নদীভাঙন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও বৃষ্টিপাতের অনিয়মে মানিকগঞ্জের মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ক্রমেই ঝুঁকির মুখে পড়ছে। বাড়ি ও ফসলের ক্ষতি টাকার অঙ্কে হিসাব করা গেলেও বাস্তুচ্যুতির দীর্ঘমেয়াদি ট্রমা, স্বাস্থ্যের অবনতি, সামাজিক সম্পর্ক ও শিক্ষাজীবন নষ্ট হওয়ার মতো ‘অ-অর্থনৈতিক ক্ষতি’ (নন-ইকোনমিক লস অ্যান্ড ড্যামেজ) কোনো হিসাবেই আসছে না। সরকারের দীর্ঘমেয়াদি ‘বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০’- করলেও ক্ষতি নিরূপণ ও ক্ষতিপূরণের স্পষ্ট নির্দেশনা নেই বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
জেলার সাটুরিয়া উপজেলার তিল্লী ইউনিয়নের আয়নাপুর গ্রামে নদীভাঙনে বিনি বেগমের ২০ শতাংশ জমি বিলীন হয়েছে। ভাঙনের আতঙ্কে কয়েকবার ঘর সরিয়ে নিলেও জমি রক্ষা করা যায়নি। ওই এলাকার প্রায় এক ডজন পরিবারের জমি নদীতে গেছে। অনেকে বসতভিটা হারিয়ে খাসজমি, আত্মীয়স্বজন কিংবা অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন।
নদীর দিকে তাকিয়ে বিনি বেগম বলেন, “ভাঙনে জমিন আর ঘরের যে ক্ষতি অয়, তা তো মাপন (পরিমাপ) যায়, কিন্তু বাপদাদার ভিটা আর উঠানের গাছগাছালি যখন নদীতে তলায়া যায়, সেই কষ্ট মাপপো ক্যারা? বর্ষা আইলেই রাতে ঘুম অয় না, মনে অয় এই বুঝি ঘরটা আবার নদীতে পইড়া গেল।”
বিনি বেগম বলেন, “ভাঙনে জমিন আর ঘরের যে ক্ষতি অয়, তা তো মাপন (পরিমাপ) যায়, কিন্তু বাপদাদার ভিটা আর উঠানের গাছগাছালি যখন নদীতে তলায়া যায়, সেই কষ্ট মাপপো ক্যারা? বর্ষা আইলেই রাতে ঘুম অয় না, মনে অয় এই বুঝি ঘরটা আবার নদীতে পইড়া গেল।”
হরিরামপুরের চরাঞ্চলের লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নে প্রায় দুই হাজার পরিবার ইতোমধ্যে বসতভিটা হারিয়েছে। শুধু হরিহরদিয়া ও জয়পুর এলাকাতেই দেড় শতাধিক বাড়ি নদীতে গেছে।
হরিহরদিয়া গ্রামের জীবন মোল্লা পদ্মার ভাঙনে নিজের চোখের সামনে পূর্বপুরুষদের কবর নদীগর্ভে যেতে দেখেছেন। তিনি বলেন, “চোখের সামনে পদ্মা আমাদের বসতভিটা, ফসলি জমি সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। এবছর নদীগর্ভে হারিয়ে গেল আমাদের পূর্বপুরুষদের শেষ স্মৃতিচিহ্নটুকুও। প্রপিতামহ মাঈন উদ্দীন মোল্লার দেড় যুগের পুরোনো কবরটি পদ্মার পেটে চলে গেল, অথচ কিছুই করতে পারলাম না। এখন মনে হয়, এই মাটিতে আমাদের শেকড় বলে আর কিছুই অবশিষ্ট রইল না।”
সাটুরিয়া উপজেলার তিল্লী ইউনিয়নের আয়নাপুর গ্রামে নদীভাঙনে বিনি বেগমের ২০ শতাংশ জমি বিলীন হয়েছে।
ঢাকার একটি ছাপাখানায় কাজ করতেন বাদল খান। আট বছর আগে অবসরে বাড়ি ফেরেন তিনি। স্ত্রী, পাঁচ ছেলে ও নাতি-নাতনিসহ আট সদস্যের পরিবার তার। বাদল খান জানান, হরিরামপুর উপজেলার দুর্গম চর আজিনগরে ছিল তাদের পৈতৃক বসতভিটা। প্রায় ৪০ বছর আগে পদ্মার ভাঙনে সেই ভিটা হারিয়ে পাশের ধুলশুড়া ইউনিয়নের আবিধারা গ্রামে নতুন করে বাড়ি করেন। কিন্তু, সেখানেও শেষ রক্ষা হয়নি। আসবাব ও মালামালসহ তার দুটি ঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। জীবনের শেষ সময়ে এসে আবারো ভিটা হারিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন তিনি। বারবার নদীভাঙনে ঘরবাড়ি হারানোর বেদনা আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা তাকে তাড়া করে ফিরছে।
তথ্য বলছে, নদী ভাঙনের পাশাপাশি তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও বৃষ্টিপাতের অনিয়ম মানিকগঞ্জের জনস্বাস্থ্যকে ঝুঁকিতে ফেলছে। স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ রিসার্চ ইনিশিয়েটিভস অব এনভায়রনমেন্ট সোসাইটির গবেষকেরা ১৯৭৬ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ৩০ বছরের আবহাওয়া উপাত্ত বিশ্লেষণ করেছেন।
২০১৮ সালে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে দেখা যায়, মানিকগঞ্জে বার্ষিক গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা প্রতি বছর ০.০১ ডিগ্রি এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ০.০২ ডিগ্রি সেলসিয়াস হারে বাড়ছে। অন্যদিকে, বার্ষিক মোট বৃষ্টিপাত গড়ে বছরে ২.৯ মিলিমিটার করে কমছে।
একশন এইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতি শুধু ঘরবাড়ি বা ফসলের আর্থিক ক্ষতিতে সীমাবদ্ধ নয়; এর দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ও সামাজিক প্রভাবও রয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় নন-ইকোনমিক লস অ্যান্ড ড্যামেজ বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরা হচ্ছে। তবে, আন্তর্জাতিকভাবে নন-ইকোনমিক লজ অ্যান্ড ড্যামেজ তহবিলে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না হলে এই খাতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিশ্চিত করা কঠিন।
একই গবেষণার খানা জরিপে ৯৭ শতাংশ পরিবার নিয়মিত সর্দি, কাশি ও জ্বরে ভোগার কথা জানিয়েছে। ৮৫ শতাংশ পরিবার ডায়রিয়া এবং ৩১ শতাংশ পরিবার চর্মরোগকে প্রধান স্বাস্থ্যসমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেছে। বন্যা বা খরার সময় সর্দি-জ্বর (৩০ শতাংশ), ডায়রিয়া (২৯ শতাংশ) ও আমাশয় (২০ শতাংশ) সবচেয়ে বেশি দেখা দেয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের ৪২.১ শতাংশ ডায়রিয়া এবং ৩৭.৯ শতাংশ চর্মরোগের কারণ হিসেবে তাপমাত্রার চরম তারতম্যকে দায়ী করেছেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও আঞ্চলিক পরিকল্পনা বিভাগের গবেষকেরা শিবালয় উপজেলার তেওতা ইউনিয়নে ২০২৫ সালে ‘লাইভলিহুড ভালনারেবিলিটি ইনডেক্স’ (এলভিআই) বিশ্লেষণ করেছেন। তাতে দেখা যায়, বন্যায় স্থানীয়দের ভৌত সম্পদ ও মানবসম্পদ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে, ভৌত ক্ষতির চেয়েও গভীর আঘাত আসে মানসিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে। গৃহহীন হওয়ার আতঙ্ক গভীর মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করে, যার ফলে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে মানসিক ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ে।
বারবার স্থানান্তরের কারণে স্বজন ও প্রতিবেশীর পারস্পরিক সহযোগিতার নেটওয়ার্ক, অর্থাৎ সামাজিক মূলধনের সূচক নিচে নেমে আসে। এতে ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতাও দুর্বল হয়ে পড়ে। জীবিকা হারিয়ে পরিবারগুলো আর্থিক সংকটে পড়লে কিশোর-কিশোরীদের পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায় এবং অনেক ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহের ঝুঁকি বাড়ে।
জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকার ২০১৮ সালে ‘বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০’ গ্রহণ করলেও গবেষণায় দেখা গেছে, এতে মূলত বাঁধ নির্মাণ ও ভৌত অবকাঠামোকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। নদীপাড়ের মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা, সামাজিক মূলধন পুনর্গঠন এবং অ-অর্থনৈতিক ক্ষতি নিরূপণ ও ক্ষতিপূরণের স্পষ্ট দিকনির্দেশনা জাতীয় কৌশলে এখনো নেই।
মনের বন্ধুর সহযোগী সাইকোসোশ্যাল কাউন্সিলর সোনিয়া আক্তার পুষ্প বলেন, “নদীভাঙনে বসতভিটা হারানো শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, এটি মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে। নিজের বাড়ি, পূর্বপুরুষের স্মৃতিচিহ্ন ও পরিচিত পরিবেশ হারিয়ে অনেক মানুষ অনিশ্চয়তা, উদ্বেগ ও মানসিক চাপে ভোগেন।”
তিনি বলেন, “বারবার বাস্তুচ্যুত হওয়ার অভিজ্ঞতা তাদের নিরাপত্তাবোধ নষ্ট করে এবং সামাজিক সম্পর্কেও দূরত্ব তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে নারী, শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিরা এ ধরনের পরিস্থিতিতে বাড়তি মানসিক সংকটের মুখে পড়তে পারেন। তাই জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় ঘরবাড়ি ও সম্পদ রক্ষার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সহায়তা এবং পুনর্বাসন নিশ্চিত করা জরুরি।”
একশন এইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতি শুধু ঘরবাড়ি বা ফসলের আর্থিক ক্ষতিতে সীমাবদ্ধ নয়; এর দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ও সামাজিক প্রভাবও রয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় নন-ইকোনমিক লস অ্যান্ড ড্যামেজ বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরা হচ্ছে। তবে, আন্তর্জাতিকভাবে নন-ইকোনমিক লজ অ্যান্ড ড্যামেজ তহবিলে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না হলে এই খাতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিশ্চিত করা কঠিন। এ সংকট মোকাবিলায় সরকারের নিজস্ব ‘জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড’- এর অর্থ বরাদ্দ ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক পুনর্বাসনের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে।”
মানিকগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. আইভী ফেরদৌস বলেন, “নদীভাঙনে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য নির্মিত ভবনও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এরপরও স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রান্তিক পর্যায়ে মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কাজ করছেন। নদী ভাঙন প্রবণ এলাকায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে নৌ অ্যাম্বুলেন্স চালুর প্রক্রিয়া চলছে। জলবায়ু পরিবর্তন জনিত দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের চিকিৎসা সেবা অব্যাহত রাখতে কাজ করা হচ্ছে।”
মানিকগঞ্জের পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আক্তারুজ্জামান বলেন, “নদীভাঙন রোধে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে, নদীর গতিপথ ও স্রোতের পরিবর্তনের কারণে সব এলাকায় ভাঙন প্রতিরোধ করা কঠিন। ভাঙনপ্রবণ এলাকার মানুষের বসতভিটা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষায় প্রয়োজনীয় প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন ও দীর্ঘমেয়াদি দুর্ভোগ কমাতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।”
