দুর্গাপূজায় এবার ছিল লম্বা ছুটি। অনেকেই রাজধানী ছেড়ে গ্রামে গেছেন। ছুটির প্রভাবে বাজারে ক্রেতাদের উপস্থিতি একেবারে কম। পাইকারি বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় ডিমের দাম কমে ডজন ১১৩ থেকে ১১৪ টাকায় নেমেছে। কিন্তু সেই ডিম খুচরা বাজারে ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাইকারি বিক্রেতারা বলছেন, লম্বা ছুটিতে অফিসাররা বাজারে যান না। এ সুযোগে খুচরা ব্যবসায়ীরা ডাকাতের মতো দাম নিচ্ছেন। তাদের ধরা দরকার। সবজির বাজারেও দেখা গেছে একই চিত্র। পাইকারিতে যেভাবে দাম কমেছে সে তুলনায় খুচরায় কমেনি। গতকাল বৃস্পতিবার রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা ও পাইকারি বাজার ঘুরে এবং ক্রেতা-বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর নিত্য পণ্যের দাম বাড়ে এক দফা। সে সময় ডিমের দামও বেড়ে যায়। খুচরায় ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা ডজন ছুঁয়ে যায়। কিন্তু পূজার লম্বা ছুটিতে অনেকেই গ্রামে চলে যাওয়ায় তেজগাঁওয়ে ডিমের পাইকারি বাজারেও ক্রেতা কমে গেছে। কয়েক দিনের ব্যবধানে দাম কমে ১১৩ থেকে ১১৪ টাকা ডজন বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু সেই ডিম গতকালও রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে খুচরা বাজারে ১৫০ টাকা ডজন বিক্রি হয়। তারা ডজনে বেশি লাভ করছেন ৩৬ থেকে ৩৭ টাকা।
এ ব্যাপারে তেজগাঁও ডিম ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আমান উল্লাহ খবরের কাগজকে বলেন, ‘পূজার ছুটিতে ঢাকা ফাঁকা। কাস্টমার (ক্রেতা) নেই। ডিমের চাহিদা নেই। বেচা-কেনাও নেই। দাম কমে গেছে। কমতে কমতে ১০০ ডিম ৯৪০ থেকে ৯৫০ টাকায় বা সাড়ে ৯ টাকা পিস বা সর্বোচ্চ ১১৪ টাকা ডজন বিক্রি হচ্ছে।’ এই বাজারের পাইকারি ডিম বিক্রেতা হারুন অর রশিদও বলেন, ‘ঈদের মতোই পূজার লম্বা ছুটি চলছে। বাজারে বেচা-কেনা নেই। তাই ডিমের দাম কমে গেছে। ৯ টাকা ৪০ পয়সা থেকে সর্বোচ্চ সাড়ে ৯ টাকা পিস ডিম বিক্রি হচ্ছে।’
আরও পড়ুন
খুচরায় তো ১৫০ টাকার কমে মেলে না। এ ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘খুচরা ডিম বিক্রেতারা ডাকাত। ইচ্ছামতো দাম আদায় করছে। অথচ সাদা ডিম ৯ টাকা পিস বা ১০৮ টাকা ডজন বিক্রি হচ্ছে।’ এই পাইকারি বাজারের অন্য বিক্রেতারাও একই তথ্য জানান। ক্রেতা কমে যাওয়ায় কমেছে ডিমের দাম। কারণ এটা আটকানোর জিনিস না। ফার্ম থেকে প্রতিদিনই আসছে ডিম। সরবরাহ আগের মতোই, কমেনি।’
পাইকারিতে কমলেও খুচরা বাজারে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। বিভিন্ন বাজারে ডিমের দোকানে দেখা গেছে আগের মতোই খাঁচায় খাঁচায় সাজানো ডিম, তা ১৫০ থেকে ১৬০ টাকার কমে মেলে না। এ ব্যাপারে মোহাম্মদপুরের টাউন হল বাজারের ডিম বিক্রেতা মো. শহিদুলসহ অন্য বিক্রেতারা খবরের কাগজকে বলেন, ‘পূজার ছুটিতে বেচা-কেনা কম। দাম ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা ডজন। প্যারাগনের ডিম ১৬০ টাকা। তবে সাদা ডিম ১৪০ টাকা ডজন বিক্রি হচ্ছে। পাইকারিতে দাম কমছে না কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে। এ জন্য আমরাও দাম বাড়াইনি।’
এদিকে সেগুনবাগিচা কাঁচাবাজারের ডিম বিক্রেতা নুরে আলমও বলেন, ‘ডিমের দাম কমেনি। আগের মতোই ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা ডজন বিক্রি হচ্ছে।’ পাইকারি বাজারে ডিমের দাম কমা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘পূজার ছুটিতে বেচা-কেনা নেই। ২ দিন আগে কাপ্তান বাজার থেকে বেশি দামে কেনা। দাম কমলে আমরাও কম দামে বিক্রি করব।’ নিউমার্কেটেও একই অবস্থা। তবে কারওয়ান বাজারে খুচরা পর্যায়ে দাম একটু কম, ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা ডজন বিক্রি করতে দেখা গেছে।
সবজির বাজারেও দেখা গেছে, পাইকারিতে দাম বেশি কমলেও খুচরা বাজারে সে তুলনায় কমেনি। কারওয়ান বাজারের মো. সবুজসহ অন্য পাইকারি সবজি বিক্রেতারা বলেন, ‘সবজি আটকে রাখার জিনিস না। আবার আড়তেও রাখা যায় না। তাই পূজার লম্বা ছুটিতেও আগের মতো প্রতিদিন অসংখ্য সবজির গাড়ি ঢাকায় আসছে। কিন্তু চাহিদা কমে যাওয়ায় দাম কমেছে কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত।’
ক্রেতা কমে যাওয়ায় খুচরা বাজারে সবজির দাম কমেছে। কিন্তু পাইকারির তুলনায় তা কমেনি। দামের ব্যাপারে মোহাম্মদপুরের টাউন হল বাজারের সবজি বিক্রেতা মো. হাবিব খবরের কাগজকে বলেন, ‘পূজার লম্বা ছুটি চলেছে। অনেকেই বাড়ি গেছেন। এ জন্য বেচা-কেনা কমে গেছে। তাই দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত কমেছে। কারণ কয়েক দিন আগে তাল বেগুন (গোল) ১৬০ টাকা কেজি, সবুজ গোল বেগুন ১৪০ টাকা ও লম্বা বেগুন ১০০ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে। বর্তমানে এসব বেগুন ৮০-১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কাঁচা মরিচের দাম কমে ১৪০-১৬০ টাকা, শিম ১২০-১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এভাবে সব সবজি কমদামে বিক্রি করা হচ্ছে।’ অন্য বাজারের বিক্রেতারাও জানান, গাজর ১২০-১৪০ টাকা কেজি, শসা ৭০-১০০, ঝিঙে, ধুন্দল ৭০-৮০, ঢ্যাঁড়শ ৬০-৮০, পটোল ৬০-৮০, কাঁচা পেঁপে ২০-৩০, ফুলকপি ৬০-৭০ টাকা পিস, লাউ ৫০-৬০ টাকায় বিক্রি হয়। তবে এসব সবজি কারওয়ান বাজারে আরও কিছু কম দাম বিক্রি করতে দেখা যায়।
গতকালও আগের মতো মানভেদে পেঁয়াজ ৫০-৬০ টাকা কেজি, আলু ২৫-৪০ টাকা, রসুন ১৫০-১৮০, আদা ১৪০-১৯০, চিনি ১১০ টাকা, বড় দানার মসুর ডাল ৮২ টাকা কেজি, মাঝারি দানার ডাল ১৩৫ ও ছোট দানার মসুর ডাল ১৫৫ টাকা, বোতলজাত সয়াবিন তেল ২০৪ টাকা লিটার বিক্রি হচ্ছে। তবে ছোলা, বুটের ডাল ও অ্যাংকর ডালের দাম কেজিতে ১০ টাকা বেড়েছে গত সপ্তাহে।
আগের মতো গতকালও বিভিন্ন বাজারে সরু (মিনিকেট) চাল ৭৫-৮৫ টাকা কেজি, মাঝারি চাল ৫৫-৬০, মোটা চাল ৫০-৫২ টাকা, পোলাওয়ের চাল ১৮০-২০০ টাকা ও প্যাকেটজাত পোলাওয়ের চাল ২৩০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা যায়। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, নতুন ধান না উঠলে চালের দাম আর কমবে না।
উচ্চ মূল্যেই মাছ মাংস বিক্রি
গতকালও ব্রয়লার ১৮০-২০০ টাকা কেজি, সোনালি মুরগি ৩১০-৩৪০ টাকা, দেশি মুরগি ৫৫০-৫৮০ টাকা, গরুর মাংস ৭৮০-৮০০ টাকা, খাসির মাংস ১২৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছে। এ ব্যাপারে টাউন হল বাজারের মুরগি বিক্রেতা মো. শাকিল খবরের কাগজকে বলেন, ‘আগে দাম উঠা-নামা করলেও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর মুরগির বাজার চড়ে গেছে। আর কমেনি। কারণ খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচও বেড়ে গেছে। বাড়তি দর স্থির হয়ে গেছে। দাম বেশি হওয়ায় বিক্রি কমে গেছে।’ অন্য বাজারের খুচরা বিক্রেতারাও একই তথ্য জানান।
মাংসের মতো বাজারে মাছও চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। ‘গরিবের মাছ’ বলে পরিচিত পাঙাশ ২২০-২৬০ টাকা কেজি, তেলাপিয়া ২০০-২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে আকারে বড় এই মাছের দাম বেশি। এ ছাড়া রুই, কাতলার কেজি ৩৬০-৫৫০ টাকা, ট্যাংরা ৬০০-৯০০, পাবদা ৪০০-৬০০, চিংড়ি ৭০০-১৪০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।
