বাংলাদেশ রেলওয়ের অনলাইন টিকিটিং ব্যবস্থায় অনিয়ম, টিকিট ব্লক করে রাখা এবং চড়া দামে বিক্রির অভিযোগ নতুন নয়। সাধারণ যাত্রী যখন নির্ধারিত দামে একটি টিকিট পাওয়ার জন্য অনলাইনে চেষ্টা করে ব্যর্থ হচ্ছেন, তখন একটি চক্র যদি প্রযুক্তির অপব্যবহার করে আগেই আসন আটকে রেখে কয়েক গুণ দামে বিক্রি করে, তবে সেই অন্যায়ের দায় এড়ানোর সুযোগ রেল কর্তৃপক্ষের নেই।
রোববার রূপালী বাংলাদেশে প্রকাশিত বিশেষ প্রতিবেদনে বাংলাদেশ রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ ‘পিপি-২৯’ নথি এবং সিলেটের আদালতের নির্দেশে পিবিআইয়ের অনুসন্ধানের বরাতে টিকিট কারসাজির যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তা যথেষ্ট উদ্বেগজনক। অভিযোগ অনুযায়ী, স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার ব্যবহার করে দ্রুত টিকিট আটকে রাখা, অননুমোদিত ওয়েবসাইটের মাধ্যমে টিকিট বিক্রি এবং রেলের অভ্যন্তরীণ কিছু অসাধু ব্যক্তির সহযোগিতায় আসন নিয়ন্ত্রণের মতো ঘটনা ঘটছে।
রেলওয়ের অনলাইন টিকিটিং ব্যবস্থায় অনিয়ম ও কালোবাজারির অভিযোগের সুষ্ঠু নিষ্পত্তি করতে হলে বিচ্ছিন্ন অভিযান কিংবা আশ্বাসে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। প্রয়োজন অভিযোগের গভীরে গিয়ে প্রকৃত দায়ীদের শনাক্ত করা এবং পুরো টিকিটিং ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা। এ ক্ষেত্রে সরকারের সমন্বিত, সময়োপযোগী ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।
আমরা মনে করি, সরকারকে একটি স্বাধীন ও বিশেষজ্ঞনির্ভর তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। কমিটিকে অনলাইন টিকিটিংয়ের সার্ভার লগ, বুকিং রেকর্ড, আইপি-সংক্রান্ত তথ্য, ব্যবহারকারীর প্রবেশাধিকার এবং টিকিট বাতিল ও পুনরায় বিক্রির তথ্য বিশ্লেষণ করে কারসাজির প্রকৃত ধরন শনাক্ত করতে হবে। ‘সহজ ডটকম’ কিংবা রেলের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য গ্রহণের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত প্রমাণের ভিত্তিতে দায় নির্ধারণ করতে হবে। তদন্তের অগ্রগতি ও চূড়ান্ত ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করা প্রয়োজন, যাতে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করা যায়।
একই সঙ্গে, অনলাইন টিকিটিং ব্যবস্থার ওপর রেলওয়ের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে প্রযুক্তিগত পরিচালনার দায়িত্ব থাকলেও রাষ্ট্রীয় সেবার নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতার দায় রেলওয়েরই। তাই নিয়মিত স্বাধীন আইটি অডিট, সার্ভারের প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ, সন্দেহজনক স্বয়ংক্রিয় বুকিং শনাক্তকরণ এবং অস্বাভাবিক হারে টিকিট সংরক্ষণের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক সতর্কব্যবস্থা চালু করা জরুরি।
পাশাপাশি, রেলের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও যোগসাজশের অভিযোগে শূন্য সহনশীলতা দেখাতে হবে। কোনো কর্মকর্তা, কর্মচারী বা দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তি অনৈতিকভাবে টিকিট সরবরাহ, আসন আটকে রাখা কিংবা কালোবাজারিদের সহযোগিতা করলে পদমর্যাদা বা প্রভাব বিবেচনা না করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। যাত্রীদের স্বার্থ রক্ষায় টিকিটিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির শর্ত পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। সেবার মান, সাইবার নিরাপত্তা, তথ্যের সুরক্ষা, নিরীক্ষায় সহযোগিতা এবং অনিয়মের দায় নির্ধারণের বিষয়গুলো চুক্তিতে স্পষ্ট থাকতে হবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সেবা কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার আগে প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা যাচাই এবং স্বাধীন তদারকির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, রেলপথ সাধারণ মানুষের যাতায়াতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ঈদ, পূজা কিংবা দীর্ঘ ছুটিতে বাড়ি ফেরার সময় একটি টিকিটের জন্য মানুষকে যে ভোগান্তি পোহাতে হয়, তার সুযোগ নিয়ে কোনো চক্রের অবৈধ মুনাফা অর্জন চলতে পারে না। অনলাইন টিকিটিং শুধু একটি প্রযুক্তিগত সেবা নয়, এটি জনগণের অর্থে পরিচালিত রাষ্ট্রীয় পরিবহনব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, অপরাধীর শাস্তি, প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিÑ এই চারটি ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করতেই হবে।