‘আল্লাহ আমাকে অক্ষত অবস্থায় ফিরিয়ে দিয়েছেন। চট্টগ্রাম জেলা পুলিশকে অনেক ধন্যবাদ। বাংলাদেশের মানুষের পুলিশে আস্থা রাখা উচিত’- চার দিনের বন্দিদশা থেকে ফিরে কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন অপহৃত ব্যবসায়ী মোহাম্মদ এহছান ওরফে হাসান।
অপহরণের পর চোখ ও হাত বেঁধে আটকে রাখা হয়েছিল তাকে। হত্যার ভয়, নির্যাতন আর অনিশ্চয়তার মধ্যে কেটেছে ৪টি দিন। পরে ২১ অক্টোবর চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অভিযানে টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২৫ সংলগ্ন এলাকা থেকে জীবিত উদ্ধার হন তিনি।
গত ১৭ অক্টোবর রাত সাড়ে ৮টার দিকে চট্টগ্রামের বাঁশখালীর পুঁইছড়ি প্রেমবাজারে নিজের হার্ডওয়্যারের দোকান মেসার্স আব্দুল্লাহ এন্টারপ্রাইজে বসেছিলেন হাসান। এ সময় কালো পোশাকের ওপর ‘এসআরবি’ লেখা কটি পরা, মুখে মাস্ক ও মাথায় ক্যাপধারী চার-পাঁচজন ব্যক্তি দোকানে ঢুকে নিজেদের এসআরবি সদস্য পরিচয় দেন। প্রথমে তারা হাসানকে হ্যান্ডকাফ পরায়। পরে মুখে স্কচটেপ লাগিয়ে জোর করে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে নেয়। এরপর একের পর এক যানবাহন বদলে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় কক্সবাজারের দিকে।
হাসান জানান, অপহরণকারীরা তাকে বিভিন্ন বাড়িতে আটকে রেখে হাত ও চোখ বেঁধে রাখে। অস্ত্র দেখিয়ে হত্যার ভয় দেখানো হয়। পরিবারের সঙ্গে কথা বলানোর সময়ও তাকে হুমকি দেওয়া হতো। মুখে স্কচটেপ থাকায় ঠিকমতো কথা বলার সুযোগ ছিল না।
এদিকে, অপহরণের পর তার স্ত্রী ও দোকানের ম্যানেজারের কাছে ফোন করে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে অপহরণকারীরা। টাকা না দিলে তাকে হত্যা করা হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়।
ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই তদন্তে নামে চট্টগ্রাম জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও বাঁশখালী থানা পুলিশ। পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলমের নির্দেশনায় সহকারী পুলিশ সুপার (আনোয়ারা সার্কেল) মাহমুদুল হাসান ও ডিবির ওসি মো. মাসুদ রানার নেতৃত্বে অভিযান শুরু হয়। মুক্তিপণের জন্য ব্যবহৃত নম্বরগুলো ভুয়া ও ভিআইপি হওয়ায় সেগুলোর সূত্র ধরে এগোনো কঠিন ছিল। তাই সিসিটিভি ফুটেজ, স্থানীয়দের তথ্য ও গোয়েন্দা তথ্য একত্র করে অপহরণকারীদের চলাচলের পথ শনাক্তের চেষ্টা চালায় পুলিশ।
পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, ‘সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে বাঁশখালী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত অপহরণকারীদের চলাচলের তথ্য পাওয়া যায়। তারা প্রথমে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, পরে একটি মাইক্রোবাসে করে ভুক্তভোগীকে নিয়ে যায়। ফুটেজ, স্থানীয় লোকজনের তথ্য ও গোয়েন্দা তথ্য সমন্বয় করে আমরা তাদের শনাক্তের চেষ্টা করি।’
এর ধারাবাহিকতায় কক্সবাজার সদর, পেকুয়া, উখিয়া, রামু ও টেকনাফের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালানো হয়। ২০ অক্টোবর কক্সবাজার সদর এলাকার বাস টার্মিনাল, বাংলাবাজার ও কোর্টবাজার থেকে গ্রেপ্তার করা হয় ছয়জনকে। তাদের মধ্যে রয়েছেন চাকরিচ্যুত সাবেক সেনাসদস্য সুমন মুন্সি, যাকে এ চক্রের মূল পরিকল্পনাকারী বলে সন্দেহ করছে পুলিশ। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে একটি প্রাইভেটকার, ৫টি কালো এসআরবি লেখা কটি, দুটি ভুয়া এসআরবি পরিচয়পত্র ও একটি হ্যান্ডকাফ জব্দ করা হয়।
তবে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেই অভিযান শেষ করেনি পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, হাসানকে টেকনাফের লেদা (আলিখালী) রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২৫ সংলগ্ন এলাকায় আটকে রাখা হয়েছে। ক্যাম্পের ভেতরে সরাসরি অভিযান চালালে ভুক্তভোগীর জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারে, এমন আশঙ্কায় কৌশল নেয় পুলিশ। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের দিয়েই ক্যাম্পে থাকা অপহরণকারীদের ফোন করে জানানো হয়, মুক্তিপণের টাকা পাওয়া গেছে এবং হাসানকে ছেড়ে দেওয়া হবে। এরপর তাকে ক্যাম্পের বাইরে নিয়ে আসতে বলা হয়।
পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, ‘ক্যাম্পের ভেতরে সরাসরি অভিযান পরিচালনা করা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। তাই কৌশল অবলম্বন করি। সুমন মুন্সির ফোন পেয়ে অপহরণকারীরা হাসানকে বাইরে নিয়ে এলে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে।’
২১ অক্টোবর ভোর আনুমানিক ৪টার দিকে চালানো এ অভিযানে হাসানকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারের সময় তার চোখ ও হাত বাঁধা ছিল। পুলিশ সুপারের ভাষ্য অনুযায়ী, অপহরণের পর থেকে উদ্ধারের আগ পর্যন্ত তার চোখ বাঁধা রাখা হয়েছিল এবং প্রায় চার দিনে মাত্র একবার খাবার দেওয়া হয়েছিল।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সুমন মুন্সির বিরুদ্ধে ছিনতাই, দস্যুতা ও অস্ত্রসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১৩টি মামলা রয়েছে। জয়নাল উদ্দিন ওরফে জুনুর বিরুদ্ধে অপহরণ, চুরি ও ছিনতাইয়ের ৩টি মামলা এবং ছলিম ওরফে সেলিমের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে দুটি মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। আব্বাস উদ্দিনের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলার তথ্যও পাওয়া গেছে। এসব মামলার পাশাপাশি হাসানকে অপহরণের ঘটনায় প্রত্যেকের ভূমিকা তদন্ত করা হচ্ছে।
পুলিশের প্রাথমিক তথ্য বলছে, চক্রটি ভুয়া এসআরবি পরিচয় ব্যবহার করে ভুক্তভোগীদের তুলে নিয়ে মুক্তিপণ আদায়ের পরিকল্পনা করত। সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের আর্থিক অবস্থা ও চলাফেরা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের অভিযোগও রয়েছে। বাঁশখালীর ঘটনায় আব্বাস উদ্দিন স্থানীয়ভাবে তথ্য সংগ্রহ ও সমন্বয় করেছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পকে নিরাপদ আশ্রয়স্থল ভেবে সেখানে অপহৃত ব্যক্তিদের আটকে রাখা হতো কি না, তাও তদন্ত করছে পুলিশ। কক্সবাজার, উখিয়া, টেকনাফ, কুতুবদিয়া, চকরিয়া, বান্দরবান ও চট্টগ্রামের অন্য অপহরণের ঘটনায় চক্রটির সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, ‘ভুক্তভোগীকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। আমাদের লক্ষ্য ছিল যেকোনোভাবে তাকে জীবিত ও সুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করা, আর আমরা সেই কাজে সফল হয়েছি। অপরাধী যেই হোক, কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকলে তাকে ছাড় দেওয়া হবে না। জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনতে পুলিশ কাজ করবে।’
