রাত পোহালেই শুরু হতে যাচ্ছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠী পূজার মধ্য দিয়ে শুরু হবে বড় এই উৎসবের আমেজ। এবার নওগাঁর ৮৩৬টি মণ্ডপে বাজবে শঙ্খ, শোনা যাবে ঢাক-ঢোল, কাঁসা ও বাঁশির শব্দ। তাই দেবদুর্গাকে পরিপূর্ণ রূপ দিতে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি।
এবার সপ্তমী দুই দিন হওয়ায় আগামী ১৬ অক্টোবর শুক্রবার থেকে ২১ অক্টোবর বুধবার ৬ দিনব্যাপী শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। কয়েক ঘণ্টা পরেই এবার দেবীদুর্গা মর্তলোকে আগমন ঘটকে (ঘোড়ায়) চড়ে, আর গমন করবেন নৌকায়। তাই মাকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন জেলার সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। আর শান্তিপূর্ণভাবে উৎসব উদযাপনের আশায় আছেন উত্তরের এই জেলার সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। এজন্য ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রতিমা গড়ার কারিগররা।
এবার এ জেলায় ৮৩৬টি মণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হতে চলছে। এর মধ্যে নওগাঁ সদর উপজেলায় ৭০টি এবং পৌরসভায় ৫৮টি, মহাদেবপুর উপজেলায় ১৬০টি, মান্দায় ১২৬টি, বদলগাছীতে ১০৮টি, পত্নীতলায় ৮৪টি, নিয়ামতপুরে ৫৫টি, আত্রাইয়ে ৫৪টি, রাণীনগরে ৫০টি, ধামইরহাটে ৩২টি, সাপাহারে ২০টি এবং পোরশা উপজেলায় ১৯টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হবে।
গত বছর ৮০১টি মণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল এ জেলায়। তার আগের বছর ৮১৯টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এবার এ বছর জেলায় বাড়তি ৩৫টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হতে চলেছে।
জেলার একাধিক উপজেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপ ঘুরে দেখা গেছে, কাদা-মাটি, বাঁশ, খড়, সুতলি দিয়ে শৈল্পিক ছোঁয়ায় তিলতিল করে তৈরি করেছে দেবীদূর্গার প্রতিমা। রাত-দিন শক্ত মাটি নরম করে দেবী দুর্গার সঙ্গে নিপুণ হাতে গড়ে তুলেছে কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতী আর অসুরের প্রতিমা। প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ। এখন দেবীদুর্গাকে পরিপূর্ণ রূপ দিতে রং তুলির আঁচড়ে ব্যস্ত মৃৎশিল্পীরা। স্থানীয় শিল্পী ছাড়াও বিভিন্ন স্থান থেকে আগত শিল্পীরা এখানে রং তুলিতে জানান দিচ্ছেন তাদের হাতের নৈপুণ্য।
অন্যদিকে প্রতিমার পাশাপাশি বাদ্যযন্ত্র ঠিক ও তৈরি করতে ব্যস্ত সময় পার করছে ঢাক-ঢোল, কাসি ও বাঁশির কারিগররা। এছাড়া মণ্ডপগুলোতে চলছে সাজসজ্জার প্রস্তুতি।
আয়োজকরা জানিয়েছেন, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে পূজা উদযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তাই প্রস্তুত আছে জেলা পূজা উদযাপন ফ্রন্ট ও পূজা উদযাপন কমিটির নেতারা। আর শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠুভাবে পূজা সম্পন্ন করতে প্রস্তুত আছে জেলা প্রশাসন ও পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। আলোকসজ্জা ও মন্দিরগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনসহ বিদ্যুতের বিকল্প হিসেবে জেনারেটরের ব্যাবস্থা রাখা হয়েছে। সার্বজনীন এ দুর্গাপূজাকে উৎসব মুখোর করতে বিগত বছরগুলোর চেয়ে এ বছর সরকারি বরাদ্দে ১০০ কেজি চাল বৃদ্ধি করা হয়েছে। শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্নে সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষরা যেন ৬ দিনব্যাপী তাদের বৃহৎ ধর্মীয় এ উৎসব পালন করতে পারে সে লক্ষ্যে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নিজ নিজ এলাকার এমপি, রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, পূজা উদযাপন পরিষদ, পূজা উদযাপন ফ্রন্ট ও বিভিন্ন মন্দির কমিটির নেতারা এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে মতবিনিময় করা হয়।
নওগাঁ কালেক্টরেট পূজামণ্ডপের সভাপতি সুবল চন্দ্র মন্ডল বলেন, সাজসজ্জাসহ সব প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন। আমাদের এটা ৩৭তম পূজা। আগামীকাল থেকেই শুরু হতে যাচ্ছে আমাদের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজা। এবার সরকারি অনুদান ৬০০ কেজি চাল পাওয়া গেছে এবং কল্যাণ ট্রাস্ট থেকেও অনুদান পাওয়া যাবে। এছাড়া জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন। আশা করছি পূজা আনন্দসহ সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে শেষ হবে।
বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট নওগাঁ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক সুবীর কুমার দাস বলেন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রতির এদেশ। এ দেশে সব সম্প্রদায়ের মানুষ তাদের নিজ নিজ ধর্ম পালন করে আসছে শত শত বছর ধরে। সার্বজনীন এ দুর্গাপূজা উদযাপনে কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলে তাকে আইনের হাতে সোপর্দ করার আহ্বান জানান তিনি।
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক প্রতাপ চন্দ্র সরকার এবং পৌরশাখার সভাপতি পিযুষ কান্তি সরকার বলেন, আগামী ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠী তিথিতে শুরু হবে এ পূজা উৎসব। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সুন্দর ও সুষ্ঠ আছে। জেলা প্রশাসন ও পুলিশের সহযোগিতায় পূজা সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
জানতে চাইলে জেলা পূজা উদযাপন ফ্রন্টের আহ্বায়ক প্রদীপ কুমার কুন্ডু বলেন, এবার জেলায় ৮৩৬টি মণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। এই ৮৩৬টি মণ্ডপের পূজা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য জেলা প্রশাসনসহ জেলার সব আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে দফায় দফায় মিটিং করা হয়েছে। তারা সবাই পূজা সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবেন। কাজেই এবার সবচেয়ে উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্যে দিয়ে পূজা উদযাপন হবে।
নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, জেলায় সুন্দর ও সুষ্ঠু পরিবেশ আছে। তাই আমি পরিষ্কারভাবে বলতে চাই নওগাঁতে দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে কোনো গোষ্ঠী, কোনো সম্প্রদায় বা কোনো ব্যক্তি যদি কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটানোর চেষ্টা করে তাহলে জেলা পুলিশ আইন অনুযায়ী সেটা কঠোর হস্তে দমন করবে।
নওগাঁ জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, দুর্গাপূজা উপলক্ষে পূজা কমিটির নেতারাসহ মন্দির কমিটির সঙ্গে সবসময় যোগাযোগ করা হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে। আশা করছি এবার পূজা খুব উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হবে। সে জন্য জেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা এই পূজা উৎসবকে ঘিরে তৎপর আছে, যাতে সনাতন ধর্মাবলম্বী লোকজন নির্বিঘ্নে শান্তিপূর্ণভাবে পূজা উৎসব উদযাপন করতে পারে।
