সবকিছু ঠিক থাকার পরও মন খারাপ হয় কেন? মনোবিজ্ঞান কী বলে
ফারজিয়া হোসেনপ্রকাশ:
জীবনে বড় কোনো সমস্যা নেই, পরিবার ভালো আছে, কাজ চলছে, কাছের মানুষরাও পাশে আছেন। তারপরও কখনো কখনো মন খারাপ লাগে। কোনো কিছুতেই আগ্রহ পাওয়া যায় না, কারও সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা করে না। অথচ কেন এমন হচ্ছে, তার স্পষ্ট কোনো কারণও খুঁজে পাওয়া যায় না।
অনেকেই এমন অনুভূতিকে গুরুত্ব দেন না। ভাবেন, হয়তো সাময়িক ক্লান্তি কিংবা মনের দুর্বলতা। কিন্তু মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, কারণ বুঝতে না পারলেও মনের এই পরিবর্তনের পেছনে বিভিন্ন বিষয় কাজ করতে পারে।
সব অনুভূতির পেছনে কি নির্দিষ্ট কারণ থাকে?
আমরা অনেক সময় মনে করি, মন খারাপ হওয়ার জন্য বড় কোনো ঘটনা ঘটতে হবে। বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়। দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব, কাজের ক্লান্তি, একাকিত্ব কিংবা জমে থাকা দুশ্চিন্তা ধীরে ধীরে মনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। কখনো আবার একসঙ্গে অনেক দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে মানুষ নিজের প্রয়োজন ও অনুভূতির দিকে মনোযোগ দেওয়ার সময় পান না। বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরে তৈরি হতে পারে মানসিক ক্লান্তি।
অতিরিক্ত চিন্তা কি মন খারাপ বাড়ায়?
একই বিষয় বারবার ভাবা, অতীতের ভুল নিয়ে অনুশোচনা করা কিংবা ভবিষ্যতে কী হবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তা করা মনের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। মনোবিজ্ঞানে একই নেতিবাচক চিন্তার চক্রে বারবার ফিরে যাওয়াকে ‘রুমিনেশন’ বলা হয়। যেমন, কেউ হয়তো কর্মক্ষেত্রে একটি ভুল করেছেন। কাজটি ঠিক করার সুযোগ থাকলেও তিনি বারবার ভাবছেন, সবাই তাকে অযোগ্য মনে করবে কি না। এতে সমস্যার সমাধান না হয়ে উদ্বেগ আরও বাড়তে পারে।
তবে চিন্তা করা আর একই চিন্তায় আটকে থাকা এক বিষয় নয়। কোনো সমস্যা নিয়ে ভাবার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সমাধান খোঁজা, নিজেকে বারবার দোষারোপ করা নয়।
অন্যদের সঙ্গে নিজের জীবন তুলনা করা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যদের সাফল্য, ভ্রমণ, সুন্দর সম্পর্ক কিংবা আনন্দের মুহূর্ত দেখে নিজের জীবনকে অসম্পূর্ণ মনে হতে পারে। মনে হতে পারে, সবাই এগিয়ে যাচ্ছে, শুধু আমি পিছিয়ে আছি।
কিন্তু অনলাইনে দেখা দৃশ্য কারও জীবনের সম্পূর্ণ চিত্র নয়। অন্যের সাফল্যের মুহূর্তের সঙ্গে নিজের প্রতিদিনের সংগ্রামের তুলনা করলে অযথা হতাশা তৈরি হতে পারে। প্রত্যেক মানুষের জীবনের পরিস্থিতি, সুযোগ, দায়িত্ব ও এগিয়ে যাওয়ার গতি আলাদা। তাই নিজের অগ্রগতি বিচার করার সময় অন্যের জীবনের সঙ্গে তুলনা না করে নিজের বাস্তবতা বোঝা জরুরি।
মন ভালো রাখতে কী করা যায়?
প্রথমেই নিজের অনুভূতিকে অস্বীকার না করে তা বোঝার চেষ্টা করা দরকার। পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ, পুষ্টিকর খাবার এবং কাছের মানুষের সঙ্গে কথা বলা মানসিক সুস্থতায় সহায়ক হতে পারে। কিছু সময় ফোন থেকে দূরে থাকা, পছন্দের কাজে সময় দেওয়া কিংবা খোলা পরিবেশে হাঁটাও ভালো লাগতে পারে। তবে মন খারাপের কারণ বুঝতে না পারলে নিজেকে দোষ দেওয়া উচিত নয়। মন খারাপ যদি দীর্ঘদিন স্থায়ী হয়, আগে ভালো লাগত এমন কাজেও আগ্রহ কমে যায়, দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হয় কিংবা ঘুম ও খাওয়ার অভ্যাসে বড় পরিবর্তন আসে, তাহলে মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
সব সময় ভালো থাকার অভিনয় করতে হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। মানুষের জীবনে আনন্দের পাশাপাশি ক্লান্তি, হতাশা ও অনিশ্চয়তাও আসে। কখনো মন খারাপের কারণ বুঝতে সময় লাগে, কখনো প্রয়োজন হয় অন্য কারও সহায়তা।
নিজের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া দুর্বলতা নয়। বরং কখন থামতে হবে, কখন বিশ্রাম নিতে হবে এবং কখন সাহায্য চাইতে হবে তা বুঝতে পারাও নিজের যত্ন নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…
