চাঁপাইনবাবগঞ্জের সড়কগুলোতে থামছে না দুর্ঘটনা, বাড়ছে প্রাণহানিও। গত ৩৪ মাসে জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৫০ জন। সবচেয়ে বিপজ্জনক সোনামসজিদ মহাসড়ক। জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের চার ভাগের তিন ভাগই এই সড়কে প্রাণ হারান। সংশ্লিষ্টদের মতে, অযোগ্য ও মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহনের চলাচল, বেপরোয়া গতি, আইন অমান্য এবং মহাসড়কে নিষিদ্ধ তিন চাকার যান চলাচল দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ও জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩৪ মাসে চাঁপাইনবাবগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় ১৫০ জন নিহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় বহু পরিবার হারিয়েছে উপার্জনক্ষম সদস্যকে। অনেক মা বাবা হারিয়েছেন সন্তানকে, আবার অনেক সন্তান হারিয়েছে মা বাবাকে। দুর্ঘটনায় আহত হয়ে অনেকে হারাচ্ছেন শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে সোনামসজিদ পর্যন্ত মহাসড়কে বেশির ভাগ যানবাহনই বেপরোয়া গতিতে চলাচল করে। এ সড়ক দিয়ে ভারত থেকে আসা পণ্যবাহী ট্রাক চলাচল করে। পাশাপাশি বেড়েছে যাত্রীবাহী যানবাহনের সংখ্যাও। বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাস, ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক অটোরিকশা এবং স্থানীয়ভাবে তৈরি ভটভটি ও নসিমন চলাচল করে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অযোগ্য ও মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহনের চলাচল, বেপরোয়া গতি এবং ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। মহাসড়কের কয়েকটি স্থানে ‘দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা, আস্তে গাড়ি চালান’ লেখা সাইনবোর্ড টাঙানো হলেও দুর্ঘটনা কমছে না।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর রাতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার চৌডালা কানসাট সড়কের পুসকুনি এলাকায় মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় বাবা ও ছেলেসহ তিনজন নিহত হন। এ ঘটনায় আহত হন আরও আটজন। নাচোলের সোনাইচণ্ডী হাটে গরু বিক্রি করে অবৈধ পরিবহন ভটভটিতে বাড়ি ফিরছিলেন তারা। ফেরার পথে ভটভটিটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে গেলে এ হতাহতের ঘটনা ঘটে।
সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা সরকারি দপ্তরগুলোর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তৎপরতার অভাব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে আগামী ২৮ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস পালন করবে সরকার। ২০১৭ সাল থেকে সরকারিভাবে ২২ অক্টোবর দিবসটি পালন করা হয়। তবে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজার ছুটির কারণে এ বছর দিবসটি পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। এবারের প্রতিপাদ্য, ‘নিরাপদ সড়ক সমৃদ্ধ দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’।
২০১৮ সালের ২৯ জুলাই রাজধানীর কুর্মিটোলায় দুই বাসের পাল্লাপাল্লিতে বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থী নিহত হন। এ ঘটনার পর দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। গড়ে ওঠে নজিরবিহীন সড়ক নিরাপত্তা আন্দোলন। আন্দোলনের পর তৎকালীন সরকার সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ পাস করে এবং সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। তবে সেসব উদ্যোগের অধিকাংশই পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
আইনজীবী মো. আব্দুস সালাম বলেন, ‘সড়ক নিরাপত্তায় উচ্চ আদালতের নির্দেশনা ও আইন রয়েছে। কিন্তু সঠিক প্রয়োগের অভাবে সড়কগুলো দিন দিন বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। প্রতি বছর মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে, অনেকে আহত হচ্ছে। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি মানুষ সচেতন না হলে দুর্ঘটনা কমানোর কোনো উদ্যোগই কাজে আসবে না। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজ নয়, পরিবহন মালিক ও শ্রমিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার এবং প্রতিটি নাগরিকেরও দায়িত্ব রয়েছে।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সার্কেলের বিআরটিএর সহকারী পরিচালক মো. শাহজামান বলেন, ‘দুর্ঘটনা প্রতিরোধে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এএনএম ওয়াসিম ফিরোজ বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে চালক, মালিক ও পথচারী সবার দায়িত্ব রয়েছে। সবাই সচেতন হলে সড়কে ট্রাফিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে পুলিশ দিনরাত কাজ করছে। সবাই আইন মেনে চললে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।’
/অ
