ধানের দানায় দেবী দুর্গার প্রতিমা। প্রায় ৩০ কেজি চিনিগুঁড়া ধানে তৈরি প্রতিমাটি দেখতে বিভিন্ন এলাকা থেকে ছুটে আসছেন দর্শনার্থীরা। অভিনব এই নির্মাণশৈলী ঘিরে মণ্ডপে তৈরি হয়েছে বাড়তি মানুষের কৌতূহল। খুলনা নগরীর বাগমারা তেঁতুলতলা সার্বজনীন পূজামণ্ডপে এবার তৈরি হয়েছে এমনই এক ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত বাগমারা তেঁতুলতলা সার্বজনীন পূজা মন্দিরে প্রতিবছরই বিভিন্ন পূজা-অর্চনার আয়োজন হয়ে আসছে। তবে ১৯৯৮ ও ১৯৯৯ সালে বৈদ্যুতিক পদ্ধতিতে প্রতিমার সঙ্গে সিংহের গর্জনের শব্দ যুক্ত করে ব্যতিক্রমী আয়োজন করা হয়েছিল। সে সময়ও বিষয়টি ব্যাপক সাড়া ফেলে। এবার চিনিগুঁড়া ধানে দুর্গাপ্রতিমা নির্মাণের মধ্য দিয়ে মণ্ডপটি আবারও দর্শনার্থীদের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।
মন্দিরটিতে এবারই প্রথম ধান দিয়ে দুর্গাপ্রতিমা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রায় ৩০ কেজি চিনিগুঁড়া ধান দিয়ে চারজন ভাস্কর টানা দেড় মাসের পরিশ্রমে প্রতিমাটি নির্মাণ করেছেন। আয়োজকদের দাবি, খুলনা জেলায় ধান দিয়ে দুর্গাপ্রতিমা তৈরির এমন আয়োজন এবারই প্রথম।
খুলনা নগরীর পাশাপাশি কয়রা, পাইকগাছা, সাতক্ষীরা, মানিকগঞ্জ ও বরিশালের বিভিন্ন স্থান থেকে দর্শনার্থীরা প্রতিমাটি দেখতে আসছেন। তাঁদের অনেকের কাছে ধানের দানায় তৈরি দেবীর এমন রূপ একেবারেই নতুন। প্রতিমার ব্যতিক্রমী নির্মাণশৈলী মুগ্ধ করছে দর্শনার্থীদের।
পাইকগাছা থেকে আসা দর্শনার্থী ইন্দ্রারানী সাহা রিতু বলেন, চিনিগুঁড়া ধান দিয়ে দুর্গাপ্রতিমা তৈরি করা হয়েছে, বিষয়টি আমার কাছে বেশ ব্যতিক্রমী মনে হয়েছে। প্রতিমার কারুকাজ দেখে মুগ্ধ হয়েছি। বাংলার কৃষি ও ঐতিহ্যকে এভাবে তুলে ধরার উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়।
সাতক্ষীরা থেকে আগত আরেক দর্শনার্থী শোভন দেবনাথ বলেন, সাধারণত মাটি দিয়ে তৈরি দুর্গাপ্রতিমা দেখা হয়। তবে ধানের দানায় তৈরি এমন প্রতিমা এবারই দেখলাম। প্রতিমার নির্মাণশৈলী ও সৃজনশীলতা আমাকে মুগ্ধ করেছে। এমন আয়োজন দুর্গোৎসবে ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে।
মন্দির পূজা উদ্যাপন কমিটির সভাপতি রনজিত কুমার রায় খুলনা গেজেটকে বলেন, ধান শুধু খাদ্য নয়, ধান আমাদের জীবন, ঐতিহ্য ও অস্তিত্বের প্রতীক। সেই সোনালি ধান দিয়ে মায়ের প্রতিমা নির্মাণের মধ্য দিয়ে বাংলার কৃষি ও সংস্কৃতিকে দেবী আরাধনার সঙ্গে একসূত্রে গেঁথেছি।
তিনি বলেন, সোনালি ধানে তৈরি দুর্গাপ্রতিমা শুধু ধর্মীয় বিশ্বাস ও ভক্তির প্রতীক নয়, এটি কৃষি, প্রকৃতি ও গ্রামীণ সংস্কৃতিরও অনন্য প্রকাশ। ধান এ দেশের মানুষের জীবিকা, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে কৃষকসমাজের অবদানকে সম্মান জানানোর পাশাপাশি প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের নিবিড় সম্পর্ক তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
রনজিত কুমার রায় আরও বলেন, দুর্গোৎসব ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও সামাজিক মিলনের উপলক্ষ্য। ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার।’ এই চেতনায় সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের অংশগ্রহণ প্রত্যাশা করেন তাঁরা।
এদিকে, গতকাল শনিবার মহাসপ্তমী উপলক্ষ্যে খুলনার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে চলে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান। শাস্ত্রীয় বিধান অনুসারে নবপত্রিকা স্নান ও পূজামণ্ডপে স্থাপনের মধ্য দিয়ে দিনের গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়। প্রচলিত ভাষায় নবপত্রিকা ‘কলাবউ’ নামে পরিচিত। কলাগাছ, কচুগাছ, হলুদ গাছ, জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক, মানকচু ও ধানগাছ এই নয়টি উদ্ভিদ দিয়ে নবপত্রিকা প্রস্তুত করা হয়।
নবপত্রিকা পূজায় প্রকৃতি ও উদ্ভিদজগতের সঙ্গে দেবী আরাধনার যোগসূত্র প্রতিফলিত হয়। মন্ত্রপাঠ, পুষ্পাঞ্জলি, ভোগ ও আরতির মধ্য দিয়ে দেবীর প্রতি ভক্তি নিবেদন করেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। সন্ধ্যায় ধূপ-প্রদীপ, ঘণ্টা, শঙ্খ ও ঢাকের শব্দে মুখর হয়ে ওঠে পূজামণ্ডপগুলো। এরই মধ্যে চিনিগুঁড়া ধানে নির্মিত দুর্গাপ্রতিমাটি এবারের শারদীয় উৎসবে যোগ করেছে ভিন্নমাত্রা।
খুলনা গেজেট/এনএম
