যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে বিলিয়নেয়ারদের নিট সম্পদের ওপর এককালীন ৫ শতাংশ কর আরোপের প্রস্তাব ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ‘প্রপোজিশন ৪০’ নামের এই প্রস্তাবে প্রায় ২০০ বিলিয়নেয়ারের সম্পদের ওপর কর আরোপ করে স্বাস্থ্যসেবা খাতের অর্থসংকট মোকাবিলায় ১০ হাজার কোটি ডলার সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে এ বিষয়ে ভোট দেবেন অঙ্গরাজ্যের বাসিন্দারা। সমর্থকদের দাবি, এতে সম্পদ বৈষম্য কমানোর পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবার অর্থায়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তবে বিরোধীদের আশঙ্কা, এই করের কারণে ধনকুবেররা অঙ্গরাজ্য ছেড়ে চলে গেলে বিনিয়োগ ও রাজস্ব আয় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ক্যালিফোর্নিয়া যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম অর্থনীতির অঙ্গরাজ্য এবং বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির অধিকারী। এখানে অপরাহ উইনফ্রে, মেটার প্রধান মার্ক জাকারবার্গ, রিয়ালিটি টিভি তারকা কিম কারদাশিয়ান ও চলচ্চিত্র নির্মাতা জর্জ লুকাসের মতো ধনী ও বিখ্যাত ব্যক্তিদের বসবাস। একই সঙ্গে অঙ্গরাজ্যটিতে গৃহহীন মানুষের সংখ্যাও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সর্বোচ্চ এবং সম্পদ বৈষম্যও ব্যাপক। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলির পাবলিক পলিসির অধ্যাপক ফ্রান্সেস্কো ট্রেব্বি বলেন, প্রস্তাবটি সম্পদ বণ্টনের সর্বোচ্চ স্তরে থাকা অতি-ধনীদের লক্ষ্য করে আনা প্রথম বিলিয়নেয়ার কর। তার মতে, এটি ক্যালিফোর্নিয়ার সম্পদ বৈষম্য কমাতে সহায়তা করতে পারে।
প্রস্তাবটির সমর্থকদের দাবি, অতি-ধনীরা তাদের সম্পদের ন্যায্য অংশ কর হিসেবে দিলে অঙ্গরাজ্যের বাজেটের ঘাটতি মোকাবিলা সহজ হবে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কর ও ব্যয়সংক্রান্ত বিস্তৃত বিলের কারণে স্বাস্থ্যসেবা খাতে ফেডারেল তহবিল কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রস্তাবটির পক্ষে প্রচারণা চালানো সার্ভিস এমপ্লয়িজ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন-ইউনাইটেড হেলথকেয়ার ওয়ার্কার্স ওয়েস্টের চিফ অব স্টাফ সুজান হিমেনেজ বলেন, স্বাস্থ্যসেবা খাতে সম্ভাব্য অর্থসংকট মোকাবিলায় এই কর একটি স্বল্পমেয়াদি সমাধান হতে পারে। তিনি বিবিসিকে বলেন, কোনো পদক্ষেপ না নিলে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত এটি অন্তর্বর্তী সমাধান হিসেবে কাজ করবে।
প্রস্তাবটির পক্ষে বিলিয়নেয়ারদের মধ্যেও সমর্থন রয়েছে। এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং কর দেওয়ার বিষয়ে আপত্তি নেই বলে জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিবিএসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আয় যত বেশি হবে, করও তত বেশি দিতে হবে—এতে আমার সমস্যা নেই। ‘আমেরিকান ড্রিম’-এর উদাহরণ হিসেবেও উল্লেখ করেন। ব্যবসায়ী টম স্টেয়ারও করটির পক্ষে ভোট দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। চলতি বছরের শুরুতে ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ব্যর্থ হওয়া স্টেয়ার বলেন, প্রস্তাবটির খসড়া তৈরির পদ্ধতিতে সমস্যা থাকলেও অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত বাসিন্দাদের সুরক্ষায় এটি প্রয়োজনীয়। ভারমন্টের সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সও প্রস্তাবটির পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছেন। লস অ্যাঞ্জেলেসের এক সমাবেশে তিনি বলেন, বিলিয়নেয়াররা ঊনবিংশ শতাব্দীর রাজাদের মতো শাসন করার অধিকারকে ঈশ্বরপ্রদত্ত বলে মনে করে। ৩ নভেম্বর আমরা বড় ধরনের বার্তা পেতে পারি।
তবে প্রস্তাবটি বিলিয়নেয়ার ও রাজনৈতিক নেতাদের বিরোধিতার মুখেও পড়েছে। গুগলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা সার্গেই ব্রিন সম্পদ করের বিরোধিতা করা রাজনৈতিক উদ্যোগে ১০ কোটি ডলারের বেশি অর্থ দিয়েছেন বলে লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস জানিয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসামও প্রস্তাবটির বিরোধিতা করছেন। তার আশঙ্কা, কর আরোপ করা হলে ধনী ব্যক্তিরা অঙ্গরাজ্য ছেড়ে চলে যেতে পারেন এবং এতে গুরুত্বপূর্ণ আয়কর রাজস্ব হারাবে সরকার। বার্কলে ইনস্টিটিউট অব গভর্নমেন্টাল স্টাডিজ ও লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমসের সেপ্টেম্বরের জরিপে দেখা গেছে, সম্ভাব্য ভোটারদের ৪৫ শতাংশ প্রস্তাবটির পক্ষে, ৪২ শতাংশ বিপক্ষে এবং ১৩ শতাংশ তখনো সিদ্ধান্ত নেননি। প্রস্তাবটি পাস করতে অঙ্গরাজ্যের ভোটারদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন প্রয়োজন।
