পুরান ঢাকার সদরঘাট, বাহাদুর শাহ পার্ক আর বুড়িগঙ্গার সান্নিধ্যে গড়ে ওঠা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিকাশের গল্প নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার বিস্তার, রাজনৈতিক আন্দোলন, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ও সামাজিক পরিবর্তনের নানা অধ্যায়। ১৮৫৮ সালে ঢাকা ব্রহ্ম স্কুল হিসেবে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি সময়ের ধারাবাহিকতায় স্কুল থেকে কলেজ এবং পরে পূর্ণাঙ্গ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ নেয়। ২০২৬ সালে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষাযাত্রা ১৬৮ বছরে পা দিয়েছে।
দীর্ঘ এই পথচলায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় অর্জন করেছে স্বতন্ত্র ঐতিহ্য ও পরিচিতি। তবে ইতিহাস ও অর্জনের পাশাপাশি সীমিত ক্যাম্পাস, আবাসনসংকট এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মতো চ্যালেঞ্জও এখনো প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।
ব্রহ্ম স্কুল থেকে জগন্নাথ কলেজ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সূচনা ১৮৫৮ সালে ঢাকা ব্রহ্ম স্কুল প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। দীননাথ সেন, প্রভাতীচরণ রায়, অনাথবন্ধু মল্লিক ও ব্রজসুন্দর কৈত্রের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি সে সময় ঢাকায় শিক্ষার প্রসারে ভূমিকা রাখতে শুরু করে। পরবর্তী সময়ে বালিয়াটির জমিদার কিশোরীলাল রায় চৌধুরী প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৮৭২ সালে তাঁর বাবা জগন্নাথ রায় চৌধুরীর নাম অনুসারে বিদ্যালয়টির নাম রাখা হয় ‘জগন্নাথ স্কুল’।
শিক্ষার পরিসর বাড়ানোর ধারাবাহিকতায় ১৮৮৪ সালের ৪ জুলাই প্রতিষ্ঠানটি দ্বিতীয় শ্রেণির কলেজে উন্নীত হয়। এর মধ্য দিয়ে মাধ্যমিক শিক্ষার গণ্ডি পেরিয়ে উচ্চশিক্ষার জগতে প্রবেশ করে জগন্নাথ কলেজ। ১৮৮৭ সালে স্কুল ও কলেজের কার্যক্রম আলাদা হয়ে যায়। স্কুল বিভাগটি কিশোরী জুবিলি স্কুল নামে স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি পায়, যা পরবর্তী সময়ে কে এল জুবিলি স্কুল নামে পরিচিত হয়।
১৯০৭ সালে কলেজটির পরিচালনার দায়িত্ব ট্রাস্টি বোর্ডের হাতে ন্যস্ত হয় এবং পরের বছর এটি প্রথম শ্রেণির কলেজে উন্নীত হয়। ইংরেজি, দর্শন ও সংস্কৃতসহ বিভিন্ন বিষয়ে সম্মান এবং ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়াশোনার সুযোগ চালুর মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির একাডেমিক পরিসর বিস্তৃত হতে থাকে। একপর্যায়ে জগন্নাথ কলেজ ঢাকার অন্যতম পরিচিত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
আন্দোলন-সংগ্রাম ও জাতীয় ইতিহাসে জগন্নাথ
জগন্নাথ কলেজের ইতিহাস বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধসহ বিভিন্ন সময়ে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীরা আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নেন। তাঁদের রাজনৈতিক সচেতনতা ও অধিকার আদায়ের ভূমিকা প্রতিষ্ঠানটিকে জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে তৎকালীন জগন্নাথ কলেজের শিক্ষার্থীরাও সক্রিয় ছিলেন। ভাষা আন্দোলনের শহীদ রফিক তৎকালীন জগন্নাথ কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। পাকিস্তানি শাসনামলে স্বাধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ অব্যাহত ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময়ও প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতা ও যুদ্ধের প্রভাবের মুখোমুখি হন।
স্বাধীনতার পরও বিভিন্ন জাতীয় ও ছাত্র আন্দোলনে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ অব্যাহত রয়েছে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানেও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ভূমিকা রাখেন। শিক্ষার অধিকার, গণতান্ত্রিক পরিবেশ, আবাসনসংকট ও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বতন্ত্র পরিচয়ের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যুক্ত করেছে। ফলে জগন্নাথের ইতিহাস শুধু শ্রেণিকক্ষ ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের ইতিহাস নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অধিকার আদায় ও সামাজিক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতাও।
কলেজ থেকে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়
জগন্নাথ কলেজকে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের দাবি দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচিত ছিল। উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার পরিসর সম্প্রসারণের প্রত্যাশা থেকে এ দাবি আরও জোরালো হয়।
১৯৯৫ সালের ২ নভেম্বর প্রতিষ্ঠানটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে ২০০৪ সালের ৬ নভেম্বর একনেকের সভায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্প অনুমোদন পায়। দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে ২০০৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাস হয়। একই বছরের ২০ অক্টোবর সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি পূর্ণাঙ্গ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যাত্রা শুরু করে।
২০০৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম খান বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রথম উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান। এর মধ্য দিয়ে শুরু হয় নতুন প্রশাসনিক ও একাডেমিক অধ্যায়। বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যাত্রার শুরুতে চারটি অনুষদের অধীনে ২০টি বিভাগ নিয়ে কার্যক্রম পরিচালিত হয়। পরবর্তী সময়ে নতুন বিভাগ, অনুষদ ও ইনস্টিটিউট যুক্ত হওয়ায় শিক্ষার পরিসর আরও বিস্তৃত হয়।
আইন, জীবন ও ভূবিজ্ঞান, চারুকলাসহ বিভিন্ন বিষয়ে পাঠদান ও গবেষণার সুযোগ তৈরির মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির একাডেমিক বৈচিত্র্য বাড়ে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার অন্যতম গন্তব্য হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
২০ বিভাগ থেকে বহুমাত্রিক উচ্চশিক্ষা
বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যাত্রার সময় সীমিতসংখ্যক বিভাগ নিয়ে শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিসর বেড়েছে। নতুন বিভাগ, অনুষদ ও ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনা ও গবেষণার সুযোগ তৈরি হয়েছে। পেশাভিত্তিক শিক্ষা ও সময়োপযোগী বিষয়ে পাঠদানের উদ্যোগও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকার্যক্রমে বৈচিত্র্য এনেছে।
তবে একাডেমিক পরিসর বাড়লেও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। পুরান ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত মূল ক্যাম্পাসে পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, গবেষণাগার, খেলার মাঠ ও আবাসনসুবিধার অভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। সীমিত জায়গায় বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করাও প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
দ্বিতীয় ক্যাম্পাস ঘিরে প্রত্যাশা
আবাসনসংকট নিরসন ও আধুনিক শিক্ষাঙ্গন গড়ে তোলার লক্ষ্যে কেরানীগঞ্জে প্রায় ২০০ একর জমিতে দ্বিতীয় ক্যাম্পাস নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১৭ সালে প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন পায়। তবে নানা জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রকল্পের কাজ প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি। এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনও হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে সম্পৃক্ত করা হয়। ২০২৫ সালের ৩ জুন অবশিষ্ট ১১ দশমিক ৪০ একর জমি হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে প্রকল্পের জমি বুঝে পাওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এরপর ভূমি উন্নয়ন, সীমানাপ্রাচীর, অভ্যন্তরীণ সড়ক ও আবাসিক হল নির্মাণসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত কাজ এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
দ্বিতীয় ক্যাম্পাস চালু হলে শিক্ষার্থীদের আবাসন, গবেষণা ও শিক্ষা কার্যক্রমের সুযোগ বাড়বে বলে প্রত্যাশা বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্টদের। তবে প্রকল্পের কাজ শেষ করে পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা কার্যক্রম চালু করাই এখন বড় লক্ষ্য।
আবাসনসংকট: দীর্ঘদিনের বাস্তবতা
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসনসংকটের ইতিহাস পুরোনো। জগন্নাথ কলেজের সময় পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষার্থীদের জন্য ছাত্রাবাস ছিল। কিন্তু আশির দশকে এসব হলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। ১৯৮৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি আরমানিটোলার শহীদ আব্দুর রহমান হলে শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের সংঘর্ষের পর তৎকালীন সরকারের সিদ্ধান্তে একাধিক ছাত্রাবাস বন্ধ করে দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীরা হল ছাড়ার পর অনেক ভবনের নিয়ন্ত্রণ অন্যদের হাতে চলে যায়। কোনো কোনো ভবনে গড়ে ওঠে মার্কেট, স্কুল, গুদাম ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান।
তিব্বত হল, শহীদ আজমল হোসেন হল, শহীদ শাহাবুদ্দিন হল, শহীদ আনোয়ার শফিক হল, ড. হাবিবুর রহমান হল ও নজরুল ইসলাম হলসহ বিভিন্ন ছাত্রাবাস ঘিরে দখল ও মালিকানাসংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হয়। ২০০৫ সালে কলেজটি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হলেও আবাসনসংকট কাটেনি। হল উদ্ধারের দাবিতে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন করেছেন।
পরবর্তী সময়ে ছাত্রীদের জন্য বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল চালু করা হয়। পাশাপাশি মূল ক্যাম্পাসে বাণী ভবন ও ড. হাবিবুর রহমান ভবন নামে দুটি আবাসিক হলের নির্মাণকাজও চলছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে হল দুটির নির্মাণকাজ শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে হস্তান্তরের প্রত্যাশা রয়েছে।
তবে নতুন হল নির্মাণের উদ্যোগ সত্ত্বেও দীর্ঘদিনের আবাসনসংকট পুরোপুরি কাটবে কি না, তা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা রয়েছে। শিক্ষার্থীর তুলনায় আবাসনসুবিধা সীমিত হওয়ায় অনেককেই এখনো ক্যাম্পাসের বাইরে বাসা বা মেসে থাকতে হচ্ছে। ফলে আবাসন এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অন্যতম বড় দাবি।
ঐতিহ্যের সঙ্গে ভবিষ্যতের প্রত্যাশা
১৮৫৮ সালের একটি স্কুল থেকে ২০০৫ সালের পূর্ণাঙ্গ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়—জগন্নাথের এই দীর্ঘ যাত্রা সময়ের পরিবর্তন, কয়েক প্রজন্মের অবদান ও উচ্চশিক্ষার বিস্তারের সাক্ষ্য বহন করে। কিশোরীলাল রায় চৌধুরীর পৃষ্ঠপোষকতা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অবদান, জাতীয় আন্দোলনে অংশগ্রহণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের দীর্ঘ প্রত্যাশা মিলেই গড়ে উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির স্বতন্ত্র পরিচয়।
পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী পরিবেশে দাঁড়িয়ে থাকা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আজ অতীতের স্মৃতি ও ভবিষ্যতের প্রত্যাশাকে একসূত্রে ধারণ করছে। একদিকে রয়েছে ১৬৮ বছরের শিক্ষাযাত্রা, অন্যদিকে আধুনিক শিক্ষাঙ্গন, উন্নত গবেষণা ও শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা। দীর্ঘ ঐতিহ্যকে ধারণ করে সেই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নই এখন বিশ্ববিদ্যালয়টির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
