Published on
:
3 min read
সুদেষ্ণা ঘোষাল, নয়াদিল্লি
তাঁর অপসারণ চেয়ে বিক্ষোভ–ধর্না আন্দোলন চলছে রাজধানী দিল্লি থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। সুপ্রিম কোর্টে একাধিক মামলাও বিচারাধীন। কিন্তু সেই তিনি— দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারকে ‘ভোটচুরি’র জন্য মূল অপরাধী বলে মনে করেন না রাহুল গান্ধী। জ্ঞানেশ ‘ভুল’ করলেও তা ‘শুধরে’ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। সোমবার দিল্লিতে সাংবাদিক বৈঠকে লোকসভার বিরোধী দলনেতার স্পষ্ট কথা, ‘জ্ঞানেশ কুমার ভয়ে আছেন। রাতে ঘুমোতে পারছেন না। আপনি (জ্ঞানেশ) রাজসাক্ষী হয়ে যান। আপনার এখন সবচেয়ে ভালো পথ হলো— পদত্যাগ করুন, সরে যান। সেটাই হবে আপনার দেশসেবা।’
রাগার সংযোজন, ‘সত্যি বলতে কী, আপনি মূল অপরাধী নন। আপনি ভুল করেছেন। কিন্তু এই ভুলের নেপথ্যে আপনার মস্তিষ্ক নেই। আমরা জানি, আপনি কী পরিমাণ চাপে রয়েছেন।’ এরপরেই সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্রী মোদী ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে নিশানা করেন রাহুল। তাঁর সতর্কবার্তা— ‘মোদীজি, আপনাকে একটা কথা বলতে চাই। আপনার সরকারের ২০০ জন আধিকারিক আমাদের তথ্য দিচ্ছেন। ইডি, সিবিআই, বিদেশ মন্ত্রক— সরকারের বিভিন্ন স্তর থেকেই আমরা ভিতরের তথ্য পাচ্ছি। নরেন্দ্র মোদীর ব্লু প্রিন্ট, জন্মকুণ্ডলী আছে আমার কাছে— সেটা উনিও জানেন, আমিও জানি। এই প্রতিরোধ একদিনের নয়। আমরা থামব না। এটা চলবে। জন আন্দোলন হবে এটা।’
এ দিন রাহুলের শাণিত বক্তব্যের পাল্টা তাঁকে বিঁধেছেন বিজেপি নেতৃত্বও। পদ্ম–সাংসদ তথা প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুরের তোপ, ‘যখন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুজি ভোটচুরির প্রমাণ চেয়েছেন, তখন রাহুল পালিয়ে এসেছেন। নিজে ৯৯টা নির্বাচনে হেরেছেন, তাই কমিশনকে দোষ দেওয়া অভ্যেস হয়ে গিয়েছে ওঁর। এখন ভিত্তিহীন অভিযোগ করছেন।’ বিজেপি শাসিত অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার আক্রমণ— ‘রাহুল গান্ধী বিদেশি শক্তির ইশারায় কাজ করছেন। দেশে অরাজকতা তৈরি করতে চাইছেন।’
গত সপ্তাহেই রাহুল–সহ বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ শিবিরের নেতৃত্ব জ্ঞানেশকে অপসারণ এবং ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন (সার) বাতিলের দাবিতে রাষ্ট্রপতি ভবনে গিয়েছিলেন। এ দিন তাঁরা দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাইলেও সিজেআই সেই আবেদনে সাড়া দেননি। এ দিন বিকেলে রাহুল, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, সৌগত রায়, অখিলেশ যাদব–সহ বিরোধী শিবিরের নেতারা বারাখম্বা থেকে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত মিছিল শুরু করলে তাঁদের মাঝপথেই আটকে দেয় পুলিশ।
এই অভিযানের আগেই এ দিন সকালে রাহুল একের পর এক তোপ দাগেন সিইসি জ্ঞানেশ এবং কেন্দ্রীয় সরকারকে নিশানা করে। এ দিন সাংবাদিকরা রাহুলকে প্রশ্ন করেন, জ্ঞানেশ কুমার তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন কি না। তাতে রাহুল জানান, সিইসি–র তরফে মেসেজ তাঁর কাছে এসেছিল। তবে সেই বার্তায় কী বলা হয়েছে— তা তিনি খোলসা করেননি। কংগ্রেস সাংসদের বক্তব্য, ‘জ্ঞানেশ কুমার ভয়ে আছেন। রাতে ঘুমোতে পারছেন না।’ সুর চড়িয়ে তাঁর সংযোজন, ‘আমরা জানি, নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহ, অজিত ডোভাল আপনাকে বাধ্য করেছেন অন্যায় করতে। আমি জানি, উনিও (জ্ঞানেশ) এই সাংবাদিক বৈঠক দেখছেন। পাঁচ জন অপরাধীকে ন্যায়বিচারের সামনে দাঁড় করাবই আমরা।’
আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, রাহুল এ দিন দাবি করেছেন মোদী সরকারেরই অন্তত দুশো জন অফিসার ‘ভোটচুরি’র ইস্যুতে ‘ইন্ডিয়া’র অবস্থানকে সমর্থন করছেন। তাঁরা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও সরবরাহ করছেন বিরোধীদের। রাহুলের অভিযোগ, আন্দোলনকারীদের আটকাতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের পদক্ষেপে খুশি নন বহু পুলিশকর্মী। অন্তত ৫০ শতাংশ পুলিশকর্মী–অফিসার এই পদক্ষেপে এবং গণহারে যে ধরপাকড় চলছে, তাতে অসন্তুষ্ট। তাঁর কথায়, ‘সরকার যত বাহিনী মোতায়েন করবে, ততই ট্র্যাপে পড়বে। আমরা ছাড়ব না।’
সাংবাদিকদের উদ্দেশে রাহুল প্রশ্ন তোলেন, ‘আজ আমিই সাংবাদিক হয়ে আপনাদের প্রশ্ন করছি— আপনাদের মধ্যে কত জন আছেন যাঁরা বিশ্বাস করেন, প্রধানমন্ত্রী যা করছেন, সেটা ঠিক করছেন, তাঁরা হাত তুলুন।’ কোনও সাংবাদিক সেই সময়ে হাত তোলেননি৷ তখন নমোকে বিঁধে রাহুলের কটাক্ষ, ‘দেখুন, এক জনও হাত তুললেন না। মোদীজি, সাংবাদিকরাও সব জানেন। তাঁরা আপনাকে ভয় পাচ্ছেন না। আপনি এঁদের সবার নাম জানেন।’ রাহুল জানান, ‘ভোটচুরি’র যাবতীয় তথ্যপ্রমাণ তাঁরা তৈরি করছেন৷ শিগগিরই তা রাষ্ট্রপতির হাতে তুলে দেওয়া হবে৷ সুপ্রিম কোর্ট এবং শীর্ষ আদালতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের প্রতি পূর্ণ আস্থাও প্রকাশ করেন তিনি৷
রাহুল এবং ‘ইন্ডিয়া’ জোটকে নিশানা করেছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহানও। তিনি বলেন, ‘গত কয়েক বছর ধরে কংগ্রেস সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উপরে আক্রমণ চালিয়ে আসছে এবং নিজেদের পরাজয়ের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলিকেই দায়ী করছে। অথচ নির্বাচনী বিপর্যয়ের জন্য আসলে কংগ্রেস নেতৃত্বই দায়ী। কারণ, তাদের নেতৃত্ব দূরদৃষ্টিহীন৷’
এ সবের মাঝেই এ দিন বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশ দাবি করেছেন, সিইসি জ্ঞানেশ কুমার ইস্তফা না–দিলে কংগ্রেস আসন পুনর্বিন্যাস ইস্যুতে সরকারের সঙ্গে কোনও আলোচনায় যাবে না৷