সংবাদ · সাধারণ
ডার্ক ম্যাটারের সন্ধানে ন্যান্সি রোমান টেলিস্কোপ
২০/১০/২০২৬

রাতের আকাশে খালি চোখে দেখা তারকা কিংবা দূরবীক্ষণ যন্ত্রে দৃশ্যমান ও অদৃশ্য নক্ষত্ররাজি—সব মিলিয়ে মহাবিশ্বের দৃশ্যমান পদার্থের পরিমাণ মাত্র ৫ শতাংশ। বাকি ২৭ শতাংশ ডার্ক ম্যাটার বা অন্ধকার পদার্থ এবং ৬৮ শতাংশ ডার্ক এনার্জি বা অন্ধকার শক্তি।১৯২৯ সালে এডউইন হাবল পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে দেখান, গ্যালাক্সিগুলো পরস্পর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। বিষয়টি বোঝার জন্য একটি রাবারের ফিতার ওপর কয়েকটি পিঁপড়া বসিয়ে ফিতাটি টানার কথা কল্পনা করা যেতে পারে। পিঁপড়াগুলো নিজ নিজ অবস্থানে থাকলেও ফিতাটি যত প্রসারিত হবে, তারা পরস্পর থেকে তত দূরে সরে যাবে। তবে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের বিষয়টি এর চেয়ে অনেক জটিল। গ্যালাক্সিগুলো শুধু নিজ নিজ অবস্থানে স্থির নয়, তাদের মধ্যে মহাকর্ষীয় আকর্ষণও কাজ করে। মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ, গ্যালাক্সির গতি এবং ডার্ক ম্যাটারের ভূমিকা বুঝতে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন।১৯৫৩ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর হাবলের মৃত্যুর পরও মহাবিশ্বের প্রকৃতি নিয়ে নানা প্রশ্নের উত্তর অজানাই থেকে যায়। ডার্ক ম্যাটার কী দিয়ে গঠিত? ডার্ক এনার্জির প্রকৃতি কী? মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের ভবিষ্যৎই বা কী? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আরও উন্নত মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্রের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে ন্যান্সি গ্রেস রোমানসহ অনেক বিজ্ঞানী ও মহাকাশ গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা উন্নত টেলিস্কোপ নির্মাণের পক্ষে কাজ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের জ্যোতির্বিজ্ঞানী ন্যান্সি গ্রেস রোমান এ ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। মহাকাশ গবেষণায় তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পরবর্তী সময়ে তাঁর নামেই একটি স্পেস টেলিস্কোপের নামকরণ করা হয়।ন্যান্সি গ্রেস রোমান ১৯২৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি নাসার জ্যোতির্বিজ্ঞান কর্মসূচির প্রথম প্রধানদের একজন এবং সংস্থাটির প্রথম নারী নির্বাহীদের অন্যতম ছিলেন। মহাকাশে দূরবীক্ষণ যন্ত্র স্থাপনের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। হাবল স্পেস টেলিস্কোপের পরিকল্পনা এগিয়ে নিতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচনে উন্নত পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেই তাঁর কাজের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল।জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ ও ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপের কাজের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ ২০২১ সালের ২৫ ডিসেম্বর উৎক্ষেপণ করা হয়। এটি পৃথিবী থেকে প্রায় ১৫ লাখ কিলোমিটার দূরে সূর্য-পৃথিবী ব্যবস্থার দ্বিতীয় ল্যাগ্রাঞ্জ বিন্দুতে অবস্থান করে। এর প্রধান লক্ষ্য মহাবিশ্বের প্রাচীনতম গ্যালাক্সি ও নক্ষত্রের সন্ধান করা এবং মহাবিশ্বের প্রাথমিক পর্যায়ের বিবর্তন সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা। অন্যদিকে, ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপের পরিকল্পনায় রয়েছে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ, ডার্ক এনার্জি, ডার্ক ম্যাটার এবং সৌরজগতের বাইরের গ্রহ নিয়ে বিস্তৃত গবেষণা। এটি আকাশের বড় অংশ দ্রুত পর্যবেক্ষণ করতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে। ফলে বিপুলসংখ্যক গ্যালাক্সি ও এক্সোপ্লানেট সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।ডার্ক ম্যাটার সরাসরি আলো নির্গত বা প্রতিফলিত করে না বলে সাধারণ টেলিস্কোপে তা দেখা যায় না। তবে এর মহাকর্ষীয় প্রভাব থেকে এর উপস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। অন্যদিকে, ডার্ক এনার্জি মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ ত্বরান্বিত হওয়ার পেছনে দায়ী বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন। রোমান টেলিস্কোপের পর্যবেক্ষণ এসব রহস্য সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য ধারণা দিতে পারে। মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ ভবিষ্যতে কীভাবে চলবে, তা বোঝার ক্ষেত্রেও এর গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ হবে। তবে মহাবিশ্ব একসময় সংকুচিত হয়ে আবার একটি বিন্দুতে ফিরে যাবে কি না, তা এখনো অমীমাংসিত প্রশ্ন। ডার্ক এনার্জির প্রকৃতি সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া গেলে মহাবিশ্বের সুদূর ভবিষ্যৎ নিয়ে বিজ্ঞানীদের ধারণা স্পষ্ট হতে পারে।রোমান টেলিস্কোপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো এক্সোপ্লানেট বা সৌরজগতের বাইরের গ্রহ অনুসন্ধান। আমাদের সৌরজগতের বাইরে ইতিমধ্যে হাজার হাজার গ্রহ আবিষ্কৃত হয়েছে। এগুলোর কোনো কোনোটি আকার বা পরিবেশের দিক থেকে পৃথিবীর সঙ্গে তুলনীয়। তবে কোনো গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। রোমান টেলিস্কোপ মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে বিপুলসংখ্যক গ্রহ শনাক্ত করতে সহায়তা করবে। এর পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে গ্রহের গঠন, বৈশিষ্ট্য এবং সৌরজগতের বাইরে প্রাণের উপযোগী পরিবেশের সম্ভাবনা সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়া যেতে পারে।মহাবিশ্ব কি শুধু পৃথিবীর প্রাণের জন্যই সৃষ্টি হয়েছে, নাকি অন্য কোথাও প্রাণের অস্তিত্ব রয়েছে—এ প্রশ্ন মানুষের কৌতূহলকে যুগ যুগ ধরে তাড়িত করেছে। মহাবিশ্বের বিশালত্ব বিবেচনায় অন্য কোথাও প্রাণ থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে সম্ভাবনা আর প্রমাণ এক বিষয় নয়। দূরবর্তী কোনো গ্রহে প্রাণের অস্তিত্বের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পেতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। রোমান টেলিস্কোপের মতো উন্নত প্রযুক্তি সেই অনুসন্ধানকে এগিয়ে নিতে পারে। হয়তো ভবিষ্যতে বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর মতো কোনো গ্রহের সন্ধান পাবেন। সেখানে পৌঁছানো মানুষের পক্ষে সম্ভব না হলেও দূর থেকে তার পরিবেশ ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানার সুযোগ তৈরি হতে পারে। মহাবিশ্বের অজানা রহস্য উন্মোচনে এই অনুসন্ধান তাই বিজ্ঞানকে নতুন দিগন্তের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।[লেখক: প্রাবন্ধিক]
মূল প্রতিবেদনে যান ↗