পর্ব-তিন:
ভারোনেজ থেকে মস্কো শহর খুব দূরে নয়, তবু মাঝের পথটা দীর্ঘ প্রায় ৫৩৫ কিলোমিটার। রাস্তাগুলো এখনো ধরে রেখেছে সোভিয়েত আমলের সেই সরলরেখা-তোলা নির্মাণশৈলী; এতটাই সোজা যে কখনো কখনো চোখ মেলে একনজরে ১০ কিলোমিটার পথ দেখা যায়।
আমাদের হোস্টেলের ঠিক পেছনেই ভারোনেজ রেলওয়ে স্টেশন। এখান থেকে মস্কো ছাড়াও ইউরোপ কিংবা চীন—সব দিকেই ট্রেন চলে। পরিষ্কার-পরিপাটি ট্রেনের প্রতিটা বগি , যেন সাজানো সরু ড্রয়িংরুমের মতো—রাশিয়ার ট্রেন ভ্রমণের আলাদা একটা সৌন্দর্য আছে।
কিন্তু সেদিন তাড়াহুড়োর কারণে ট্রেনে নয়, উঠেছিলাম একটি ভলভো দুতলা বাসে। যাত্রাটা খুব স্বাভাবিকই হওয়ার কথা ছিল, যদি না আমার পাশের সিটের বৃদ্ধা মহিলাটি কথা শুরু করতেন।
প্রায় সত্তরোর্ধ এক রাশিয়ান নারী—এই বয়সী মহিলাদের সবাই বলে বাবুস্কা। নরম হাসি দিয়ে প্রথমেই তিনি আমার নাম আর দেশ জিজ্ঞাসা করলেন। আমি বিনয়ের সঙ্গে উত্তর দিলেও আর কথা বাড়াইনি; এখানে সাধারণত মানুষ আগে বাড়িয়ে কথাবার্তা পছন্দ করে না। গাড়ি চলতে চলতে কিছুক্ষণ পর তিনি নিজেই গল্পের সূচনা করলেন।
গল্পের এক পর্যায়ে জানতে পারলাম, ভারোনেজ তাঁর জন্মস্থান নয়। তরুণ বয়সে পড়াশোনা শেষ করলেই যেতে হতো ইমপ্লয়মেন্ট অফিসে। সোভিয়েত ব্যবস্থায় যার নাম যে তালিকায় উঠত, তাকে সেই শহরেই গিয়ে চাকরি শুরু করতে হতো—না বলার কোনো সুযোগ ছিল না।
আমি অবাক হয়ে বললাম, “আমাদের দেশে দূরবর্তী পোস্টিং এলে কেউ চাইলে না-ও যেতে পারে।“
বাবুস্কা ধীরে মাথা নেড়ে হাসলেন, “তোমাদের দেশে স্বাধীনতা আছে। আমাদের ছিল দায়িত্ব—আর তাতে না বলার অধিকার ছিল না।“
এভাবেই এক দূরবর্তী শহর থেকে তিনি প্রথমবার ভোরোনেজে এসেছিলেন। শহরটি তাঁর কাছে ছিল পুরোপুরি অচেনা—ভাষা, রাস্তা, মানুষ সবই নতুন। তবে সময়ের সঙ্গে সহকর্মীদের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে; পরে তাঁদেরই একজনকে বিয়ে করেন, আর সেখান থেকেই এই শহর হয়ে ওঠে তাঁর স্থায়ী ঠিকানা।
বাসের জানালায় তখন বরফ জমে ঘন সাদা দাগ তুলছে। আমি চুপচাপ বাইরে তাকিয়ে ভাবছিলাম—যে ব্যবস্থাকে এক সময় মানুষের এক-চতুর্থাংশ ভবিষ্যতের স্বপ্ন মনে করত, সেই কমিউনিজম আজ ভাঙা স্মৃতির মতো মানুষের মুখে মুখে বেঁচে আছে।
মস্কোর দিকে ছুটে চলা সেই বাসে আমি উপলব্ধি করলাম—ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় নয়, মানুষের জীবনের ভাঁজে ভাঁজে বাস করে।
আর সেসব ভাঁজেই লুকিয়ে থাকে রাশিয়ার পতিত লাল স্বপ্নের মতো গল্প—একটি যুগের, একটি জীবনের, নীরব সাক্ষ্য।
(চলবে)
লেখক : মোহাম্মদ কামরুল হাসান, আইটি ইঞ্জিনিয়ার এবং ভ্রমণ, তথ্যপ্রযুক্তি ও বিশ্ব রাজনীতি বিষয়ক লেখক।
