মানুষের মধ্যে এমন কিছু গুণ আছে, যা বাহ্যিক বিচারে দুর্বলতা মনে হলেও আল্লাহর কাছে তা অত্যন্ত মূল্যবান। নম্রতা, কোমলতা, সহজ-সরল স্বভাব, মানুষের সঙ্গে সুন্দরভাবে মিশতে পারা ইত্যাদি তেমনই কিছু গুণ।
কোরআন-হাদিসের জ্ঞানের অভাবে অনেকের কাছে এ জাতীয় মানুষদের সস্তা মনে হলেও মহান আল্লাহর কাছে তারা মূল্যবান। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আমি কি তোমাদের জানিয়ে দেব না, কোন ব্যক্তির জন্য জাহান্নাম হারাম এবং জাহান্নামের জন্য কোন ব্যক্তি হারাম? যে ব্যক্তি মানুষের কাছাকাছি (জনপ্রিয়), সহজ-সরল, নম্রভাষী ও সদাচারী। -জামে তিরমিজি: ২৪৮৮
এখানে ‘সরলতা’ বলতে বুদ্ধির স্বল্পতা বা বাস্তবতা সম্পর্কে অজ্ঞতাকে বোঝানো হয়নি; বরং বোঝানো হয়েছে সেই নির্ভেজাল মনোভাবের কথা, যা মানুষের সঙ্গে নম্র ও সহজ আচরণ, অহংকারমুক্ত থাকা এবং অযথা কঠোরতা অবলম্বন করতে পারে না। হাদিসের ব্যাখ্যায়ও ‘হাইয়িন’ ও ‘সাহল’-এর মধ্যে সুন্দর চরিত্র ও সহজ ব্যবহারের দিকটি উল্লেখ করা হয়েছে।
এরা মূলত দুর্বল কিংবা অক্ষম, বোকা নয়; কিন্তু মহান আল্লাহকে ভয় করে, তার সন্তুষ্টির আশায় মানুষের সঙ্গে ভালো আচরণ করে। বিশুদ্ধ নিয়ত ও মুমিনের প্রতি সুধারণা থেকে তারা সবকিছুকে সহজভাবে দেখার চেষ্টা করে।
মহান আল্লাহ মানুষের প্রতিটি নিয়ত ও কর্মকাণ্ড দেখছেন। আর তিনি প্রতিটি কাজেরই উত্তম বিনিময় নির্ধারণ করে রেখেছেন। দুনিয়ার দৃষ্টিতে সহজ-সরল মুমিন কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঠকে গেলেও কোনো না কোনোভাবে তার প্রতিদান সে পাবেই। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি সংযম ও ধৈর্য অবলম্বন করে, আল্লাহ সেইরূপ সৎকর্মপরায়ণদের শ্রমফল নষ্ট করেন না।’ -সূরা ইউসুফ: ৯০
এই আয়াতটি মূলত অবতীর্ণ হয়েছে হজরত ইউসুফ (আ.)-এর ব্যাপারে। ছোটবেলায় যে ভাইয়েরা তাকে হত্যা করার জন্য কূপে নিক্ষেপ করেছিল, বহু বছর পর যখন তারা তাকে মিসরের অধিপতির আসনে দেখে অবাক হয়ে যায়, তখন হজরত ইউসুফ (আ.) নিজেই তার পরিচয় দিয়ে মহান আল্লাহর অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বোঝাতে চান যে তোমরা আমাকে নিঃশেষ করার ষড়যন্ত্রে কোনো প্রকার ত্রুটি করোনি, কিন্তু এটা আল্লাহর দয়া ও মেহেরবানি যে তিনি না শুধু আমাকে কুয়া থেকে পরিত্রাণ দিলেন; বরং মিসরের রাজত্বও দান করলেন।
আর এটা হলো সেই ধৈর্য ও সংযমের সুফল, যার তাওফিক আল্লাহ আমাকে দান করেছিলেন। তবে এটাও মাথায় রাখতে হবে, সরলতা কখনো অসতর্কতার নাম নয়। ইসলাম যেমন সুধারণা করতে শেখায়, তেমনি অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতেও শেখায়। কারো গোপন হিংসা ও বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে নিখুঁত চতুরতার ব্যাপারে অবগত হওয়ার পর, তাকে আর অন্ধভাবে বিশ্বাস করার সুযোগ নেই। সবরের নামে তাকে বিরামহীন ষড়যন্ত্র চালিয়ে যেতে দেওয়ার সুযোগ নেই। তার ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে। প্রতিশোধ না নিলেও জুলুম থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রকৃত মুমিন একই গর্ত থেকে দুবার দংশিত হয় না।’ -সহিহ বোখারি: ৬১৩৩
এই হাদিসের শিক্ষা এই নয় যে সীমালঙ্ঘনের জবাবে নিজেও সীমালঙ্ঘন করবে। কোনো অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া মানে সবার প্রতি সন্দেহপ্রবণ হয়ে যাওয়া নয়; বরং ভবিষ্যতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আরো বিবেচক হওয়া। একজন মানুষ নিজের নৈতিকতা ঠিক রেখেও নিজের দায়িত্ব, অধিকার ও স্বার্থের ব্যাপারে সচেতন থাকতে পারেন।
সচেতনতা মানে গণহারে সবার ওপর কুধারণা নয়। অনেকে নিছক অলীক চিন্তা ও কুধারণা থেকে তার অনেক হিতাকাঙ্ক্ষী বন্ধুর সঙ্গেও অবিচার করে বসে, যা মুমিনের জন্য কোনো অবস্থায়ই সমীচীন নয়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনারা, তোমরা অধিক অনুমান থেকে দূরে থাকো। নিশ্চয়ই কোনো কোনো অনুমান তো পাপ। আর তোমরা গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না এবং একে অপরের গিবত করো না। তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? তোমরা তো তা অপছন্দই করে থাকো। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ অধিক তওবা কবুলকারী, অসীম দয়ালু।’ -সূরা হুজুরাত: ১২
তাই কারো কোনো আচরণে কষ্ট পেলেই তার পেছনে খারাপ উদ্দেশ্য আছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। একই সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতাকে একেবারে অস্বীকার করাও বিচক্ষণতা নয়; বরং ঘটনার বাস্তবতা বোঝা, প্রয়োজনীয় শিক্ষা নেওয়া এবং মানুষের ব্যাপারে ন্যায়সংগত ধারণা রাখাই মুমিনের কর্তব্য।
মুমিনকে অবশ্যই ধৈর্যশীল হতে হবে, তবে ধৈর্য মানে অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া নয়; আবার সতর্কতা মানে হৃদয় কঠিন করে ফেলা নয়। প্রয়োজনে কারো ব্যাপারে সন্দেহ হলে, খোলামেলা আলোচনা করে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করা, তার অবস্থান বোঝা ও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা বুদ্ধিমানের কাজ। শুধু ভুল-বোঝাবুঝি থেকে অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি হয়, হয়তো আলোচনায় গেলে তা এক মুহূর্তে নিরসন হয়ে যেতে পারত।
মোটকথা হলো সরলতা যেন বোকামিতে পরিণত না হয়, সতর্কতা যেন সন্দেহপ্রবণতায় রূপ না নেয়, আর কষ্টের অভিজ্ঞতা যেন হৃদয়ের কোমলতা কেড়ে না নেয়, ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য এখানেই।
