বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সরকারি ঋণ যুক্তরাষ্ট্রের। ঋণের মোট পরিমাণের পাশাপাশি অর্থনীতির আকারের তুলনায় ঋণের অনুপাত, সুদ পরিশোধের সক্ষমতা এবং রাজস্ব আয়ের বিপরীতে ঋণের বোঝা - এসব সূচকও একটি দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও শুধু মোট ঋণের অঙ্ক দিয়ে পরিস্থিতি বিচার করা যথেষ্ট নয়; ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা, বৈদেশিক মুদ্রার প্রাপ্যতা এবং সরকারের রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতাও বিবেচনায় নিতে হবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারি ঋণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সুদ পরিশোধের ব্যয়ও বাড়ছে। এতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও সামাজিক সুরক্ষার মতো খাতে অর্থ বরাদ্দের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। তবে সব দেশের ঋণ পরিস্থিতি এক নয়। কোনো দেশের ঋণের পরিমাণ বেশি হলেও নিজস্ব মুদ্রায় ঋণ নেওয়ার সুবিধা ও শক্তিশালী অর্থনীতি তার ঝুঁকি কমাতে পারে। অন্যদিকে, রাজস্ব আয় কম এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর নির্ভরতা বেশি হলে তুলনামূলক কম ঋণও বড় চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
কোন দেশের ঋণ কত
আল জাজিরার ২২ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিভিন্ন দেশের সরকারি ঋণের যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তাতে মোট ঋণের পরিমাণে যুক্তরাষ্ট্র সবার ওপরে। তবে ঋণ ও মোট দেশজ উৎপাদনের অনুপাতের বিচারে দেশগুলোর অবস্থান ভিন্ন।
দেশ সরকারি ঋণের পরিমাণ মোট দেশজ উৎপাদনের তুলনায় ঋণ
যুক্তরাষ্ট্র = ৪১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার -১২৭ শতাংশ
চীন =২২.৫ ট্রিলিয়ন ডলার - ১০৪ শতাংশ
জাপান = ৮.৭ ট্রিলিয়ন ডলার -১৯৯ শতাংশ
যুক্তরাজ্য =৪.৪ ট্রিলিয়ন ডলার -১০২ শতাংশ
ফ্রান্স =৪.২ ট্রিলিয়ন ডলার -১১৮.৫ শতাংশ
ইতালি =৩.৭ ট্রিলিয়ন ডলার - ১৩৮ শতাংশ
জার্মানি =৩.৫ ট্রিলিয়ন ডলার - ৬৫ শতাংশ
তালিকার তথ্য অনুযায়ী, মোট ঋণের পরিমাণে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান প্রথম। অন্যদিকে, প্রধান অর্থনীতিগুলোর মধ্যে জাপানের ঋণ-অনুপাত সবচেয়ে বেশি। অর্থাৎ, ঋণের মোট অঙ্ক এবং অর্থনীতির সক্ষমতার তুলনায় ঋণের বোঝা এক বিষয় নয়।
বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা ডলারে ঋণ নেওয়ার সুবিধা যুক্তরাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক বাজারে বিশেষ অবস্থান দিয়েছে। তবে দেশটির ঋণের পরিমাণ বাড়তে থাকায় সুদ পরিশোধ এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে।
ফ্রান্সের ঋণ তার মোট দেশজ উৎপাদনের ১১৮ দশমিক ৫ শতাংশ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশটির সরকারি ঋণ-অনুপাত বেড়ে ১২১ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় বাড়লে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও পেনশনের মতো খাতে অর্থ বরাদ্দের ওপর চাপ বাড়বে।
ঋণ পরিশোধে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়
বাংলাদেশের ঋণ পরিস্থিতি বুঝতে মোট ঋণের পরিমাণের পাশাপাশি অর্থনীতির আকার, রাজস্ব আয় এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বিবেচনা করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত বাংলাদেশের অর্থনীতি ও ঋণ পরিস্থিতিবিষয়ক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শেষে সরকারের মোট ঋণ এবং সরকারি গ্যারান্টিযুক্ত ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৮৮ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। এটি ওই অর্থবছরের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৪১ শতাংশ।
এই ঋণের ৫৩ দশমিক ৬ শতাংশ ছিল অভ্যন্তরীণ ঋণ। বাকি অংশ ছিল বৈদেশিক ঋণ। অর্থাৎ, বাংলাদেশের সরকারি ঋণের বড় অংশ দেশের অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেওয়া হলেও বৈদেশিক ঋণের বোঝাও উল্লেখযোগ্য।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ ঋণ বিশ্লেষণে বাংলাদেশের সামগ্রিক ঋণসংকট এবং বৈদেশিক ঋণসংকটের ঝুঁকি মাঝারি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে আকস্মিক অর্থনৈতিক ধাক্কা মোকাবিলায় বাংলাদেশের সক্ষমতা সীমিত বলে সতর্ক করা হয়েছে।
এ মূল্যায়নের অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশ অবধারিতভাবে ঋণসংকটে পড়বে। বরং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বজায় রাখা, রাজস্ব আয় বাড়ানো, সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা নিশ্চিত করা এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমানো জরুরি।
বাংলাদেশের ঋণ পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সুদ পরিশোধের ব্যয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হয়েছিল মোট দেশজ উৎপাদনের ৪ দশমিক ২ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থ। একই সময়ে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ব্যয় ছিল মোট দেশজ উৎপাদনের ১ দশমিক ২ শতাংশ।
এ কারণে শুধু ঋণের পরিমাণ নয়, ঋণ পরিশোধে সরকারের বার্ষিক ব্যয় কতটা বাড়ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। রাজস্ব আদায় প্রত্যাশা অনুযায়ী না বাড়লে ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের পর উন্নয়ন এবং জনকল্যাণমূলক খাতে ব্যয় করার সুযোগ সংকুচিত হতে পারে।
বিশ্বে ঋণ ৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি
আল জাজিরার প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক অর্থায়নবিষয়ক সংস্থার তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে বিশ্বে সরকার, পরিবার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত ঋণ ১০ ট্রিলিয়ন ডলার বেড়ে ৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার হিসাবে এই ঋণের পরিমাণ মাথাপিছু প্রায় ৪৪ হাজার ডলার। ঋণ বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে উদীয়মান অর্থনীতিগুলো থেকে।
ঋণের পাশাপাশি সুদ পরিশোধের ব্যয়ও বেড়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক বছরে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো সরকারি বন্ডের সুদ বাবদ ৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি পরিশোধ করেছে। এই ব্যয় বিশ্বের প্রতিরক্ষা খাতে ৩ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে ২ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতে ২ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয়ের চেয়েও বেশি।
সরকার সাধারণত বন্ড বিক্রি করে ঋণ নেয়। বিনিয়োগকারীরা বন্ড কেনার বিনিময়ে সুদ পান এবং নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে মূল অর্থ ফেরত পাওয়ার অধিকারী হন। বন্ডের বাজারমূল্য কমে গেলে এর বিপরীতে সুদের হার বা মুনাফার হার বাড়তে পারে। এতে নতুন ঋণ নেওয়ার খরচও বেড়ে যায়।
ফ্রান্সের ক্ষেত্রে ঋণের ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটি ১০ বছর মেয়াদি ঋণের বিপরীতে প্রায় ৫ শতাংশ সুদ দিচ্ছে, যেখানে জার্মানির ক্ষেত্রে এই হার ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ। বিনিয়োগকারীরা ফ্রান্সকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি মুনাফা চাইছেন, যা দেশটির আর্থিক চাপের ইঙ্গিত দেয়।
ঋণের সুদ বাড়লে সরকারকে ব্যয় সংকোচন কিংবা কর বাড়ানোর মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে শিক্ষা, হাসপাতাল, পেনশন ও অবকাঠামো উন্নয়নে। একই সঙ্গে সরকারি ঋণের সুদের হার বাড়লে আবাসন, গাড়ি কেনা এবং ভোক্তা ঋণের খরচও বেড়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশের জন্যও এই পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি ঋণকে উন্নয়ন ও উৎপাদনশীল খাতে কাজে লাগানো, রাজস্ব ব্যবস্থার উন্নতি এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা জোরদার করা না গেলে ভবিষ্যতে সুদের ব্যয় অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
সূত্র: আল জাজিরা, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ ঋণ বিশ্লেষণ।
সানা/আপ্র/২৪/১০/২০২৬
