রাঙামাটির সাজেক পর্যটন সড়কের উজোবাজারে (গঙ্গারাম বাজার) আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলির ঘটনার জেরে আজ (শনিবার) দুই পার্বত্য জেলা রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে আধাবেলা সড়ক ও নৌপথে অবরোধ ডেকেছে ইউপিডিএফ ‘ঘনিষ্ঠ’ ছাত্র–জনতার সংগ্রাম পরিষদ নামে পাহাড়িদের একটি সংগঠন। অন্যদিকে, ইউপিডিএফ ‘ঘনিষ্ঠ’ স্থানীয় দুটি সংগঠনের অনির্দিষ্টকালের অবরোধ কর্মসূচি অব্যাহত থাকা এবং প্রশাসনের সাজেক ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞায় কার্যত সাজেক এখন পর্যটকশূন্য। অবরোধ আর প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞার কারণে আর্থিক ঝুঁকিতে পড়েছেন সাজেককেন্দ্রিক পর্যটন সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা। সাজেক উপত্যকায় অবস্থিত শতাধিক রিসোর্ট–কটেজের বুকিং বাতিল হওয়ায় অর্থফেরত দিতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের।
এদিকে, গত বৃহস্পতিবার দুপুরে সাজেকের উজোবাজারে সংঘাতপূর্ণ পরিবেশের পর এখনো সেখানে থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে। বাজারের দোকান–পাটও বন্ধ। আতঙ্ক কাটেনি স্থানীয় বাসিন্দাদের। গতকাল শুক্রবার সাজেক সড়কের কয়েকটিস্থানে বিক্ষিপ্তভাবে টায়ার জ্বালিয়ে অবরোধ পালনের কথা জানা গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার সকাল ৬টা থেকে সাজেক–বাঘাইহাট সড়কের ১০ নম্বর, ১৪ কিলোমিটারসহ সাজেক সড়কের বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষিপ্তভাবে সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে অবরোধ পালন করেছেন অবরোধকারীরা। অবরোধে যানচলাচল বন্ধ থাকলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
সাজেক গণ–অধিকার রক্ষা কমিটির সদস্য সচিব বিজয় কান্তি চাকমা বলেন, ‘আমাদের অবরোধ অব্যাহত রয়েছে। সকালে সাজেক সড়কের বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষিপ্তভাবে টায়ার জ্বালিয়ে অবরোধ পালন করা হয়েছে। আমাদের অবরোধ চলমান থাকবে। বৃহস্পতিবারের ঘটনায় আমাদের প্রায় শতাধিক মানুষ আহত হয়েছে। তার মধ্যে গুরুতর আহত রয়েছে আটজন।’
সাজেক উজোবাজার (গঙ্গারাম বাজার) এলাকার এক বাসিন্দা জানিয়েছেন, ‘বৃহস্পতিবার উজোবাজার এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনার পর থেকে এলাকার মানুষ তাদের ঘর–বাড়ি, দোকানপাট ফেলে অন্য জায়গায় পালিয়ে গেছে। ভয়ে আতঙ্কে তারা এলাকায় ফিরতে পারছে না। বিক্ষিপ্তভাবে কে কোথায় গেছে তা সঠিকভাবে বলা যাচ্ছে না। বাজারে দোকানপাট এখনো বন্ধ রয়েছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রয়েছে।’
সাজেক উজোবাজার ব্যবসায়ী সমিতির এক নেতা জানান, ‘আমরা ভয়ে দোকানে–বাড়িঘরে যেতে পারছি না। বাজারের লোকজন বাড়ি–ঘর, দোকান ফেলে যে যেখানে পারে আশ্রয় নিয়েছে। বৃহস্পতিবার অনেকে আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে, অনেকে জঙ্গলে বাগানে আশ্রয় নিয়েছে। লোকজন ভয়ে বাড়িঘরে ফিরতে পারছে না। দোকানপাট বন্ধ।’
রাঙামাটির পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুর রকিব শুক্রবার সন্ধ্যায় জানিয়েছেন, ‘সাজেকের উজোবাজারসহ আশপাশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখন ভালো। সবকিছু স্বাভাবিক আছে। এ ঘটনায় এখনো কোনো মামলা হয়নি। যারা ভয়ে–আতঙ্কে পালিয়ে গেছে, তাদের নিজ বাড়ি ঘরে ফিরতে কোনো সমস্যা নেই। আমার মনে হয় না কোনো অসুবিধা হবে। তাদের আসতে কোনো সমস্যা নেই।’
শুক্রবার বিকালে এক বিবৃতিতে দুই পার্বত্য জেলায় অবরোধ ডাকা সংগঠন ছাত্র–জনতার সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি উষাতন চাকমা বলেন, ‘সাজেকের সামরিক–বেসামরিক প্রশাসন সেখানকার আন্দোলনরত জনগণের দাবি মেনে নিলেও তা বাস্তবায়ন করেনি। এই ব্যর্থতা ঢাকতে বৃহস্পতিবার উজোবাজারে শান্তিপূর্ণ অবরোধ পালনকারী জনগণের ওপর পরিকল্পিতভাবে হামলা ও নির্বিচারে লাঠিচার্জসহ শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে। হামলায় অন্তত ৭৮ জন নারী–পুরুষ, বৃদ্ধ আহত হয়েছেন। শনিবার রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে আধাবেলা শান্তিপূর্ণ অবরোধ কর্মসূচি পালন করা হবে।’
এদিকে, সাজেকে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ভরা মৌসুমেও সেখানকার পর্যটন অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে। গত বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হওয়া সড়ক অবরোধ কর্মসূচি আর প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে বুকিং হারাচ্ছেন রিসোর্ট–কটেজ মালিক ও সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা। সাজেক রিসোর্ট–কটেজ মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, সাজেকে প্রায় ১২০টি রিসোর্ট–কটেজ রয়েছে। এসব রিসোর্ট কটেজে প্রায় তিন হাজার পর্যটকের আবাসনের ব্যবস্থা রয়েছে। প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হওয়ার পর ১৬ অক্টোবর থেকে সাজেকে পর্যটকদের ব্যাপক সমাগম ঘটেছে। তবে ২২ অক্টোবর বৃহস্পতিবার থেকে আবারও অবরোধ শুরু হওয়ার কারণে আগে যা বুকিং ছিল সেগুলো বাতিল হচ্ছে।
সাজেক ভ্যালির রুইলুই হলিডে রিসোর্টের ব্যবস্থাপক রাশু চাকমা জানিয়েছেন, ‘চলমান অস্থিরতার মাঝেও আমাদের রিসোর্টে ১০টি কক্ষ বুকিং ছিল। বৃহস্পতিবারের অবরোধের কারণে সবগুলো বাতিল হয়েছে। আমরা ইতোমধ্যে পর্যটকদের বুকিংয়ের টাকা ফেরত দিয়েছি। এমন পরিস্থিতি সব রিসোর্টেই। সেহেতু কোনো পর্যটক আসার সুযোগ নেই।’ সাজেক রিসোর্ট–কটেজ মালিক সমিতি সহ–সাধারণ সম্পাদক মতিজয় ত্রিপুরা বলেন, ‘সাজেক ভ্যালিতে যেসব রিসোর্ট–কটেজগুলো রয়েছে সেগুলো অনেকের ২৫, ২৮, ৩০ তারিখ পর্যন্ত কক্ষ বুকিং ছিল। সে বুকিংগুলো অবরোধ ও ঝামেলার কারণে বাতিল হচ্ছে। আজও (শুক্রবার) অনেকের বুকিং বাতিল হয়েছে। এভাবে বুকিং বাতিল হলে পর্যটকরা আসতে না পারলে পর্যটনে বড় একটা ধস নামতে পারে।’
মূলত পার্বত্য চট্টগ্রামের সাজেক উপত্যকা পর্যটন ও বিনোদনকেন্দ্রটি রাঙামাটি জেলায় অবস্থিত হলেও এর অর্থনৈতিক প্রভাব পড়ে খাগড়াছড়ি জেলায়ও। পর্যটকরা অনেকেই খাগড়াছড়ি জেলা ভ্রমণ করে জেলার দীঘিনালা হয়ে সাজেক যান। তবে চলমান অস্থিরতার কারণে সাজেক পর্যটন নেটওয়ার্কে নেতিবাচক প্রভাব হানছে। বিশেষত যানবাহন সেক্টরে প্রভাব বেশি। আবার সাজেকে যেতে না পারায় খাগড়াছড়িতেও পর্যটকদের আনাগোনা কমবে বলছেন সংশ্লিষ্টরা। যে কারণে সাজেক ভ্রমণ সচল করার দাবিতে শুক্রবার বিকালে খাগড়াছড়িতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটনবিষয়ক গবেষক ও রাঙামাটির প্রথম ইকো রিসোর্ট রাইন্যা টুগুন ইকো রিসোর্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ললিত সি. চাকমা বলেন, ‘পাহাড়ে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা তৈরি হলে সেটির প্রভাব কেবল পর্যটন সেক্টর নয়, সবখাতেই কম–বেশি পড়ে। যেমন সাজেকে পর্যটক যেতে না পারায় পরিবহন ও খাদ্যপণ্য সরবরাহ সংশ্লিষ্টদের মধ্যেও এর প্রভাব পড়েছে। আবার বিনিয়োগকারীদের খরচ, জনবলের বেতন–ভাতাসহ আনুষাঙ্গিক অনেক বিষয়ই নির্ভর করে। যেহেতু সেখানে একটা অস্থিরতা বা উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, কাজের এটির দ্রুত টেকসই সমাধান জরুরি। পর্যটন সংশ্লিষ্টতার কারণে শুধু পর্যটন খুলে দিলেই এটির সুষ্ঠু সমাধান আসবে।’
রাঙামাটি শহরকেন্দ্রিক পর্যটনস্পটে লোক সমাগম:
সাজেকের রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব খাগড়াছড়ির পর্যটন অর্থনীতিতে প্রভাব ফেললেও রাঙামাটিতে তেমন প্রভাব পড়েনি। রাঙামাটি শহরকেন্দ্রিক ও আশপাশের পর্যটনস্পটগুলোতে জনসমাগম দেখা গিয়েছে। রিসোর্ট–কটেজ ও হোটেল–মোটেলেও ছিল উল্লেখযোগ্য পর্যটকের উপস্থিতি রয়েছে। শহরের পর্যটন ঝুলন্ত সেতু, পলওয়েল পার্ক, কাপ্তাই হ্রদ আশপাশের পর্যটন স্পটে পর্যটক উপস্থিতি ছিল।
রাঙামাটি সদর উপজেলায় অবস্থিত বার্গী লেকভ্যালির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও রাঙামাটি রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সুমেত চাকমা বলেন, ‘সাজেকের পর্যটনকেন্দ্রিক অস্থিরতার কোনো নেতিবাচক প্রভাব এখানে নেই। উল্টো আমাদের বার্গী লেকভ্যালিতে রিসোর্টে আগত পর্যটক ও সাধারণ দর্শনার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। আগে যেখানে ২০০–৩০০ জন দর্শনার্থী প্রতিদিন এখানে বেড়াতে আসতেন, সেখানে গতকাল এসেছেন ৫২৮ জন। আজকে প্রায় হাজারখানেক দর্শনার্থী এসেছেন। এছাড়া আমাদের রিসোর্টের সবগুলো রুম বুকড আছে।’
রাঙামাটির পর্যটন হলিডে কমপ্লেঙের ব্যবস্থাপক আলোক বিকাশ চাকমা বলেন, ‘মোটেলের ৯০ শতাংশ কক্ষ বুকড। আরও আশা করেছিলাম। এবার পূজাকে কেন্দ্র করে টানা ছুটিতে রাঙামাটিতে রেকর্ড সংখ্যক পর্যটন এসেছেন। পর্যটন মৌসুমের শুরুতেই ভালো পর্যটক আসছে, আশাকরি এ মৌসুম ভালো হবে। সাজেকের অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের কোনো ধরনের বুকিং বাতিল হয়নি। তবে সাজেকের কারণে পর্যটক রাঙামাটি শহরে বেড়েছে কিনা তা ধারণা নেই। পর্যটন ঝুলন্ত সেতুততে দেড়–দুই হাজার টিকেট বিক্রি হচ্ছে প্রতিদিন।’

