বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের অন্যতম লাভজনক ও জনপ্রিয় দুটি রূপসী আন্তনগর ট্রেন ‘কক্সবাজার এক্সপ্রেস’ ও ‘পর্যটক এক্সপ্রেস’। সমুদ্রসৈকতে ভ্রমণকারীদের সুবিধার্থে চালু করা এ ট্রেন দুটির অনবোর্ড সার্ভিস পরিচালনা ঘিরে এখন শুরু হয়েছে চরম অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও পক্ষপাতিত্বের নানা গুঞ্জন। নির্ধারিত যোগ্যতা ও সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত বিধিমালা (পিপিআর) উপেক্ষা করে বিশেষ সুবিধা পাইয়ে দিতে রেলওয়ের একটি প্রভাবশালী চক্র সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অনভিজ্ঞ ও ত্রুটিপূর্ণ কাগজপত্র জমা দেওয়া প্রতিষ্ঠানকে ‘রেসপন্সিভ’ করার পাশাপাশি সব শর্ত পূরণ করা বৈধ দরদাতাদের অহেতুক বাদ দেওয়া হয়েছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দরপত্রদাতারা।
রেল পূর্বাঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তার (সিসিএম) কার্যালয় থেকে জারি করা ‘Procurement of Physical Service to Provide Onboard Service on 815/816 Parjotak Express Train’ শীর্ষক দরপত্রের (সূত্র: ৫৪.০১.১৫০০.১০৭.০৫.১৪৫.২৫-PS-3) বিপরীতে মোট ২২টি সিডিউল বিক্রি হয়। এর মধ্যে ২১টি দরপত্র জমা পড়লেও কোনো যৌক্তিক বা লিখিত সুনির্দিষ্ট কারণ দর্শানো ছাড়াই প্রাথমিক মূল্যায়ন পর্বেই ৯টি প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের দাবি, মূল প্রতিযোগিতা সীমিত করে পূর্বনির্ধারিত একটি চক্রকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে এই ছাঁটাই করা হয়েছে।
দরপত্র মূল্যায়নে বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা (সিসিএম) সুজিত কুমার বিশ্বাসের ভূমিকা নিয়ে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ‘এন কে এন্টারপ্রাইজ’ ও ‘ক্লীন সার্ভিস’ নামের দুটি প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় যোগ্যতা যাচাই না করেই কারিগরিভাবে যোগ্য বা রেসপন্সিভ করা হয়েছে। অথচ টেন্ডারের স্পষ্ট শর্ত ছিল অনবোর্ড সার্ভিস চালনায় ন্যূনতম ৫ বছরের কাজের বাস্তব অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। এ ছাড়া নিয়োগকৃত দুই স্টুয়ার্ড ম্যানেজারের ২ বছরের অভিজ্ঞতা এবং ক্যাটারিং স্টুয়ার্ডদের ন্যূনতম এইচএসসি পাস সনদ থাকা বাধ্যতামূলক। তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, এন কে এন্টারপ্রাইজ ও ক্লীন সার্ভিস কর্তৃক দাখিল করা কর্মীদের বেশ কয়েকটি সনদ ত্রুটিপূর্ণ ও ভুয়া। এমনকি ৭০ লাখ টাকার তরল সম্পদ বা লিকুইড অ্যাসেটের ব্যাংক সনদ যথাযথভাবে যাচাই না করেই তাদের সবুজ সংকেত দেওয়া হয়েছে।
পর্যটক এক্সপ্রেসের মতো ‘কক্সবাজার এক্সপ্রেস’ ট্রেনটির দরপত্র প্রক্রিয়াতেও একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে ট্রেনটিতে কর্মরত ‘এস এ কর্পোরেশন’ এবং তাদের সহযোগী বা কথিত সিস্টার কনসার্ন ‘মাহি এন্টারপ্রাইজ’ কিংবা ‘স্বপ্নীল অ্যাসোসিয়েশটস’ কে অনৈতিক সুবিধা দিতে পুরো মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় অদৃশ্য প্রভাব বিস্তার করা হচ্ছে বলে দরদাতাদের অভিযোগ।
মূল্যায়ন প্রক্রিয়া থেকে বাদ পড়া ‘উদয়ন পি এন পি’ এর স্বত্বাধিকারী মো. শামীম মিয়া পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি জানান, ই-জিপি টেন্ডারের ক্ষেত্রে পিই (Procuring Entity) হিসেবে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা কীভাবে ভুয়া তথ্য ও ত্রুটিপূর্ণ ডকুমেন্ট জমা দেওয়া কোম্পানিগুলোকে রেসপনসিভ ঘোষণা করলেন, তা রহস্যজনক। তাঁর মতে, পছন্দসই ভেন্ডরকে কাজ দেওয়ার জন্যই একটি অসৎ উপায়ে এসব কোম্পানিকে প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখা হয়েছে।
উল্লেখ্য, সিসিএম সুজিত কুমার বিশ্বাসের বিরুদ্ধে দরপত্র কারচুপির ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এর আগে রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে চারটি ট্রেনের অনবোর্ড সার্ভিস দরপত্রে অনিয়ম ও অনৈতিক লেনদেনের জোরালো অভিযোগ উঠেছিল। সে সময় ব্যাপক বিতর্কের মুখে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ তৎকালীন বিজয়ী দরদাতাকে কার্যাদেশ না দিয়ে পুরো টেন্ডার প্রক্রিয়াই বাতিল ও স্থগিত করতে বাধ্য হয়।
রেলওয়ে অ্যাক্টিভিস্ট মোহাম্মদ হোসেন এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন যে বর্তমান সরকার ও রেলপথ মন্ত্রণালয় যখন রেলের যাত্রীসেবার মান উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন অভিজ্ঞতা তৈরিতে নিরলস কাজ করছে, তখন মাঠপর্যায়ের কতিপয় কর্মকর্তা ও ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের এমন স্বেচ্ছাচারী আচরণ পুরো রেলওয়ের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করছে।
অভিযোগের ব্যাপারে সুস্পষ্ট বক্তব্য জানতে বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা (সিসিএম) সুজিত কুমার বিশ্বাসের মুঠোফোনে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। এমনকি হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি। তবে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মামুনুল ইসলাম বিষয়টির গুরুত্ব স্বীকার করে জানান, সংশ্লিষ্ট সিসিএম দপ্তরকে এ বিষয়ে যাবতীয় তথ্য ও ব্যাখ্যার জন্য ইতোমধ্যে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
