নদীমাতৃক বাংলাদেশ প্রাকৃতিক সম্পদ, উর্বর কৃষিজমি ও বিপুল জনশক্তির দেশ। কিন্তু সীমিত ভূখ-ে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, কৃষিজমি কমে যাওয়ার আশঙ্কা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শিক্ষার মান নিয়ে উদ্বেগ এবং কর্মসংস্থানের চাপÑ সব মিলিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে জটিল চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। রাষ্ট্র যদি সময়মতো এমন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ না করে, তাহলে এসব সমস্যা একে অপরকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে। অনেক জেলায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে গ্রামের জনসংখ্যা ক্রমাগত বাড়লেও বসতভিটার জমির পরিমাণ প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে।
অন্যদিকে, বিদেশে কর্মরত ও বসবাসরত প্রায় দেড় কোটি বাংলাদেশি নাগরিক যদি দেশে অবস্থান করতেন, তাহলে দেশের জনসংখ্যার ওপর চাপ আরও বহুগুণ বেড়ে যেত। সীমিত ভূমি, ক্রমহ্রাসমান কৃষিজমি, আবাসন সংকট, বেকারত্ব ও সীমিত কর্মসংস্থানের বাস্তবতায় এই অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ দেশের বিদ্যমান সংকটকে আরও ভয়াবহ করে তুলতÑ যা হতো ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’।
বাংলাদেশের মোট ভৌগোলিক আয়তন প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গকিলোমিটার। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের উপাত্ত অনুযায়ী, দেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি ৫৭ লাখ। অর্থাৎ সীমিত ভূখ-ে বিপুলসংখ্যক মানুষের বসবাস। তবে জনঘনত্বের হিসাব ভূমির সংজ্ঞা ও ব্যবহৃত পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। জনসংখ্যা বেশি হওয়া নিজে কোনো দেশের জন্য অভিশাপ নয়। দক্ষ, শিক্ষিত ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী একটি দেশের অর্থনীতির বড় শক্তি হতে পারে।
জনসংখ্যার তুলনায় শিক্ষা, কর্মসংস্থান, বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবস্থাপনা পিছিয়ে থাকলে সেই জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে এই ভারসাম্য কতটা কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠা করা যায়, তার ওপর। বাংলাদেশের ভূখ-ের একটি বড় অংশ কৃষি, বসতি, সড়ক, শিল্পকারখানা, নদী, জলাভূমি ও অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত হয়। তাই মোট আয়তনকে অব্যবহৃত জমির পরিমাণ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। প্রতিটি জমির নিজস্ব ব্যবহার ও গুরুত্ব রয়েছে।
জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়িঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, সড়ক ও কর্মস্থলের চাহিদাও বাড়ে। এই চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে কৃষিজমি ও প্রাকৃতিক জলাধার আবাসন কিংবা অবকাঠামো নির্মাণের কাজে চলে গেলে ভূমির ওপর প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়। বাংলাদেশে কৃষিজমির পরিমাণ নিয়ে বিভিন্ন সময়ের পরিসংখ্যানে পার্থক্য দেখা যায়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তথ্যে ২০১৯-২০২০ ভিত্তিবর্ষের ভূমি ব্যবহার পরিসংখ্যান অনুযায়ী মোট আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ প্রায় ৮৮ দশমিক ২৯ লাখ হেক্টর উল্লেখ করা হয়েছে। এটি ওই সময়ের ভিত্তিতে প্রকাশিত হিসাব; একে বর্তমান বছরের নির্ভুল জমির পরিমাণ হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ তেমনভাবে নেই।
এ ছাড়াও, গ্রামের কোনো পরিবার নতুন বাড়ি নির্মাণ করলে সেটি স্বাভাবিক প্রয়োজনের অংশ হতে পারে। সমস্যা তৈরি হয় যখন পরিকল্পনা ছাড়াই উর্বর কৃষিজমি, নিচু জমি কিংবা পানি নিষ্কাশনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ভরাট করা হয়। এভাবে একের পর এক স্থাপনা গড়ে উঠলে বসতি ছড়িয়ে পড়ে এবং কৃষিকাজের জন্য ব্যবহারযোগ্য জমি খ-িত হয়ে যায়। শহরের আশপাশে জনসংখ্যা ও ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আবাসন ও শিল্পের জন্য জমির চাহিদাও বাড়ে। ফলে শহরতলির কৃষিজমি বসতবাড়ি, দোকানপাট ও অন্যান্য স্থাপনায় রূপান্তরিত হতে পারে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো নিয়মিত ভূমি ব্যবহারের পরিসংখ্যান তৈরি করে এবং কৃষি শুমারিকে ভূমি ব্যবহারের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে। এসব উপাত্ত ব্যবহার করে জেলা ও উপজেলাভিত্তিক কৃষিজমি, বসতি ও অন্যান্য ভূমির পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। এতে কোথায় কৃষিজমি দ্রুত কমছে এবং কোথায় পরিকল্পিত আবাসনের প্রয়োজন বাড়ছে, তা নির্ণয় করা সহজ হবে। কৃষিজমির পাশাপাশি পানি, মাটির উর্বরতা ও কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ও গুরুত্বপূর্ণ। তাই শুধু প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে নির্বিচারে কৃষিজমি হারানোর ক্ষতি পূরণ করা যাবে না।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শুধু কত মানুষ বাস করছেন, তার ওপর নির্ভর করে না; তারা কতটা শিক্ষিত, দক্ষ ও উৎপাদনশীল হয়ে উঠছেন, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান এবং আগামী প্রজন্ম শিশু ও তরুণ যদি মানসম্মত শিক্ষা অর্জন করতে পারেন, তাহলে তারা কৃষি, শিল্প, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, গবেষণা ও ব্যবসায় অবদান রাখতে পারবেন। বিপরীতে, শিক্ষা দুর্বল হলে জনসংখ্যার সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো কঠিন হবে। শিক্ষার ক্ষেত্রে শুধু বিদ্যালয়ে ভর্তি বা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার হার দিয়ে প্রকৃত অগ্রগতি বোঝা যায় না। একজন শিক্ষার্থী যথাযথভাবে পড়তে, লিখতে, গণিত করতে, যুক্তি দিয়ে চিন্তা করতে এবং বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে পারছেন কি না, তা গুরুত্বপূর্ণ। মৌলিক দক্ষতার ঘাটতি থাকলে উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ করেও অনেক শিক্ষার্থী পরবর্তী পর্যায়ের পড়াশোনা ও কর্মজীবনে সমস্যায় পড়তে পারেন। পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের খবধৎহরহম চড়াবৎঃু ইৎরবভ বাংলাদেশের শিশুদের মৌলিক পাঠদক্ষতা নিয়ে উদ্বেগ তুলে ধরেছে। এই সূচক মূলত ১০ বছর বয়সের মধ্যে একটি শিশু অর্থ বুঝে পড়তে পারছে কি না, তা বিবেচনা করে এবং স্কুলের বাইরে থাকা শিশুদেরও হিসাবের মধ্যে আনে। এ ধরনের সূচক দেখায়, শিক্ষার সুযোগের পাশাপাশি শেখার প্রকৃত মান নিশ্চিত করাও জরুরি। শিক্ষার মান দুর্বল হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন দরিদ্র পরিবারের সন্তানরা। আর্থিক সামর্থ্যবান পরিবার অতিরিক্ত শিক্ষা, প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারে। ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারে শুধু প্রচলিত শিক্ষাগত সনদ যথেষ্ট নাও হতে পারে। কম্পিউটার, ডিজিটাল প্রযুক্তি, কারিগরি কাজ, যোগাযোগ, ভাষা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতার গুরুত্ব বাড়ছে। তাই সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণ ও কর্মক্ষেত্রভিত্তিক অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বিপুল জনসংখ্যাকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা গেলে সীমিত ভূমির মধ্যেও অর্থনৈতিক অগ্রগতি সম্ভব।
এজন্য- প্রথমত, কৃষিজমি ও জলাভূমি সংরক্ষণে কার্যকর ভূমি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা জরুরি । কোন জমিতে আবাসন, কোন জমিতে কৃষিকাজ এবং কোন এলাকায় শিল্পকারখানা গড়ে তোলা যাবে, তা স্থানীয় বাস্তবতা অনুযায়ী নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, পরিকল্পিত আবাসনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রতিটি পরিবারকে আলাদা বড় জমিতে বাড়ি নির্মাণের সুযোগ দেওয়ার পরিবর্তে নিরাপদ বহুতল আবাসন, সাশ্রয়ী বাড়ি এবং পরিকল্পিত গ্রামীণ জনবসতির বিকল্প তৈরি করা যেতে পারে।
তৃতীয়ত, প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি শক্তিশালী করতে হবে। প্রতিটি শিশুর পড়া, লেখা, গণিত ও যুক্তিবোধের দক্ষতা নিয়মিত যাচাই করে শেখার ঘাটতি পূরণ করতে হবে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত সহায়তা এবং সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ কর্মসূচি চালু রাখা জরুরি। চতুর্থত, কারিগরি ও পেশাগত শিক্ষাকে শ্রমবাজারের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। শিল্পকারখানা, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ, তথ্যপ্রযুক্তি ও অন্যান্য খাতে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ দিতে হবে। প্রশিক্ষণের সাফল্য শুধু সনদ প্রদানের মাধ্যমে নয়, শিক্ষার্থীরা বাস্তবে কাজ পাচ্ছেন কি না এবং তাদের আয় ও দক্ষতা বাড়ছে কি না, তা দিয়ে মূল্যায়ন করা উচিত।
সবশেষে, বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জ অনেক, কিন্তু সম্ভাবনাও কম নয়। বিপুল জনগোষ্ঠী, কৃষি, উদ্যোক্তা, প্রবাসী কর্মী, তরুণদের উদ্ভাবনী শক্তি এবং অর্থনৈতিক কর্মকা-ের বিস্তারের সুযোগ দেশকে এগিয়ে নিতে পারে। তবে এসব সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে হলে সীমিত ভূমির সঠিক ব্যবহার, মানসম্মত শিক্ষা এবং উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানকে একই উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ করতে হবে।
