মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার বিভিন্ন মাঠে সুবাসিত একাঙ্গী ফসলের চাষ হলেও এবার পচন রোগে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন চাষিরা। কসবা ও জালশুকা গ্রামসহ উপজেলার বিভিন্ন মাঠে একাঙ্গী ফসলের ক্ষেতজুড়ে এখন বিষাদের ছায়া। ক্ষতিকর পচন রোগে আক্রান্ত হয়ে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে নিঃস্ব হওয়ার পথে অর্ধশত কৃষক। উপজেলা কৃষি দপ্তরের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, অন্তত ৮ হেক্টর জমিতে এ রোগের প্রভাব পড়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে প্রায় ১০ থেকে ১৫ হেক্টর জমির একাঙ্গী ফসল পচে নষ্ট হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন স্থানীয় চাষিরা।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চলতি মৌসুমে লাভজনক ভেষজ ও মসলা জাতীয় উচ্চমূল্যের ফসল একাঙ্গী চাষে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করেছিলেন তারা। চড়া দামে বীজ কেনা, জমি তৈরি, সার ও কীটনাশক প্রয়োগসহ বিভিন্ন কাজে নিজেদের সঞ্চয় ও শ্রম ব্যয় করেন। ভালো ফলনের আশায় চাষাবাদ শুরু করলেও হঠাৎ গোড়া পচা রোগ দেখা দেওয়ায় একের পর এক ক্ষেত নষ্ট হতে থাকে। গাছের পাতা হলুদ হয়ে ঢলে পড়ছে। একই সঙ্গে মাটির নিচে থাকা মূল্যবান একাঙ্গী পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
গাংনীর কসবা গ্রামের পূর্বপাড়ার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক রবিউল ইসলাম বলেন, “অনেক আশা করে ১০ শতক জমিতে একাঙ্গী চাষ করেছিলাম। ধার-দেনা করে সার ও কীটনাশক দিয়েছি। কিন্তু হঠাৎ পচন ধরে এক সপ্তাহের মধ্যে পুরো ক্ষেত পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। কোনো ওষুধেই কাজ হচ্ছে না। এখন ঋণের টাকা কীভাবে পরিশোধ করব, আর পরিবার নিয়ে কীভাবে বাঁচব ভেবে পাচ্ছি না।”
একই ধরনের ক্ষতির কথা জানিয়েছেন কসবা গ্রামের কৃষক সাদ্দাম হোসেন ও বদরুদ্দোজা।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা যায়, একের পর এক একাঙ্গীর ক্ষেত পচে লালচে হয়ে শুকিয়ে যাচ্ছে। ফসল রক্ষায় চাষিরা বারবার বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না। অনেকে পচে যাওয়া গাছের গোড়া উপড়ে ফেলে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করছেন।
কৃষকদের অভিযোগ, রোগ ছড়িয়ে পড়ার পর প্রাথমিক পর্যায়ে কৃষি দপ্তরকে বিষয়টি জানানো হলে সেখান থেকে পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু সেই পরামর্শ কার্যকর না হওয়ায় ফসল রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। পরে বাজার থেকে নিম্নমানের কীটনাশক কিনে প্রয়োগ করায় ক্ষতির পরিমাণ আরও বেড়েছে।
ফসল হারিয়ে দিশেহারা কৃষকেরা অবিলম্বে সরকারি প্রণোদনা, সুদমুক্ত কৃষিঋণ এবং আগামী মৌসুমে বিনামূল্যে বীজ সরবরাহের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, প্রয়োজনীয় সহায়তা না পেলে এ অঞ্চলে লাভজনক এই উচ্চমূল্যের ফসলের চাষ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই দাবি জানিয়েছেন কৃষক বদরুদ্দোজা ও সাদ্দাম আলী।
কৃষি বিভাগের ধানখোলা ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা নাঈমুর রহমান জানান, চলতি বছরে একাঙ্গীর পচন রোগে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। শুরুতে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ ব্যবহারের পরও রোগটি প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়নি। অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও অতিবৃষ্টির প্রভাবকে এর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখছেন তিনি। একই ধরনের মতামত জানিয়েছেন কসবা ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা শাহিন রেজা জুয়েল ও গাড়াডোব ব্লকের গিয়াস উদ্দিন।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা আরাফাত মিয়া জানান, অনেক কৃষক বীজ বপনের আগে বীজ শোধন করেন না। আবার কেউ কেউ উপযুক্ত জমি নির্বাচন না করে নিচু জমিতেও একাঙ্গী চাষ শুরু করেন। প্রতিকূল আবহাওয়ায় ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে এবার ফসল পচে গেছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে গাংনী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, আবহাওয়ার পরিবর্তন এবং মাটিতে ছত্রাকের উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় একাঙ্গী ফসলে পচন রোগ দেখা দিয়েছে। খবর পাওয়ার পর থেকেই কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্ত জমি পরিদর্শন করছেন। পচন রোধে সঠিক মাত্রায় অনুমোদিত ছত্রাকনাশক প্রয়োগের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হচ্ছে, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনের আওতায় আনা যায়। পাশাপাশি বিষয়টি কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের রোগতত্ত্ববিদদের অবহিত করারও চেষ্টা চলছে।
এমএ
