ঘনিষ্ঠ হওয়ার বিষয়টি মানবসমাজে আছে। তবে এখানে প্রশ্ন হলো—কে কার সাথে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে, কেন হচ্ছে? এমন এক প্রশ্নের মুখে পড়েছে প্রতিবেশী দেশ ভারত। আমাদের একটি জাতীয় দৈনিকের আন্তর্জাতিক পাতার শিরোনাম
ঘনিষ্ঠ হওয়ার বিষয়টি মানবসমাজে আছে। তবে এখানে প্রশ্ন হলো—কে কার সাথে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে, কেন হচ্ছে? এমন এক প্রশ্নের মুখে পড়েছে প্রতিবেশী দেশ ভারত। আমাদের একটি জাতীয় দৈনিকের আন্তর্জাতিক পাতার শিরোনাম ‘গাজায় গণহত্যার মধ্যেই ইসরাইলের সঙ্গে দ্রুত ঘনিষ্ঠ হচ্ছে ভারত।’ প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড গাজায় ইসরাইলের আগ্রাসনে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এ কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে তেলআবিব। ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ ইসরাইলি নেতাদের ওপর নিষেধাজ্ঞার উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক আরো জোরদার করছে ভারত। বৃহস্পতিবার কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরায় প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে একথা জানানো হয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমলে ভারতের এই অবস্থান পরিবর্তন বেশ স্পষ্ট। অথচ এক সময় ভারত ফিলিস্তিনের বড় সমর্থক ছিল। আর নরেন্দ্র মোদির ভারত এখন ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা অংশীদার। গাজায় আগ্রাসনের মধ্যেও ইসরাইলে অস্ত্র রপ্তানির অভিযোগ উঠেছে ভারতের বিরুদ্ধে।
ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, হিন্দুত্ববাদী আদর্শ এবং নিরাপত্তাজনিত স্বার্থ ইসরাইলের সাথে ঘনিষ্ঠতার পেছনে ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। প্রসঙ্গত এখানে উল্লেখ, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইসরাইলের কট্টর রক্ষণশীল অর্থমন্ত্রী বেৎসালেল স্মোতরিচের ভারত সফরের সময় তাকে ফুলের মালা দিয়ে স্বাগত জানানো হয়। অথচ গাজায় ফিলিস্তিনিদের জাতিগত নিধন ও অধিকৃত পশ্চিম তীরকে ইসরাইলের সঙ্গে যুক্ত করার পক্ষে প্রচারণা চালানোর কারণে স্মোতরিচকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে বৃটেন, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, কানাডা ও নরওয়ে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, ভারত যখন স্মোতরিচকে ফুলের মালা দিয়ে অভ্যর্থনা জানাচ্ছিল, তখনো গাজায় ইসরাইলের হামলা অব্যাহত ছিল। বিবেচনার বিষয় হলো, ঐতিহ্যগতভাবে ইসরাইলের সমর্থক ইউরোপের দেশগুলো যখন নেতানিয়াহু সরকারের সমালোচনা থেকে নিষেধাজ্ঞার মতো পদক্ষেপের দিকে যাচ্ছে, তখন ভারত কী করে ইসরাইলের আরো ঘনিষ্ঠ হচ্ছে? চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইসরাইল সফল করেন নরেন্দ্র মোদি। সে সময় গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতকি অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানার মুখে থাকা নেতানিয়াহু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছিলেন। সেই সময় জেরুসালেমে ইসরাইলের আইন সভা নেসেটে মোদির উপস্থিতিতে বক্তব্য দেওয়ার সময় নেতানিয়াহু বলেন, ‘আপনি ইসরাইলের মহান বন্ধু। আপনি শুধু বন্ধু নন, একজন ভাই।’ উল্লেখ্য, ইসরাইলের তিন বছরের আগ্রাসনে গাজায় অন্তত ৭৪ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছে অন্তত ২১ হাজার শিশু।
ভারত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংঘাত সমাধানে কূটনীতি ও আলোচনার ওপর জোর দিয়ে এসেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন, আমেরিকা-ইরান কিংবা ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাত সব ক্ষেত্রেই ভারতের বক্তব্য ছিল, যুদ্ধ কোনো সমস্যার সমাধান করে না। কিন্তু আলজাজিরার অনুসন্ধানসহ বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, গাজায় যুদ্ধ চলার সময়ও ভারত ইসরাইলে অস্ত্র রফতানি করেছে। একই সময়ে ভারত ইসরাইলে সবচেয়ে বড় অস্ত্র ক্রেতার দেশে পরিণত হয়েছে। এমন চিত্রে উপলব্ধি করা যায়, মোদির আমলে ভারত কতটা নীতিচ্যুত হয়েছে। আর তার সরকারের মুসলিমবিদ্বেষও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের রক্ষণশীল হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই ইহুদি জায়নবাদী আদর্শের প্রতি সমর্থন রয়েছে। বিজেপির আদর্শিক ভিত্তি হিন্দুত্ববাদ। এর লক্ষ্য ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করা এবং বিশ্বের যে কোনো স্থানে থাকা হিন্দুদের জন্য দেশটিকে স্বাভাবিক আবাসভূমি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। ইসরাইল ও নিজেদের ইহুদিদের আবাসভূমি হিসেবে বিবেচনা করে থাকে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, গাজায় বর্তমান গণহত্যা শুরুর অনেক আগে থেকেই ইসরাইলের দিকে ভারতের ঝোঁক বাড়তে শুরু করে। আগের গোপন বা আড়ালে থাকা সম্পর্ক মোদির আমলে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। ইসলাম ও মুসলিমরা যেন উভয় দেশের সাধারণ শত্রুতে পরিণত হতে চলেছে। বিষয়টি কি মুসলিমবিশ্ব সেভাবে উপলব্ধি করে, বিশেষ করে আরববিশ্ব? আবার বিশ্বের সাথে ভারতের উষ্ণ সম্পর্ক তো চোখে পড়ার মতো।
