আর্জেন্টাইন ফুটবল কিংবদন্তি ডিয়েগো ম্যারাডোনার ২০২০ সালে মৃত্যুর ঘটনায় দায়েরকৃত অবহেলাজনিত মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেছেন আদালত। দীর্ঘ ছয় মাসের নিবিড় শুনানি শেষে আগামী ২২ ডিসেম্বর এই মামলার রায় ঘোষণা করা হবে বলে বৃহস্পতিবার নিশ্চিত করেন বিচারক।
১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপজয়ী এই মহানায়কের চিকিৎসায় মারাত্মক গাফিলতির অভিযোগে সাতজন স্বাস্থ্যকর্মীর বিরুদ্ধে বিচারকাজ পরিচালিত হচ্ছিল। বৃহস্পতিবার ম্যারাডোনার কন্যা এবং অভিযুক্তদের সমাপনী বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বহুল আলোচিত এই শুনানিপর্বের সমাপ্তি ঘটে।
শুনানির শেষ দিনে আদালতে আবেগভারাক্রান্ত কণ্ঠে ম্যারাডোনার মেয়ে দালমা ম্যারাডোনা বলেন, ‘আমি আশা করি, আমার বাবা তাঁর প্রাপ্য ন্যায়বিচার পাবেন, যেমনটা অন্য যে কারও পাওয়া উচিত।’
অন্যদিকে মামলার মূল অভিযুক্ত ও প্রয়াত তারকার ব্যক্তিগত চিকিৎসক লিওপোলদো লুকে নিজের ওপর আরোপিত দায় অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি নির্দোষ।’ শুনানিতে লুকের আইনজীবীরা প্রসিকিউশনের যুক্তি প্রত্যাখ্যান করে দাবি করেন যে ম্যারাডোনার মৃত্যুর কোনো পূর্বাভাস আগে থেকে পাওয়া সম্ভব ছিল না এবং এ মামলায় চিকিৎসক লুকেকে কেবল ‘বলির পাঁঠা’ বানানো হচ্ছে। আত্মপক্ষ সমর্থন করতে গিয়ে লুকের পক্ষ থেকে অডিও রেকর্ড, গবেষণাপত্র ও ময়নাতদন্তের ভিডিও আদালতে উপস্থাপন করা হলে ম্যারাডোনার স্বজনেরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান।
আদালতের শুনানিতে লুকে উল্লেখ করেন, ‘ম্যারাডোনার সঙ্গে আমার সবচেয়ে বেশি যোগাযোগ ছিল বলে আমাকে আক্রমণ করা সহজ।’ তিনি আরও বলেন, ‘একমাত্র ডিয়েগোই আমাকে রক্ষা করতেন।’ কিংবদন্তির প্রতি নিজের অনুভূতির প্রকাশ ঘটিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি তাঁর গভীরভাবে যত্ন নিতাম, তাঁকে ভালোবাসতাম। তিনি ছিলেন আমার আদর্শ ও বন্ধু।’
মস্তিষ্কে একটি জটিল অস্ত্রোপচারের পর সুস্থতার প্রক্রিয়ায় থাকার সময় ২০২০ সালের ২৫ নভেম্বর বুয়েনস এইরেসের তিগ্রে এলাকার একটি ভাড়া বাড়ি থেকে ৬০ বছর বয়সী ম্যারাডোনার নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে ফুসফুসে পানি জমা এবং হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর মৃত্যুর প্রমাণ মেলে।
গত এপ্রিলে শুরু হওয়া এই বিচারিক কার্যক্রমে ৭০ জনের বেশি সাক্ষীর জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। প্রসিকিউশন সাত আসামির মধ্যে ছয়জনের জন্য ৪ থেকে ১২ বছর পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড প্রার্থনা করেছে, যার মধ্যে ব্যক্তিগত চিকিৎসক লুকের জন্য চাওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ ১২ বছরের সাজা।
মামলার মূল আইনি বিতর্কের বিষয় ছিল, অস্ত্রোপচার পরবর্তী পুনর্বাসনের সময় রোগীকে হাসপাতালে পর্যবেক্ষণে না রেখে ভাড়া বাড়িতে রাখার সিদ্ধান্তটি চিকিৎসাগত গাফিলতি ছিল কি না। রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিরা যুক্তি তুলে ধরেন যে ওই বাসভবনে প্রয়োজনীয় হাসপাতালের শয্যা, জরুরি ডিফিব্রিলেটর কিংবা তাৎক্ষণিক রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্সের মতো অত্যাবশ্যকীয় ব্যবস্থার অনুপস্থিতি চিকিৎসকদের চরম দায়িত্বহীনতারই প্রমাণ। একাধিক চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ আদালতে সাক্ষ্য দিয়ে জানিয়েছেন, মৃত্যুর পূর্বে ম্যারাডোনার শরীরে তরল জমা, তীব্র শ্বাসকষ্ট এবং হৃৎস্পন্দনের বিপজ্জনক বৃদ্ধির মতো লক্ষণগুলো স্পষ্ট হলেও পরিচর্যাকারী দল তা নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছিল।
