প্রত্যেক মানুষের শারীরিক ওজন নির্ভর করে তার বয়স, খাওয়া-দাওয়া ও প্রতিদিনের কায়িক পরিশ্রমের ওপর। খাদ্যাভ্যাস বা শারীরিক ক্রিয়াকলাপের পরিবর্তন ছাড়া যদি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ওজন কমে যায়, তাকে বলা হয় অপ্রত্যাশিত ওজন হ্রাস। যদি ছয় মাসের কম সময়ে শরীরের মোট ওজনের ৫ থেকে ১০ শতাংশ কমে যায়, তাহলে তা উল্লেখযোগ্য বলে মনে করতে হবে। ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে যদি শরীরের ওজন কোনো চেষ্টা ছাড়াই ৫ কেজি মতো কমে গেলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
ব্যাখ্যাতীত ওজন কমার কারণ : ডায়াবেটিস হলে ইনসুলিনের অভাবে শরীরে কোষগুলো গ্লুকোজ ব্যবহার করতে পারে না। ফলে রক্তে শর্করার পরিমাণ বেড়ে যায়। কিন্তু নিজেকে সচল ও শক্তিশালী রাখতে প্রোটিন ও চর্বির বিপাক বেড়ে যায়। এ কারণে শরীরের সামগ্রিক ওজন কমে যায়।
হরমোনজনিত রোগে থাইরয়েড গ্রন্থি শরীরের বিপাক নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। থাইরয়েড গ্রন্থি যদি বেশি হরমোন তৈরি করে, তা হলে বিপাক ক্রিয়া বেশি হবে, ক্যালরি খরচ বেশি হয়। ফলে ওজন হ্রাস পায়। হাইপারথাইরয়েডিজম হলে ওজন হ্রাসের পাশাপাশি গরম অসহ্য লাগে, ভীষণ ঘাম হয়, ডায়রিয়া হতে পারে, অস্থিরতা ও বুক ধড়ফড় করবে। কিছু রোগীর উল্লেখযোগ্য লক্ষণ নাও থাকতে পারে।
অ্যাডিসনস ডিজিজে কিডনির ওপর অবস্থিত অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি পর্যাপ্ত পরিমাণে কোর্টিসোল ও অন্যান্য হরমোন তৈরি করতে পারে না। বিপাক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয় স্বাস্থ্যহানির পাশাপাশি দুর্বলতা, পাতলা পায়খানা ও বমি, পেটব্যথা, রক্তচাপ নেমে যাওয়া, রক্তে সোডিয়াম কমে যাওয়া, শরীরের বিভিন্ন স্থানে কালো দাগ, মাথা ঘোরা ইত্যাদি উপসর্গ থাকে।
পরিপাকতন্ত্রের রোগের মধ্যে গ্যাস্ট্রিক আলসার হলে ওজন কমে যেতে পারে। অগ্ন্যাশয়ে এনজাইম তৈরি করে, যা খাদ্য হজমে সাহায্য করে। অগ্ন্যাশয়ে প্রদাহ হলে এনজাইম তৈরি কমে যেতে পারে। ফলে ওজন হ্রাস পায়। প্রদাহজনক অন্ত্রের রোগে ক্রোনস ডিজিজ ও আলসারেটিভ কোলাইটিসের মতো অবস্থা অন্ত্রে প্রদাহ হয়। তাতে হজমে বাধা দেয়, যা ডায়রিয়া ও ওজন হ্রাসের কারণ হতে পারে। ডিসফ্যাজিয়ায় ঢোক গিলতে অসুবিধা, আক্রান্ত ব্যক্তির গিলে ফেলতে কষ্ট হয়। প্রায়ই শক্ত খাবার এড়িয়ে চলে। অপুষ্টি ও ওজন হ্রাস ঘটে।
ক্যানসারে মানুষের কোষগুলো ত্রুটিপূর্ণভাবে বৃদ্ধি পায় এবং পরিবর্তিত হয়, যা সুস্থ টিস্যু এবং অঙ্গগুলো প্রভাবিত করে। ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ওজন কমে যাওয়া। মানসিক সমস্যা, মাদকাসক্তি, দীর্ঘমেয়াদি কিছু সংক্রমণ, এইডসজাতীয় রোগ হলে অল্প সময়ে ওজন কমে যায়। রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসেও শরীরে প্রতিদিন বেশি ক্যালরি ও চর্বি পুড়ে ওজন দ্রুত কমতে থাকে। অপর্যাপ্ত খাদ্যগ্রহণ, পরজীবী ছাড়াও নানা কারণে ওজন হ্রাস পেতে পারে। সিগারেটের ধোঁয়া ক্ষুধা কমিয়ে দেয় ও ওজন কমায়।
চিকিৎসা : সাম্প্রতিক জীবনধারার পরিবর্তন, রোগের ইতিহাস পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করে চিকিৎসক ব্যাধিগুলোর সঙ্গে যুক্ত সম্ভাব্য ঝুঁকির কারণগুলো অনুসন্ধান করে পূর্ণাঙ্গ শারীরিক পরীক্ষা পরিচালনা করবেন এবং ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসার পরামর্শ দেবেন।
লেখক : মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, মেডিসিন বিভাগ
ইব্রাহিম মেডিক্যাল কলেজ, শাহবাগ, ঢাকা
