দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সামুদ্রিক বন্দর মোংলা এখন উন্নয়নের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে। একদিকে চীনের এক্সিম ব্যাংকের প্রায় ৩ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকার ঋণচুক্তি, অন্যদিকে কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ, নাব্যতা বৃদ্ধি, সড়ক-রেল যোগাযোগ সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর সরেজমিন পরিদর্শন।
সব মিলিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতি, শিল্পায়ন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে মোংলা বন্দরকে ঘিরে। তবে সম্ভাবনা আর বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধানও কম নয়। বন্দরের আধুনিকায়ন, বড় জাহাজ চলাচলের উপযোগী নাব্যতা, দ্রুত পণ্য খালাস, নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং সুন্দরবনের পরিবেশগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা না গেলে বিপুল অর্থের এই বিনিয়োগ প্রত্যাশিত সুফল নাও দিতে পারে। তাই মোংলা বন্দরের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি সেটিকে কতা কার্যকর, প্রতিযোগিতামূলক ও পরিবেশসম্মত বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত করা সম্ভব হবে।
চীনা ঋণে বড় আধুনিকায়ন প্রকল্প : মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে গত ১০ অক্টোবর চীনের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে ৩৩৫ দশমিক ৭৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ২ দশমিক ৪০৪ বিলিয়ন চীনা ইউয়ানের ঋণচুক্তি স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ সরকার। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশি মুদ্রায় ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকা। প্রকল্পটির নাম ‘এক্সপ্যানশন অ্যান্ড মডার্নাইজেশন অব মোংলা পোর্ট ফ্যাসিলিটিজ’। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ।
ঋণের সুদের হার ২ শতাংশ এবং পরিশোধের মেয়াদ ২০ বছর, যার মধ্যে পাঁচ বছর গ্রেস পিরিয়ড রয়েছে। [সূত্র: অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ ও বাসস] প্রকল্পের আওতায় আধুনিক যন্ত্রপাতিসমৃদ্ধ দুটি কনটেইনার টার্মিনাল, কনটেইনার ইয়ার্ড, কনটেইনার ডেলিভারি ইয়ার্ড এবং পণ্য হ্যান্ডলিং ইয়ার্ড নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব অবকাঠামো গড়ে উঠলে পণ্য ওঠানো-নামানো, কনটেইনার সংরক্ষণ ও সরবরাহের প্রক্রিয়া আরো গতিশীল হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বন্দরের সক্ষমতা শুধু জেটি বা জাহাজ ভেড়ানোর সুবিধার ওপর নির্ভর করে না। দ্রুত কনটেইনার খালাস, পণ্য সংরক্ষণ, কাস্টমস কার্যক্রম, নথিপত্র নিষ্পত্তি এবং দেশের অভ্যন্তরে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার সামগ্রিক ব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণে মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন প্রকল্পের সাফল্য নির্ভর করবে নতুন স্থাপনা নির্মাণের পাশাপাশি পুরো সরবরাহব্যবস্থাকে কতা সমন্বিত করা যায় তার ওপর। চীনা ঋণটি তুলনামূলক কম সুদের হলেও এটি ঋণ, অনুদান নয়। ফলে প্রকল্পের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা, কেনাকাটায় স্বচ্ছতা এবং ভবিষ্যতে বাড়তি আয় সৃষ্টির সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। নতুন অবকাঠামো নির্মাণের পর সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ, পরিচালন ব্যয় এবং ঋণ পরিশোধের দায়ও হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে।
বাড়ছে বন্দরের কার্যক্রম, আয়েও রেকর্ড : মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণের পক্ষে সাম্প্রতিক কার্যক্রমও ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বন্দরটি ৩৪৩ কোটি ৩৩ লাখ টাকা রাজস্ব আয় করেছে। একই সময়ে ১০৪ লাখ ১২ হাজার টন পণ্য হ্যান্ডলিং এবং ২১ হাজার ৪৫৬ টিইইউ কনটেইনার পরিচালনা করা হয়েছে। এ সময়ে বন্দরে এসেছে ৮৩০টি বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজ। পুনঃসংস্কার করা ১১ হাজার ৫৭৯টি গাড়িও আমদানি হয়েছে এই বন্দর দিয়ে। বন্দরের নিট মুনাফা ছিল ৬২ কোটি ১০ লাখ টাকা। পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, মোংলা বন্দর আর কেবল সম্ভাবনানির্ভর অবকাঠামো নয়।
আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে এর ব্যবহার বাড়ছে এবং বাণিজ্যিকভাবে সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগও তৈরি হয়েছে। তবে এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে বন্দরের কার্যক্রমকে আরো নির্ভরযোগ্য করতে হবে। একই সঙ্গে নতুন টার্মিনালের সম্ভাব্য সক্ষমতা, বর্তমান ব্যবহার এবং ভবিষ্যৎ পণ্য প্রবাহের মধ্যে বাস্তবসম্মত সমন্বয় জরুরি। বিশেষ করে কনটেইনার পরিবহনের ক্ষেত্রে মোংলা বন্দরের সম্ভাবনা কাজে লাগানো গেলে তৈরি পোশাক, পাট ও পাটজাত পণ্য, হিমায়িত খাদ্য, চিংড়ি, কৃষিপণ্য এবং শিল্পের কাঁচামাল পরিবহনে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে শুধু বন্দর আধুনিক হলেই রপ্তানি বাড়বে না। পণ্যের মান, পরিবহন ব্যয়, সময়মতো সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগও নিশ্চিত করতে হবে।
নাব্যতাই বড় চ্যালেঞ্জ : মোংলা বন্দরের দীর্ঘদিনের অন্যতম সমস্যা পশুর নদের নাব্যতা। পলি জমে নৌপথের গভীরতা কমে যাওয়ায় নিয়মিত ড্রেজিং করতে হয়। মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বন্দরটি মূলত ৮ দশমিক ৫০ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভেড়ানোর উপযোগী করে নকশা করা হয়েছিল। পরে পলি জমার সমস্যা বাড়তে থাকে। ১৯৯৪-৯৫, ২০০৪-০৫ ও ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বড় ধরনের ড্রেজিং প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। ২০১৯-২০ সালে আউটার বারে ড্রেজিংয়ের পর ৯ দশমিক ৫ থেকে ১০ মিটার ড্রাফটের জাহাজ বন্দরের অ্যাংকরেজ এলাকায় আসার সুযোগ পায়। বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, মোংলা বন্দর থেকে হারবারিয়া পর্যন্ত ইনার বারের প্রায় ২৩ দশমিক ৪ কিলোমিটার এলাকায় ড্রেজিংয়ের পরিকল্পনায় ২০২৬ সালের মধ্যে ২ কোটি ৩৭ লাখ ৫০ হাজার ঘনমিটার পলি অপসারণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।
প্রকল্পটি শেষ হলে জেটিতে অন্তত ৯ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভেড়ানোর সক্ষমতা তৈরির কথা রয়েছে। এ ছাড়া চ্যানেলের নাব্যতা ধরে রাখতে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ড্রেজিংও প্রয়োজন। [সূত্র: মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের ড্রেজিং-সংক্রান্ত তথ্য] বড় জাহাজ সরাসরি জেটিতে ভেড়াতে পারলে পণ্য পরিবহনের সময় ও খরচ কমতে পারে। জাহাজকে দূরে অবস্থান করতে হলে বা ছোট জাহাজের মাধ্যমে পণ্য স্থানান্তর করতে হলে অতিরিক্ত সময় ও ব্যয় তৈরি হয়। সে কারণে নাব্যতা বৃদ্ধি বন্দরের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানোর অন্যতম পূর্বশর্ত। কিন্তু ড্রেজিং একবার করেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।
২০২২ সালে ঔড়ঁৎহধষ ড়ভ অংরধহ ঊধৎঃয ঝপরবহপবং: ঢ-এ প্রকাশিত গবেষণায় মতিউর রহমান ও মো. শাহজাহান আলী পশুর নদে ড্রেজিংয়ের পর নদীর তলদেশের পরিবর্তন, পলি পুনরায় জমা হওয়া এবং নৌপথের স্থায়িত্ব নিয়ে আলোচনা করেছেন। গবেষণাটিতে বলা হয়েছে, উচ্চমাত্রায় পলি পুনরায় জমার কারণে শুধু ড্রেজিংকে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। এই গবেষণার আলোকে মোংলা বন্দরের জন্য নিয়মিত হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ, পলি জমার হার পর্যবেক্ষণ, নদীর প্রবাহ ও তলদেশের পরিবর্তন বিশ্লেষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ, কত ঘনমিটার পলি অপসারণ করা হলো, তার পাশাপাশি কত দিন নাব্যতা বজায় থাকল এবং প্রতি বছর কত টাকা ব্যয় করতে হলো, সেগুলোরও হিসাব প্রকাশ করা প্রয়োজন।
সড়ক-রেল যোগাযোগে সমন্বয় জরুরি : একটি আধুনিক সমুদ্রবন্দরের সাফল্য নির্ভর করে সমুদ্রপথের সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগব্যবস্থার কার্যকর সংযোগের ওপর। মোংলা বন্দরের ক্ষেত্রেও বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বন্দর থেকে পণ্য দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে দ্রুত পৌঁছাতে না পারলে কিংবা আমদানি করা কাঁচামাল কারখানায় সময়মতো সরবরাহ করা না গেলে জাহাজ থেকে দ্রুত পণ্য খালাসের সুবিধা পুরোপুরি কাজে আসবে না। খুলনা-মোংলা সড়ক চার লেনে উন্নীত করা, খুলনা-ভাঙ্গা করিডরের সঙ্গে কার্যকর সংযোগ, পণ্যবাহী ট্রেন ও কনটেইনার পরিবহন সম্প্রসারণ এবং রেলপথে পণ্য ওঠানো-নামানোর অবকাঠামো উন্নয়ন এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ট্রাক চলাচল, গুদাম, কনটেইনার ডিপো, পণ্য পরিবহনের বুকিং ও সরবরাহব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ আঞ্চলিক যোগাযোগ ও বাণিজ্য সহজীকরণ-সংক্রান্ত গবেষণায় দুর্বল আন্তমাধ্যম যোগাযোগ, পরিবহন ব্যয়, পণ্য ছাড়করণে দীর্ঘসূত্রতা এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতিকে বাণিজ্য প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ বিশ্লেষণ মোংলা বন্দরের ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক। [সূত্র: বিশ্বব্যাংক, বাংলাদেশ আঞ্চলিক যোগাযোগ প্রকল্প] সড়ক ও রেলপথের পাশাপাশি নদীপথে কনটেইনার পরিবহনের সুযোগও বাড়ানো যেতে পারে। এতে দীর্ঘ দূরত্বে ভারী পণ্য পরিবহনের ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। তবে এর জন্য উপযুক্ত নৌযান, কনটেইনার হ্যান্ডলিং ব্যবস্থা, নির্ভরযোগ্য সময়সূচি এবং নদীপথের নাব্যতা নিশ্চিত করতে হবে।
খান জাহান আলী বিমানবন্দর ও অর্থনৈতিক অঞ্চল : আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী, জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান, সরবরাহকারী এবং বিনিয়োগকারীদের যাতায়াত সহজ করতে খান জাহান আলী বিমানবন্দর চালুর বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। বিমানবন্দরটি চালু হলে খুলনা ও বাগেরহাট অঞ্চলে ব্যবসায়িক যোগাযোগের সুযোগ বাড়তে পারে। তবে বিমানবন্দরের অবকাঠামো নির্মাণ বা চালুর পরিকল্পনাকে তাৎক্ষণিক বাস্তবতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর বর্তমান নির্মাণ-অবস্থা, অর্থায়ন, অনুমোদন, পরিচালন পরিকল্পনা এবং বাণিজ্যিক সম্ভাবনা সম্পর্কে হালনাগাদ সরকারি তথ্য প্রয়োজন। একইভাবে প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে উঠলে মোংলা বন্দরকে কেন্দ্র করে নতুন শিল্পকারখানা স্থাপনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
বন্দরসংলগ্ন এলাকায় শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে কাঁচামাল আমদানি, পণ্য রপ্তানি, গুদামজাতকরণ, পরিবহন, প্যাকেজিং এবং অন্যান্য সহায়ক সেবার চাহিদা বাড়বে। এতে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হতে পারে। তবে অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘোষণার পরই বিনিয়োগ নিশ্চিত হয় না। বিনিয়োগকারীদের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস, পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জমি বরাদ্দের স্বচ্ছতা, কাস্টমস সেবা, শ্রমিকদের আবাসন এবং নিরাপদ পরিবহনব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি কোন শিল্পে কী ধরনের বিনিয়োগ আসতে পারে, স্থানীয় জনগণ কতা কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবেন এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা কীভাবে সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হবে, তারও পরিকল্পনা প্রয়োজন।
সুন্দরবন সুরক্ষা উন্নয়নের শর্ত : মোংলা বন্দরের ভৌগোলিক অবস্থান একদিকে যেমন বড় সুবিধা, অন্যদিকে তেমনি পরিবেশগত দায়িত্বও বাড়িয়ে দিয়েছে। বন্দরের আশপাশে রয়েছে সুন্দরবন, যা বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ এবং ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। বন্দরের সম্প্রসারণ, ড্রেজিং, জাহাজ চলাচল ও শিল্পায়ন বাড়লে নদীর পানির গুণগত মান, পলি ব্যবস্থাপনা, জলজ প্রাণী এবং আশপাশের বাস্তুতন্ত্রের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটি সুন্দরবনের অসাধারণ বৈশ্বিক গুরুত্ব অক্ষুণ্ন রাখা এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিল্প ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রত্যক্ষ, পরোক্ষ ও সম্মিলিত প্রভাব বিবেচনায় নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। [সূত্র: ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির সুন্দরবনবিষয়ক সিদ্ধান্ত]
এ কারণে ড্রেজিংয়ের আগে ও পরে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, অপসারিত পলি কোথায় ফেলা হচ্ছে তার নজরদারি, পানির গুণমান পরীক্ষা, শব্দ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত পরিবেশগত প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে। পরিবেশগত ছাড়পত্রের শর্ত বাস্তবে মানা হচ্ছে কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করাও গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়ন ও পরিবেশ সুরক্ষাকে পরস্পরের বিরোধী হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। বরং পরিবেশগত ঝুঁকি কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বন্দর পরিচালনা নিশ্চিত করা গেলে অর্থনৈতিক কার্যক্রমও বেশি টেকসই হবে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা : গত ২২ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মোংলা বন্দরের ৯ নম্বর জেটি ও প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিদর্শন করেন। বন্দর কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা জানান, পরিদর্শনকালে প্রধানমন্ত্রী বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও প্রয়োজনীয় নাব্যতা অর্জনসহ সার্বিক উন্নয়নের বিভিন্ন বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। মোংলা বন্দর বার্থ ও শিপ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. জুলফিকর আলী বলেন, মোংলা বন্দরের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সফর সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ ত্বরান্বিত করবে। নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল ও এলএনজি টার্মিনাল নির্মিত হলে এ অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বাগেরহাট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি শেখ সাহেদ আলী রবি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমাতে মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। এ জন্য বন্দর চ্যানেলের নাব্যতা বাড়াতে ড্রেজিংয়ের পাশাপাশি মোংলা কাস্টমস হাউস ও শুল্ক বিভাগের আধুনিকায়ন প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রীর সফর এসব উদ্যোগ এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে বলে তিনি আশা করেন। বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরের ফলে এ অঞ্চলে বিনিয়োগের গতি বাড়বে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় এলাকার যেসব মানুষ কাজ হারাচ্ছেন, তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতেও উন্নয়ন প্রকল্পগুলো ভূমিকা রাখতে পারে। তার মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতি, অবকাঠামো ও মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের গবেষণা কী বলছেন : মোংলা বন্দরের ভবিষ্যৎ মূল্যায়নে দুটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ : বন্দরের নাব্যতা দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ পরিবহনব্যবস্থার সঙ্গে কার্যকর সংযোগ গড়ে তোলা। পশুর নদে ড্রেজিং নিয়ে মতিউর রহমান ও মো. শাহজাহান আলীর গবেষণা ইঙ্গিত দেয়, নদীর তলদেশে পলি পুনরায় জমার বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়ে শুধু খননকাজের ওপর নির্ভর করলে দীর্ঘমেয়াদে প্রত্যাশিত নাব্যতা ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।
অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের আঞ্চলিক যোগাযোগবিষয়ক বিশ্লেষণ দেখায়, পরিবহন, কাস্টমস, পণ্য ছাড়করণ ও বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যমের মধ্যে সমন্বয় দুর্বল থাকলে উন্নত অবকাঠামোর সুফলও সীমিত হয়ে যায়। এই দুই গবেষণার আলোকে মোংলা বন্দরের উন্নয়ন পরিকল্পনায় তিনটি অগ্রাধিকার থাকা প্রয়োজন। প্রথমত, ড্রেজিংয়ের পরিমাপযোগ্য ফলাফল ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের হিসাব নিয়মিত প্রকাশ। দ্বিতীয়ত, সড়ক, রেল, নৌপথ ও কাস্টমস কার্যক্রমকে একটি সমন্বিত সরবরাহব্যবস্থায় যুক্ত করা। তৃতীয়ত, সুন্দরবন ও পশুর নদের পরিবেশগত পরিবর্তন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে পরিবেশ সুরক্ষার শর্ত যুক্ত রাখা।
বিনিয়োগের সুফল নিশ্চিত করতে জবাবদিহি চাই : মোংলা বন্দরের আধুনিকায়নে বিপুল বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হবে বাস্তবায়নের মান দিয়ে। প্রকল্পের ব্যয় ও সময়সীমা, দরপত্রের স্বচ্ছতা, নির্মাণকাজের গুণগত মান, যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা এবং ভবিষ্যৎ পরিচালন ব্যয় নিয়মিত পর্যালোচনা করতে হবে। এ জন্য প্রকল্পের অগ্রগতি, অর্থ ছাড়, ব্যয়, বাস্তবায়নের সময়সূচি এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা প্রয়োজন।
নতুন টার্মিনাল চালু হওয়ার পর বছরে কত পণ্য ও কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা হচ্ছে, জাহাজের অপেক্ষার সময় কতা কমছে, প্রতি টন পণ্য পরিবহনে ব্যয় কতা সাশ্রয় হচ্ছে এবং বন্দরের আয় কতা বাড়ছে, সেসব সূচক ধরে সাফল্য মূল্যায়ন করা উচিত। একই সঙ্গে মোংলা বন্দরকে কেন্দ্র করে স্থানীয় উদ্যোক্তা, পরিবহন ব্যবসায়ী, শ্রমিক, কৃষক, মৎস্যজীবী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়াতে হবে। উন্নয়নের সুফল যদি কেবল বড় বিনিয়োগকারী ও সীমিত কিছু প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে আঞ্চলিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব প্রত্যাশার তুলনায় কম হবে।
সব মিলিয়ে মোংলা বন্দরের সামনে এখন নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি বড় দায়িত্বও রয়েছে। আধুনিক টার্মিনাল, পর্যাপ্ত নাব্যতা, কার্যকর সড়ক-রেল যোগাযোগ, দ্রুত কাস্টমস সেবা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে বন্দরটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিল্পায়ন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আরো বড় ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে সুন্দরবনের পরিবেশগত সুরক্ষা এবং ঋণের অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
মোংলা বন্দরের মহা-রূপান্তর তাই শুধু অবকাঠামো নির্মাণের প্রকল্প নয়। এটি বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সক্ষমতা বাড়ানো, আঞ্চলিক যোগাযোগ সম্প্রসারণ এবং উপকূলীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার একটি বড় সুযোগ। এই সুযোগকে বাস্তব সাফল্যে পরিণত করতে প্রয়োজন পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সময়মতো বাস্তবায়ন।
বিআলো/অর্নব