সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়নে আজ ১২ অক্টোবর থেকে দেশব্যাপী পরিবারভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ শুরু হচ্ছে। এ কার্যক্রম ঘিরে জনসচেতনতা তৈরিতে মসজিদ, মন্দির, প্যাগোডা ও গির্জার মাধ্যমে প্রচারণার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবারের আর্থ-সামাজিক অবস্থার তথ্য সংগ্রহ করবেন
প্রশিক্ষিত ও পরিচয়পত্রধারী কর্মীরা। সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হবে কোন পরিবার সরকারি সহায়তা পাওয়ার বেশি উপযুক্ত। একই সঙ্গে তথ্য সংগ্রহের নামে অর্থ দাবি করে প্রতারণা ঠেকাতে সাধারণ মানুষকে সতর্ক করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ লক্ষ্যে ইসলামিক ফাউন্ডেশন এবং হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানিয়েছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। গত ৮ অক্টোবর সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি থেকে এ-সংক্রান্ত চিঠি পাঠানো হয়।
চিঠিতে বলা হয়েছে, ১২ অক্টোবর থেকে দেশব্যাপী একযোগে সব এলাকার থানা ও পরিবারের তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হবে। এ জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড থানা তথ্যভাণ্ডারের তথ্য সংগ্রহ নির্দেশিকা, ২০২৬’ প্রণয়ন করা হয়েছে। কর্মসূচি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সমন্বয়ে মসজিদগুলোয় এবং হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের মাধ্যমে মন্দির, প্যাগোডা ও গির্জায় প্রচারণার বার্তা পৌঁছে দিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
প্রচারণার জন্য তৈরি বার্তায় জানানো হয়েছে, সরকারের প্রশিক্ষিত ও পরিচয়পত্রধারী কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবারের আর্থ-সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করবেন। এসব তথ্যের ভিত্তিতে সহায়তার প্রয়োজনীয়তা যাচাই করে উপযুক্ত পরিবার চিহ্নিত করা হবে। এ কারণে পরিবারের প্রকৃত আর্থ-সামাজিক অবস্থা তুলে ধরে সঠিক তথ্য দেওয়ার জন্য সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
মসজিদে জুমার নামাজের আগে তিন মিনিটের ঘোষণায় প্রকৃত তথ্য দেওয়ার পাশাপাশি আর্থিক লেনদেন থেকে সতর্ক থাকার বার্তা প্রচার করা হবে। ফ্যামিলি কার্ডের তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে কেউ টাকা চাইলে তা বিশ্বাস না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তথ্য দেওয়ার জন্য কোনো অর্থের প্রয়োজন নেই বলেও স্পষ্ট করা হয়েছে।
অন্যদিকে মন্দির, গির্জা ও বিহারে দুই মিনিটের ঘোষণায় সঠিক তথ্য দেওয়ার পাশাপাশি বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী প্রতিবেশীদের খোঁজ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে তথ্য সংগ্রহের সময় ঝুঁকিতে থাকা কেউ বাদ না পড়েন। কেউ অর্থ দাবি করলে ১০৯৮ নম্বরে জানানোর কথাও প্রচারণার বার্তায় উল্লেখ রয়েছে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের চিঠির অনুলিপি অবগতি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের সচিব এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত একাধিক কর্মকর্তা আমাদের সময়কে বলেন, ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাদের ভাষ্য, প্রান্তিক, নিম্নআয়ের ও হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সরাসরি সহায়তা দেওয়াই এ কর্মসূচির মূল লক্ষ্য। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি ও দারিদ্র্য বিমোচনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের ‘ভিশন ২০৩০’ এবং ২০২৮ সালের মধ্যে সামাজিক সুরক্ষা বাজেট মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যের সঙ্গে ফ্যামিলি কার্ডের পরিকল্পনা সম্পৃক্ত। কর্মসূচিটির লক্ষ্য চরম দারিদ্র্য দূরীকরণ, সমন্বিত কল্যাণ কাঠামো গড়ে তোলা, সর্বজনীন সামাজিক পরিচয় প্রতিষ্ঠা এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো। এর মাধ্যমে খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সরাসরি নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়া, নারীর ক্ষমতায়ন ও মর্যাদা বৃদ্ধি, স্বচ্ছ ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার তৈরি এবং বিভিন্ন সেবা সংযুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ফ্যামিলি কার্ড কেবল সাময়িক সংকট মোকাবিলার কর্মসূচি নয়; বরং রাষ্ট্রের সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দেওয়ার উদ্যোগ। স্বচ্ছ ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা, নারীর প্রাধান্য এবং যথাযথভাবে সুবিধাভোগী নির্বাচনের মাধ্যমে কর্মসূচিটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এর সুফল নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা, প্রশাসনিক সততা ও জবাবদিহি বজায় রাখার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল বলেছেন, ফ্যামিলি কার্ডকে শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ উদ্যোগ হিসেবে দেখলে এর ব্যাপ্তি সীমিত হয়ে যায়। বিশ্বজুড়ে সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার যে প্রয়োজন তৈরি হয়েছে, বাংলাদেশের এই কর্মসূচি তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। সামাজিক সুরক্ষা শুধু আর্থিক সহায়তা দেওয়ার বিষয় নয়; মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে সহায়তার কার্যকর সমন্বয় ঘটানোও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২৬ সালের মার্চে মাঠপর্যায়ে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পর ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়নে বেশকিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সরকার ‘ফ্যামিলি কার্ড নীতিমালা ২০২৬’ চূড়ান্ত করেছে। সরকারি চাকরিজীবী, বিলাসবহুল সম্পদের মালিক— যেমন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র (এসি) বা গাড়ি ব্যবহারকারী এবং নির্দিষ্ট আয়সীমার ঊর্ধ্বে থাকা ধনাঢ্য শ্রেণিকে বাদ দিয়ে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নীতিমালায় সুবিধাভোগী নির্ধারণে ছয় থেকে আটটি ধাপের যাচাই প্রক্রিয়ার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
ফ্যামিলি কার্ডের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন গ্রামের হতদরিদ্র পরিবার, নিম্নআয়ের মানুষ, উপার্জনে অক্ষম সদস্য রয়েছেন এমন পরিবার, নারীপ্রধান ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার, বিধবা, তালাকপ্রাপ্তা, স্বামী পরিত্যক্তা এবং অসচ্ছল নারীপ্রধান পরিবার। এ ছাড়া ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী অবিবাহিত মেয়ের পরিবার, প্রত্যাগত অভিবাসী— বিশেষত নারী অভিবাসীর পরিবার এবং শিশু, প্রতিবন্ধী বা অটিজমে আক্রান্ত সদস্য রয়েছেন এমন পরিবার অগ্রাধিকার পাবে।
যেসব পরিবারের ঘরের দেয়াল মাটি, পাটকাঠি বা বাঁশ দিয়ে তৈরি, সেসব পরিবারও অগ্রাধিকার তালিকায় থাকবে। একইভাবে ভূমিহীন কৃষিশ্রমিক ও দিনমজুর পরিবারকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। নীতিমালা অনুযায়ী, যেসব পরিবারের বসতভিটা ও কৃষিজমি নেই, কিন্তু তারা কৃষিনির্ভর, তাদের ভূমিহীন হিসেবে বিবেচনা করা হবে। সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ বসতভিটা রয়েছে, কিন্তু কৃষিযোগ্য জমি নেই— এমন পরিবারও এ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত হবে। ফ্যামিলি কার্ড পেতে জাতীয় পরিচয়পত্র থাকতে হবে।
নীতিমালায় নগদ সহায়তার ক্ষেত্রে একটি ‘নেগেটিভ লিস্ট’ বা সুবিধার বাইরে রাখার তালিকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তালিকাভুক্ত আট ধরনের বৈশিষ্ট্যের যে কোনো একটি থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা পরিবার ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হবে না। সরকার নির্ধারিত প্রক্সি মিনস টেস্ট (পিএমটি) স্কোরের ঊর্ধ্বসীমার চেয়ে বেশি স্কোর পাওয়া পরিবার সুবিধা পাবে না; পরিবারের মনোনীত নারীপ্রধান সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা-সরকারি বা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থেকে নিয়মিত বেতন-ভাতা পেলে তিনি সুবিধার বাইরে থাকবেন। এমপিওভুক্ত শিক্ষক বা কর্মচারী হলেও ফ্যামিলি কার্ড পাওয়া যাবে না; পরিবারের মনোনীত নারীপ্রধান নিয়মিত সরকারি পেনশন বা অনুরূপ অবসর সুবিধা গ্রহণ করলে কার্ড পাবেন না। তবে প্রতিবন্ধী সন্তান হিসেবে বিশেষ পেনশন সুবিধা গ্রহণকারীরা এ শর্তের বাইরে থাকবেন; পরিবারের কোনো সদস্যের নামে জাতীয় সঞ্চয়পত্রে পাঁচ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগ থাকলে সুবিধা মিলবে না। একইভাবে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পাঁচ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়, স্থায়ী আমানত (ফিক্সড ডিপোজিট) বা অন্য কোনো বিনিয়োগ থাকলেও পরিবারটি বাদ পড়বে; পরিবারের কোনো সদস্যের নামে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) নিবন্ধিত তিন বা চার চাকার মোটরযান থাকলে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে না। এর মধ্যে সিএনজি বা পেট্রলচালিত ফোর-স্ট্রোক থ্রি-হুইলার, কার, জিপ, পিকআপ, বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, লরি ও মাইক্রোবাস রয়েছে; পরিবারের কোনো সদস্যের নামে বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত হালনাগাদ লাইসেন্সধারী ব্যবসা থাকলে তিনি এ কর্মসূচির সুবিধা পাবেন না; পরিবারের কোনো সদস্য নিয়মিত করদাতা হলে এবং তার করযোগ্য আয় থাকলে পরিবারটি ফ্যামিলি কার্ডের জন্য যোগ্য হবে না; বসতভিটাসহ পরিবারের মোট আবাদি জমির পরিমাণ শূন্য দশমিক ৫০ একর বা তার বেশি হলে কার্ড পাওয়া যাবে না। এ ছাড়া কোনো অকৃষি বা বাণিজ্যিক জমি কিংবা স্থানের বাজার মূল্য পাঁচ লাখ টাকার বেশি হলেও পরিবারটি সুবিধার বাইরে থাকবে।
নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, একই পরিবারের একাধিক সদস্য তালিকাভুক্ত হতে পারবেন না। নির্দিষ্ট সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ইতোমধ্যে সুবিধা পাচ্ছেন এবং সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় আসবেন না— এমন পরিবারও ফ্যামিলি কার্ড পাবে না। সরকারি তালিকাভুক্ত উপকারভোগীদের তথ্য সিঙ্গেল রেজিস্ট্রি সিস্টেমে যাচাই করে দ্বৈততা পাওয়া গেলে তাদেরও কর্মসূচির বাইরে রাখা হতে পারে।
এদিকে গত মঙ্গলবার প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশের উন্নয়নবিষয়ক হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একাধিক খাদ্য ভর্তুকি একত্র করা এবং বিদ্যমান নগদ অর্থসহায়তা কর্মসূচির উপকারভোগী নির্বাচনে যথাযথ লক্ষ্য নির্ধারণের সঙ্গে ফ্যামিলি কার্ড যুক্ত করা হলে দেশে অতিরিক্ত ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দেওয়া সম্ভব হতে পারে।
