ঘটনাটি ২০০২ সালের। মার্কিন তিন বন্ধু—স্কট সিম্যানস, লিন্ডন হ্যানসন ও জর্জ বোডডেকার জুনিয়র ক্যারিবিয়ান সাগরে নৌকা ভ্রমণে গিয়েছিলেন। নৌকায় বারবার পা ও জুতো ভিজে যাওয়ার সমস্যা থেকে তাদের মাথায় পানির উপযোগী জুতোর ভাবনা আসে। তারা এমন এক জুতো বানাতে চেয়েছিলেন, যা পানিতে ভিজবে না, পিছলে যাবে না এবং পরতে হবে দারুণ আরামদায়ক
দেখতে একেবারেই স্টাইলিশ নয়। কেউ কেউ মজা করে বলেন ‘প্লাস্টিকের নৌকা’, আবার অনেকের কাছে ‘বিদঘুটে’। এমনকি বিখ্যাত মার্কিন সাময়িকী টাইম ম্যাগাজিনের দৃষ্টিতেও একসময় এটি ছিল বিশ্বের ৫০টি সবচেয়ে বাজে আবিষ্কারের একটি। অথচ সেই ‘ক্রোকস’ জুতো আজ কোটি কোটি ডলারের ব্যবসা করছে; বিশ্বখ্যাত তারকা থেকে শুরু করে জেন-জি প্রজন্মের জনপ্রিয় ফ্যাশন ট্রেন্ড হয়ে উঠেছে। অনলাইনের ট্রল আর বিদ্রূপকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ক্যারিবীয় সাগরের বোটিং শু থেকে পপ সংস্কৃতির আইকন হয়ে ওঠার এই যাত্রা পাদুকা শিল্পেই এনে দিয়েছে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন।
ঘটনাটি ২০০২ সালের। মার্কিন তিন বন্ধু—স্কট সিম্যানস, লিন্ডন হ্যানসন ও জর্জ বোডডেকার জুনিয়র ক্যারিবিয়ান সাগরে নৌকা ভ্রমণে গিয়েছিলেন। নৌকায় বারবার পা ও জুতো ভিজে যাওয়ার সমস্যা থেকে তাদের মাথায় পানির উপযোগী জুতোর ভাবনা আসে। তারা এমন এক জুতো বানাতে চেয়েছিলেন, যা পানিতে ভিজবে না, পিছলে যাবে না এবং পরতে হবে দারুণ আরামদায়ক।
সেই তিন বন্ধু স্কট সিম্যানস, লিন্ডন হ্যানসন ও জর্জ বোডডেকার জুনিয়র
সেই ভাবনা থেকে কানাডীয় প্রতিষ্ঠান ‘ফোম ক্রিয়েশনস’-এর থেকে ‘ক্রসলাইট’ নামের এক বিশেষ ফোম উপাদানের স্বত্ব কিনে নেন তারা। তৈরি করেন বিশেষ ধরনের এ জুতোর প্রথম মডেল ‘দ্য বিচ’। ফ্লোরিডার এক বোট শো-তে ২০০ জোড়া জুতো নিয়ে হাজির হতেই নিমেষে সব বিক্রি হয়ে যায়।
জুতোর নাম ‘ক্রোকস’ রাখার পেছনেও রয়েছে দারুণ এক গল্প। জল ও স্থল—উভয় পরিবেশেই কুমির যেমন সমান স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে পারে, এই জুতোটিও ঠিক তেমনই পানিতে ও সাধারণ রাস্তায় সমান উপযোগী। এই ‘উভচর’ গুণের কারণেই কুমিরের নাম থেকে জুতোটির নাম রাখা হয় ক্রোকস।
ক্রোকস দেখতে রবার বা ফোমের মতো হলেও মূলত এটি এক বিশেষ ধরনের প্লাস্টিক। এর আসল উপাদান ‘পলিইথিলিন ভিনাইল অ্যাসিটেট’। ইনজেকশন মোল্ডিং প্রযুক্তিতে গলিত প্লাস্টিকের ভেতর গ্যাস প্রয়োগ করে এই ফোমি গঠন তৈরি করা হয়। ফলে জুতোটি একাধারে হালকা, টেকসই এবং ব্যবহারকারীর পায়ের তাপমাত্রায় নরম হয়ে পায়ের নিখুঁত আকৃতি নেয়। বাতাস চলাচলের জন্য প্রতিটি জুতোয় ঠিক ১৩টি করে ফুটো রাখা হয়। জলনিরোধক ও সহজে পরিষ্কার করার সুবিধার কারণে প্রথম দিকে জেলে, মাঝি, চিকিৎসক, নার্স ও শেফদের মতো দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে কাজ করা পেশাজীবীরা এটি লুফে নেন।
জুতোর নাম ‘ক্রোকস’ রাখার পেছনেও রয়েছে দারুণ এক গল্প। জল ও স্থল—উভয় পরিবেশেই কুমির যেমন সমান স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে পারে, এই জুতোটিও ঠিক তেমনই পানিতে ও সাধারণ রাস্তায় সমান উপযোগী। এই ‘উভচর’ গুণের কারণেই কুমিরের নাম থেকে জুতোটির নাম রাখা হয় ক্রোকস
২০০৫ সালে শেরি স্মেলজার নামের এক মার্কিন মা নিজের সন্তানদের ক্রোকস জুতোর ছিদ্র সাজানোর জন্য ছোট ছোট প্লাস্টিকের অলঙ্কার বা চার্ম তৈরি শুরু করেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যে এ মডেল বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। মাথায় আসে ব্যবসার ভাবনা। স্বামী রিচকে নিয়ে গড়া এ ব্যবসার নাম দেন ‘জিবিটজ’। মাত্র ছয় মাসের মধ্যে তাদের আয় প্রতি মাসে ২ লাখ ডলার থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ২০ লাখ ডলারে! ২০০৬ সালে ক্রোকস কোম্পানি ১০ মিলিয়ন ডলার নগদ দিয়ে এই পারিবারিক প্রতিষ্ঠানটি কিনে নেয়, যা আজ ক্রোকস সাম্রাজ্যের সবচেয়ে লাভজনক ও বিশাল এক আয়ের উৎস।
২০০৮ সালের বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দায় অতিরিক্ত জুতোর জোগান ও নকল ক্রোকসের বাজারে ধস নামে কোম্পানিতে। অনেকেই ভেবেছিলেন এই ‘বিদঘুটে’ জুতোর দিন শেষ। কিন্তু ২০১৬ সালে লন্ডন ফ্যাশন উইকে ডিজাইনার ক্রিস্টোফার কেইন নতুন মোড় এনে দেন। রত্নখচিত ক্রোকস পরিয়ে তিনি মডেলদের র্যাম্পে হাঁটান—সূচনা হয় ‘ক্রোকস চিক’ যুগের।
ক্রোকসের ব্যবসায় নতুন মাত্রা যোগ করেন শেরি স্মেলজার ও তার স্বামী রিচ
এর পর ব্যালেন্সিয়াগার ৪-ইঞ্চি প্লাটফর্ম ক্রোকস কিংবা জাস্টিন বিবার, ব্যাড বানি ও কেএফসির সঙ্গে একের পর এক কোলাবোরেশন জেন-জি প্রজন্মের কাছে ক্রোকসকে আত্মপ্রকাশের মূল হাতিয়ার বানিয়ে ফেলে। পরবর্তীতে ২০২০ সালের করোনাকালে গৃহবন্দী মানুষের আরামদায়ক পোশাক-আশাকের চাহিদায় বিশেষ জায়গা করে নেয় ক্রোকস। সে বছরই এর বিক্রি বেড়ে বার্ষিক ৪ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকে।
ক্রোকসের স্থায়িত্বই এখন পরিবেশের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে তৈরি হওয়ায় এগুলো প্রায় অবিনশ্বর—ল্যান্ডফিলে ফেললেও সহজে পচে না। তবে পরিবেশগত প্রভাব কমাতে কোম্পানিটি বর্তমানে কাঠ প্রক্রিয়াজাতকরণের বাই-প্রোডাক্ট থেকে তৈরি বায়োপ্লাস্টিক ব্যবহার এবং যুক্তরাষ্ট্রে পুরনো জুতো রিসাইক্লিং বা পুনর্ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে।
ঘরকুনো আরাম থেকে হাই-ফ্যাশনের র্যাম্প—সব জায়গায় আজ ক্রোকস অনিবার্য বাস্তবতা। ভালোবাসুন কিংবা ঘৃণা করুন, আধুনিক জুতো সংস্কৃতিতে ‘বিদঘুটে’ ক্রোকসের প্রভাব আজ অস্বীকার করার উপায় নেই।
সূত্র: দ্য স্টাইল হিস্টোরিয়ান, বিবিসি, ওয়ার্ল্ড ফুটওয়্যার
