তাকার হতো এমন নয়। মোট তিনরকমের চালচিত্রের ধাঁচা হতো, এখনও হয়। এক রকম হলো সাবেক রীতির— যা সচরাচর আমরা দেখে থাকি। আরেক রকম চালারীতির— দুদিকে মূর্তি ছাড়িয়ে নেমে যায়। আর তৃতীয় রকম কাঠামো হলো রথের মতো তিনচূড়ো। গড়পড়তা হিসাবে ঠাকুর যাঁরা গড়েন তাঁরাই চালচিত্র আঁকেন। অর্থাৎ কুমোরেরা। সাধারণত কুমোরেরা অন্য জায়গা থেকে পট কিনে এনে চালচিত্রে সেঁটে দেন। বর্ষার সময় যখন কুমোরদের হাতে ঠাকুর গড়ার তেমন কাজ থাকে না তখন এক শ্রেণীর কুমোর তাদের বউ কিংবা মেয়ের সহায়তা নিয়ে পট এঁকে পাইকারদের বেচে দেন। বাংলার মানুষ দেব-দেবীদের প্রায়শই লোকায়ত রূপে কল্পনা করে এসেছেন। তাঁদের কল্পনায় দেবতারা হয়ে উঠেছেন ঘরের মানুষ। সাহিত্যে এর প্রচুর উদাহরণ আছে। পটচিত্রও তার ব্যতিক্রম নয়। সেখানে দুর্গা হয়ে উঠেছেন গৃহিণী আর শিব হয়েছেন ছাপোষা গৃহস্থ। এমনকি দেবী তাঁদের কল্পনায় উঠে এসেছেন বাগদি রূপেও। এছাড়াও গণেশ জননী রূপী দুর্গা, রামের দুর্গা বন্দনা, এগুলিও খুব বিখ্যাত। বিভিন্ন পটে শিল্পরীতিগুলি বিভিন্ন। তা দেখে আন্দাজ করা যায়, কোন সম্প্রদায়ের আঁকা সেই পট। ১৮৬০ সালের পর থেকে কিছু জায়গায় পটচিত্রের জায়গা নিয়েছে মৃন্ময়ী মূর্তি।
