জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় জাতিসংঘের তহবিল থেকে প্রথমবারের মতো ২ কোটি ডলার সহায়তা পেতে যাচ্ছে নেপাল। গত ২৬ আগস্ট ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির পর ‘ফান্ড ফর রেসপন্ডিং টু লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ থেকে দেশটির জন্য এ অর্থ বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কোনো দেশের জন্য তহবিলটি থেকে অর্থ অনুমোদনের ক্ষেত্রে এটিকে প্রথম ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গত বৃহস্পতিবার তহবিলটি নেপালের জন্য ২ কোটি ডলার বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নেয়। ২০২৩ সালে গঠিত এই তহবিলের লক্ষ্য জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনে সহায়তা করা।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) এক বিবৃতিতে অর্থ বরাদ্দের এই সিদ্ধান্তকে ‘জলবায়ু ন্যায়বিচার ও নেপালের সঙ্গে সংহতির ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক মাইলফলক’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
ইউএনডিপি জানায়, কপ-২৮ সম্মেলনের পর তহবিলটি কার্যকর হলেও আকস্মিক জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কোনো দেশকে সহায়তার জন্য এবারই প্রথম অর্থ অনুমোদন করা হলো। এই অর্থ নেপালের ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর পুনরুদ্ধার, পুনর্গঠন এবং জলবায়ু-সহনশীল জীবিকা গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।
তবে বন্যায় নেপালের যে পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার তুলনায় বরাদ্দের অর্থ খুবই সামান্য। নেপাল সরকার জানিয়েছে, বন্যায় দেশটির অবকাঠামো ও অর্থনীতিতে মোট ২৭০ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছে। সে হিসাবে জাতিসংঘের তহবিল থেকে পাওয়া ২ কোটি ডলার মোট ক্ষতির মাত্র শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ।
গত ৩১ আগস্ট নেপাল সরকার ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ সহায়তা হিসেবে ২ কোটি ডলার চেয়ে তহবিলে আবেদন করে। বন্যাটি চীনের তিব্বত সীমান্তসংলগ্ন নেপালের শহর ও গ্রামগুলোতে আঘাত হানে। এতে অসংখ্য ঘরবাড়ি, বিদ্যুৎ প্রকল্প, সড়ক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভেসে যায় বা পুরোপুরি ধ্বংস হয়।
দুর্যোগে প্রায় ১৫ হাজার পরিবারের ৬০ হাজার মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হন। নেপাল সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ১ হাজার ৫০০ মানুষ নিহত হয়েছেন এবং ৫ হাজারের বেশি মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। তবে প্রাথমিক প্রতিবেদনে নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।
তহবিলে পাঠানো চিঠিতে নেপালের অর্থমন্ত্রী ড. স্বর্ণিম ওয়াগলে বলেন, নেপাল স্বল্পোন্নত এবং জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি দেশ। বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনে নেপালের অবদান নগণ্য হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের অসম ও ক্রমবর্ধমান প্রভাব দেশটিকে বহন করতে হচ্ছে।
তবে বরাদ্দের অর্থকে যথেষ্ট মনে করছেন না নেপালের কয়েকজন জলবায়ু আন্দোলনকর্মী। দেশটির জলবায়ু আন্দোলনকর্মী ও সাবেক সংসদ সদস্য রাজেন্দ্র বাগজাইন ২ কোটি ডলারকে ‘দাঁতের ফাঁকে আটকে থাকা সামান্য খাবারের কণার’ সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর ভাষায়, এই অর্থ ত্রাণ নয়, বরং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রতি অপমান।
বাগজাইন বলেন, জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা করলেও দরিদ্র মানুষের ওপর এর প্রকৃত প্রভাব বিশ্লেষণে ব্যর্থ হচ্ছে।
এদিকে উন্নয়নশীল দেশগুলো এখন পর্যন্ত জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় তহবিলটিতে ১৭৬টি আবেদন করেছে। এসব আবেদনে মোট ২৮০ কোটি ডলার চাওয়া হয়েছে। বিপরীতে উন্নত দেশগুলো তহবিলে এখন পর্যন্ত ৮০ কোটি ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
নেপালের জন্য অর্থ অনুমোদনের সিদ্ধান্তকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর আর্থিক সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে ক্ষয়ক্ষতির তুলনায় তহবিলের অর্থের পরিমাণ কম হওয়ায় জলবায়ু ন্যায়বিচার ও আন্তর্জাতিক অর্থায়নের পর্যাপ্ততা নিয়ে প্রশ্নও রয়ে গেছে।
তথ্যসূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ
