৩৫ বছর ধরে কাঁধে করে গাছের চারা বিক্রি করে চলে সংসার, সন্তানদের পড়াশোনা। জীবিকার লড়াইয়ের পাশাপাশি নিজের অজান্তেই প্রকৃতিকে সবুজ করে চলেছেন রংপুর বদরগঞ্জের নাজমুল মন্ডল। রংপুর বিভাগ ও এর বাইরে গিয়েও গাছ বিক্রি করে বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন, বড় ছেলেকে মাধ্যমিক পড়িয়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন, সেই সাথে আরও তিন সন্তানের পড়াশোনা চালাচ্ছেন। নাজমুল মন্ডলের এই গাছ বিক্রি যেমন তার পরিবারের আয়ের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে, ঠিক তেমনি পরিবেশের রক্ষায় রাখছে ভূমিকা।
রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার কাশীগঞ্জ নাওপাড়া এলাকার নাজমুলকে জীবন যুদ্ধে নামতে হয় প্রতিদিনই। ভোর ৬ টায় ঘুম থেকে ওঠেন নাজমুল। এরপর পান্তা ভাত খেয়েই নদীপথে প্রায় ৩০ মিনিটের পথ অতিক্রম করে গাছ সংগ্রহ করেন তিনি। এরপর বদরগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশন থেকে ট্রেনে করে চলে যান বিভিন্ন জেলা শহরে। কখনও রংপুর, কখনও বা দিনাজপুর, নীলফামারী, পঞ্চগড়, লালমনিরহাট। এমনকি জয়পুরহাটেও গিয়ে তিনি গাছ বিক্রি করেছেন। এছাড়াও শহরের হাটগুলোতেও তাকে দেখা যায় মাঝে মাঝে।
নাজমুল মন্ডলের সংগ্রহে থাকে বেশিরভাগই সৌন্দবর্ধক গাছ। যেগুলো গাছ সৌখিন মানুষেরা পছন্দ করেন সেগুলো নিয়ে শহরের রাস্তাগুলোতে নিয়ে ফেরি করেন তিনি। প্রতিটি গাছে লাভ করেন ১৫-২০টাকা। এভাবে একদিনে তিনি ৪০ থেকে ৫০টি গাছের চারা বিক্রি করে থাকেন। দুপুরে সস্তা কোনো দোকানে গিয়ে ৫০ টাকার মধ্যে দুপুরের খাবার খেয়ে আবারও নেমে পড়েন গাছ বিক্রি করতে। এভাবে সারাদিন চলার পর সূর্য ডোবার সাথে সাথে বাড়ির দিকে রওনা হতে হয় নাজমুলকে। এভাবে ৩৫ বছর ধরে চলছে নাজমুল মন্ডলের জীবন। স্ত্রী, তিন সন্তান ও মাসহ ছয়জন নিয়ে নাজমুলের সংসার। স্ত্রী কুলসুম বেগম গৃহিণী এবং মা নবীজন এখন বার্ধক্যে ভুগছেন। বড় ছেলে শাহীন মন্ডল বিয়ে করে পেতেছেন আলাদা সংসার। বড় মেয়ে নাজমুন নাহারকে বিয়ে দিয়েছেন। বাকি এক ছেলে তুহিন কোরআনের হাফেজ ও দুই মেয়ে নুরে জান্নাত ও নুর জাহান পড়াশোনা করছে।
তিনি বলেন, গাছ বিক্রি করেই দুই সন্তানের বিয়ে দিয়েছি, তিন সন্তানের পড়ালেখার খরচ চালাচ্ছি। সেই সাথে সংসারও চলছে এই গাছ বিক্রির টাকা দিয়েই। কখনও কারো কাছ থেকে সহযোগিতা পাইনি। ৩৫ বছর ধরে গাছের ভার কাধে করে নিয়ে রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলাতে গিয়ে চারা বিক্রি করেছি। প্রতিদিন ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা আয় করি। তা দিয়ে পরিবার চালাচ্ছি। এখন বয়স বেড়েছে, তাই আগের মতো গাছ বিক্রি করতে দুরে যেতে পারি না। জীবনের শেষ সময়ে এসে যেন কারো কাছে হাত পেতে চলতে না হয় এই প্রত্যাশাই করি।
প্রকৃতি ও জীবন ক্লাবের উপদেষ্টা মোঃ হাশেম আলী বলেন, নাজমুল মন্ডল এই গাছ বিক্রির মাধ্যমে একদিকে যেমন তার পরিবার চালাতে পারছেন, অন্যদিকে প্রকৃতিকে সবুজায়ন করতেও তার অবদান রয়েছে। সরকারসহ সংশ্লিষ্টদের উচিত নাজমুল মন্ডলের এমন মহৎ উদ্যোগকে সম্মান জানানো।
