ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা ও গোপনীয়তা নিয়ে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের মূল প্রতিষ্ঠান মেটাকে ২৫ বিলিয়ন ডলার জরিমানা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের একটি আদালত। বুধবার (২১ অক্টোবর) বিচারক ফ্রান্সিস জে. ম্যাথিউ এ আদেশ দেন। বাংলাদেশি সংখ্যাপদ্ধতিতে এই জরিমানার পরিমাণ ২ হাজার ৫০০ কোটি ডলার, যা যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অঙ্গরাজ্যে একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আরোপিত সবচেয়ে বড় আর্থিক দণ্ডগুলোর একটি।
কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা নামের একটি রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ফেসবুক ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য অননুমোদিতভাবে ব্যবহারের ঘটনা ঘিরে মামলাটির সূত্রপাত। ২০২১ সালে নিউ মেক্সিকো কর্তৃপক্ষ মেটার বিরুদ্ধে মামলা করে। অভিযোগে বলা হয়, ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য কীভাবে সংগ্রহ, সংরক্ষণ, ব্যবহার ও অন্যদের সঙ্গে ভাগ করা হয়, সে বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটি বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিয়েছিল। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষতিকর বিষয়বস্তু ও ভুল তথ্য মোকাবিলায় নিজেদের ভূমিকা নিয়েও বিভ্রান্তিকর দাবি করার অভিযোগ ওঠে।
দীর্ঘ শুনানি ও বিচারিক কার্যক্রমের পর গত সেপ্টেম্বর মাসে মামলার জুরিরা দেখতে পান, ফেসবুক নিউ মেক্সিকোর ভোক্তা অধিকার সুরক্ষা আইন প্রায় ৪ কোটি ৩৯ লাখ বার লঙ্ঘন করেছে। প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন বক্তব্য ও কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে এই লঙ্ঘনের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়। অঙ্গরাজ্যটির আইন অনুযায়ী, প্রতিটি ইচ্ছাকৃত লঙ্ঘনের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার ডলার পর্যন্ত আর্থিক দণ্ড আরোপের সুযোগ রয়েছে।
প্রাথমিক হিসাবে সম্ভাব্য জরিমানার পরিমাণ আরও অনেক বেশি হতে পারত। তবে সব বিষয় বিবেচনা করে বিচারক জরিমানার অঙ্ক কমিয়ে ২৫ বিলিয়ন ডলার নির্ধারণ করেন। আদালতের এই সিদ্ধান্ত প্রযুক্তি খাতের বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মামলাটির পেছনে রয়েছে ২০১৮ সালে প্রকাশ্যে আসা কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা বিতর্ক। অভিযোগ ছিল, তৃতীয় পক্ষের একটি আবেদন ব্যবহারের মাধ্যমে ফেসবুকের বিপুলসংখ্যক ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল। পরে এসব তথ্য রাজনৈতিক প্রচারসহ বিভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দায়িত্ব এবং ব্যবহারকারীদের সম্মতি নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করে।
নিউ মেক্সিকোর এই রায় মেটার জন্য বড় ধরনের আইনি ধাক্কা। তবে জরিমানার আদেশের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানটি আপিল করার পরিকল্পনা জানিয়েছে। ফলে মামলাটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এবং জরিমানার পরিমাণ ভবিষ্যতে পরিবর্তিত হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা নিয়ে মেটার বিরুদ্ধে এটিই একমাত্র আইনি পদক্ষেপ নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে শিশু-কিশোরদের ক্ষতি, আসক্তি বৃদ্ধি এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে আরও মামলা হয়েছে। এর আগে নিউ মেক্সিকোর পৃথক একটি মামলায় শিশু-কিশোরদের নিরাপত্তা নিয়ে অভিযোগের ভিত্তিতে মেটাকে ৩৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার জরিমানা করা হয়। পরে একই ঘটনায় ক্ষতিপূরণ ও সংশোধনমূলক ব্যবস্থার জন্য আরও ৫৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার দেওয়ার নির্দেশ আসে।
ক্রমাগত এসব আইনি পদক্ষেপ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য ব্যবহারের নীতি ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, সে বিষয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং গোপনীয়তা রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মেটার বিরুদ্ধে দেওয়া সর্বশেষ আদেশও সেই দায়বদ্ধতার প্রশ্নকে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
-20261022043341.jpg&w=1440&q=75)