স্বাস্থ্যবিমা করার সময়ে শুধু প্রিমিয়ামের অঙ্ক দেখলেই চলে না। অসুস্থ হলে চিকিৎসার খরচের কতটা বিমা সংস্থা বহন করবে, আর কতটা দিতে হবে নিজের পকেট থেকে, তা-ও আগে থেকে জেনে রাখা জরুরি। পাশাপাশি, চিকিৎসার নথিপত্র ডিজিটাল মাধ্যমে গুছিয়ে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। আয়ুষ্মান ভারত হেলথ অ্যাকাউন্ট বা আভা (এবিএইচএ) কার্ডের মাধ্যমে একটি ১৪ সংখ্যার স্বাস্থ্য পরিচয় নম্বর পাওয়া যায়। এর সাহায্যে সম্মতি সাপেক্ষে ডিজিটাল মাধ্যমে চিকিৎসার নথিপত্র খুঁজে পাওয়া ও আদানপ্রদান সহজ হতে পারে। আগে থেকে আভা কার্ড তৈরি করে রাখলে চিকিৎসার সময়ে স্বাস্থ্যতথ্য সামলানো সুবিধাজনক হতে পারে। তবে আভা কার্ড স্বাস্থ্যবিমা নয় এবং এটি থাকলেই বিমার দাবি অনুমোদিত হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
স্বাস্থ্যবিমার খরচের হিসাবের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ডিডাক্টিবল। ডিডাক্টিবল কম হলে সাধারণত প্রিমিয়াম বেশি হয়, আর বেশি হলে প্রিমিয়াম কম হতে পারে। কিন্তু কম প্রিমিয়ামের আকর্ষণে বেশি ডিডাক্টিবল বেছে নেওয়ার আগে বুঝে নেওয়া দরকার, জরুরি চিকিৎসার সময়ে সেই সিদ্ধান্ত কতটা আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে।
ডিডাক্টিবল কী?
স্বাস্থ্যবিমার পলিসিতে নির্ধারিত যে পরিমাণ চিকিৎসার খরচ গ্রাহককে প্রথমে নিজের পকেট থেকে মেটাতে হয়, তাকে বলে ডিডাক্টিবল। এই সীমা পূরণের পর বিমা সংস্থা পলিসির শর্ত অনুযায়ী অনুমোদিত খরচ বহন করতে শুরু করে। তবে ডিডাক্টিবল পূরণ হলেই চিকিৎসার বাকি সব খরচ বিমা সংস্থা দেবে, এমন নয়। বিমার সর্বোচ্চ সীমা, কো-পেমেন্ট এবং অন্যান্য শর্তও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
কম না বেশি, কোন ডিডাক্টিবল বেছে নেবেন?
কম ডিডাক্টিবলে চিকিৎসার প্রাথমিক খরচ তুলনামূলক কম হলেও প্রিমিয়াম বেশি হতে পারে। অন্যদিকে, বেশি ডিডাক্টিবলে প্রিমিয়াম কমার সম্ভাবনা থাকে। বিমা সংস্থা ও পলিসির ধরন অনুযায়ী, স্বেচ্ছায় বেশি ডিডাক্টিবল বেছে নিলে প্রিমিয়াম প্রায় ১০-৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। তবে এই হার সর্বত্র এক নয়। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজের সঞ্চয়, আর্থিক সামর্থ্য এবং হঠাৎ বড় অঙ্কের চিকিৎসার খরচ মেটানোর ক্ষমতা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ডিডাক্টিবল মূলত দু’ধরনের। কম্পালসরি বা বাধ্যতামূলক ডিডাক্টিবল, বিমা সংস্থা পলিসির শর্ত অনুযায়ী নির্ধারণ করে। ভলান্টারি বা নিজের ইচ্ছানুযায়ী ডিডাক্টিবল, গ্রাহক নিজে বেছে নিতে পারেন।
ডিডাক্টিবল ও কো-পেমেন্ট এক নয়
ডিডাক্টিবল হল নির্দিষ্ট টাকার অঙ্ক, যা বিমা সংস্থার খরচ বহনের দায়িত্ব শুরু হওয়ার আগে গ্রাহককে মেটাতে হয়। অন্যদিকে, কো-পেমেন্ট হল অনুমোদিত চিকিৎসার খরচের নির্দিষ্ট শতাংশ, যা গ্রাহককে দিতে হয়। অর্থাৎ, ডিডাক্টিবল নির্ধারণ করে বিমা সংস্থার খরচ বহনের দায়িত্ব কখন শুরু হবে, আর কো-পেমেন্ট নির্ধারণ করে অনুমোদিত খরচের কতটা অংশ গ্রাহককে বহন করতে হবে।
ক্যাশলেস চিকিৎসাতেও দিতে হতে পারে টাকা
ক্যাশলেস চিকিৎসা মানেই হাসপাতালে কোনও টাকা দিতে হবে না, এমন নয়। পলিসিতে ডিডাক্টিবলের শর্ত থাকলে হাসপাতালে ভর্তির সময়েও সেই টাকা দিতে হতে পারে। হাসপাতাল সাধারণত গ্রাহকের কাছ থেকে ডিডাক্টিবলের অংশটি নেয় এবং বিমা সংস্থা পলিসির শর্ত অনুযায়ী অনুমোদিত বাকি খরচ মেটায়। বহির্বিভাগ বা ওপিডি-র চিকিৎসায় সাধারণত নির্দিষ্ট সীমা ও খরচ ফেরত পাওয়ার নিয়ম থাকে। কিছু পলিসিতে ওপিডি-র জন্যও আলাদা ডিডাক্টিবল থাকতে পারে। অধিকাংশ পলিসিতে প্রতি বছর ডিডাক্টিবলের হিসাব নতুন করে শুরু হয়।
বেশি ডিডাক্টিবলের ঝুঁকি
ছোটখাটো চিকিৎসার খরচও নিজের পকেট থেকে দিতে হতে পারে। কম বয়সি ও সুস্থ ব্যক্তিরও হঠাৎ চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। প্রবীণদের ক্ষেত্রে আর্থিক চাপ বাড়তে পারে। এমনকী, খরচের ভয়ে চিকিৎসা করাতে দেরি হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। কর্পোরেট স্বাস্থ্যবিমাতেও ডিডাক্টিবল বা কো-পেমেন্টের শর্ত থাকতে পারে।
অ্যাগ্রিগেট ডিডাক্টিবল কী?
পারিবারিক স্বাস্থ্যবিমায় অ্যাগ্রিগেট ডিডাক্টিবল থাকলে একই পলিসির আওতায় পরিবারের সদস্যদের সম্মিলিত চিকিৎসার খরচ হিসাব করা হয়। নির্দিষ্ট সীমা পূরণ হলে বিমা সংস্থা পলিসির শর্ত অনুযায়ী খরচ মেটাতে শুরু করে। এতে পরিবারের খরচের হিসাব রাখা সহজ হতে পারে এবং প্রিমিয়াম কমার সম্ভাবনাও থাকে। তবে এর অসুবিধাও রয়েছে। প্রথমে পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসার খরচ নিজেদের বহন করতে হতে পারে। সম্মিলিত খরচ নির্দিষ্ট সীমায় না পৌঁছলে বিমার সুবিধা পাওয়া নাও যেতে পারে। ফলে চিকিৎসায় দেরি হওয়ার ঝুঁকিও থাকে।
বিমা কেনার আগে কী দেখবেন?
অনলাইনে আভা কার্ডের জন্য আবেদন করার পদ্ধতি সম্পর্কে ধাপে ধাপে বিস্তারিত তথ্য জেনে নেওয়া যেতে পারে, যাতে প্রয়োজনের সময়ে ডিজিটাল স্বাস্থ্য পরিচয়পত্রটি সহজে তৈরি করা যায়।
ডিডাক্টিবলের অঙ্ক কত, তা প্রতি বছর নাকি প্রতি চিকিৎসায় প্রযোজ্য, পরিবারের সম্মিলিত খরচের ভিত্তিতে হিসাব হয় কি না, বেসিক স্বাস্থ্যবিমা থেকে কতটা খরচ মেটানো সম্ভব এবং ডিডাক্টিবল পূরণের পরেও কো-পেমেন্ট দিতে হবে কি না, জেনে নিন।
জরুরি পরিস্থিতিতে সঞ্চয় থেকে ডিডাক্টিবলের টাকা দেওয়া সম্ভব কি না, পরিবারের সদস্যদের বয়স ও স্বাস্থ্যগত প্রয়োজনের সঙ্গে পলিসি কতটা মানানসই, তাও বিবেচনা করুন। স্বাস্থ্যবিমা বেছে নেওয়ার সময়ে কম প্রিমিয়ামকে একমাত্র মাপকাঠি করা উচিত নয়।
বিমার উদ্দেশ্য শুধু প্রিমিয়াম বাঁচানো নয়, অসুস্থতার সময়ে চিকিৎসার খরচ সামলাতে আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা। তাই পলিসি কেনার আগে সব শর্ত ভালো করে বুঝে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
