শারদীয় দুর্গাপূজা ও সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে টানা পাঁচ দিনের সরকারি ছুটি এবং দুদিনব্যাপী বিচ কার্নিভালকে কেন্দ্র করে পটুয়াখালীর সাগরকন্যা-খ্যাত পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটায় লাখো পর্যটকের ভিড় জমে উঠেছে। ইতোমধ্যে পর্যটনকেন্দ্রটির আবাসিক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টের ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ কক্ষের অগ্রিম বুকিং হয়েছে। পর্যটকদের বরণে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন আবাসন ব্যবসায়ী, পর্যটনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠন ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
সংশ্লিষ্ট হোটেল ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, কুয়াকাটার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির আবাসিক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টের প্রায় ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ কক্ষের অগ্রিম বুকিং হয়েছে। কোনো কোনো হোটেলে ছুটির গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোয় সব কক্ষ বুকিং হয়ে গেছে। পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে হোটেলকক্ষ ভাড়ায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়ের ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
আগামী ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত দুর্গাপূজা ও সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে টানা পাঁচ দিনের ছুটি রয়েছে। এর মধ্যে ২৩ ও ২৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হবে দুদিনব্যাপী বিচ কার্নিভাল। দীর্ঘ ছুটি ও উৎসব ঘিরে কুয়াকাটায় দুই থেকে তিন লাখ পর্যটক-দর্শনার্থীর সমাগম হতে পারে বলে ধারণা করছেন বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। জেলা প্রশাসন, বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড ও বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির যৌথ আয়োজনে বিচ কার্নিভাল অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। উৎসবে স্থানীয় শিল্পীদের পাশাপাশি দেশের খ্যাতনামা শিল্পীদের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিচ ম্যারাথন, বিচ ফুটবলসহ নানা আয়োজন থাকবে।
এদিকে পর্যটকদের আগমন নির্বিঘ্ন করতে সৈকতের সৌন্দর্য রক্ষা, পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রশাসন। ইতোমধ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সদস্যসচিব মো. আরিফুজ্জামান এবং উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও কুয়াকাটা পৌর প্রশাসক মো. ইয়াসীন সাদেক স্থানীয় বিএনপি নেতাদের সঙ্গে নিয়ে সৈকত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। এছাড়া সৈকতের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সরিয়ে নিতে নির্দেশনা দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। পাশাপাশি সৈকত এলাকায় ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার কার্যক্রমও চালানো হয়েছে।
গত ১৫ অক্টোবর জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে দুর্গাপূজা ও বিচ কার্নিভাল সফল করতে সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক নেতাদের অংশগ্রহণে উৎসব আয়োজন ও পর্যটক ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন দিক নিয়ে একটি প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব কুয়াকাটার (টোয়াক) সভাপতি রুমান ইমতিয়াজ তুষার বলেন, ইতোমধ্যে কুয়াকাটার প্রায় ৮০ শতাংশ হোটেলকক্ষের বুকিং হয়ে গেছে। এখানে ছোট-বড় ৩০০টির বেশি আবাসিক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার পর্যটকের রাতযাপনের ব্যবস্থা রয়েছে। বাড়তি পর্যটকের চাপ সামাল দিতে আশপাশের পাঁচটি গ্রামের প্রায় ৬০০ বাসাবাড়ি হোমস্টে হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
আবাসিক হোটেল সরোয়ার প্যারাডাইসের ব্যবস্থাপক রিপন সাব্বির জানান, দুর্গাপূজা, সাপ্তাহিক ছুটি ও বিচ কার্নিভাল ঘিরে পর্যটকদের ব্যাপক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। ইতোমধ্যে তাদের হোটেলের প্রায় ৮০ শতাংশ কক্ষ অগ্রিম বুকিং হয়েছে। এখনো অনেকে ফোন করে কক্ষ চাইছেন, কিন্তু সবাইকে কক্ষ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
কুয়াকাটা সিকদার রিসোর্ট অ্যান্ড ভিলাসের সহকারী ব্যবস্থাপক আল আমিন খান উজ্জ্বল জানান, তাদের কটেজ ও ভিলার প্রায় ৭০ শতাংশ কক্ষের অগ্রিম বুকিং হয়েছে। দু-এক দিনের মধ্যে শতভাগ বুকিং সম্পন্ন হবে বলে তিনি আশা করছেন।
কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এমএ মোতালেব শরীফ বলেন, বছরের যেসব সময়ে কুয়াকাটায় সবচেয়ে বেশি পর্যটক আসেন, দুর্গাপূজার সময় তার অন্যতম। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টের প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ কক্ষের অগ্রিম বুকিং হয়েছে। তবে তৃতীয় শ্রেণির হোটেলগুলোর অধিকাংশ কক্ষ এখনো ফাঁকা রয়েছে। তিনি আশা করছেন, দুর্গাপূজা ও কার্নিভাল ঘিরে কুয়াকাটায় লক্ষাধিক পর্যটক-দর্শনার্থীর আগমন ঘটবে।
কুয়াকাটা ট্যুর গাইড অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কেএম বাচ্চু বলেন, দীর্ঘ ছুটিতে পর্যটকদের স্বাগত জানাতে হোটেল, মোটেল, রেস্টুরেন্টসহ পর্যটননির্ভর প্রায় ১৬টি পেশার ক্ষেত্রে পাঁচ থেকে সাত হাজারের বেশি শ্রমিক প্রস্তুত রয়েছেন। এছাড়া শতাধিক প্রশিক্ষিত ট্যুর গাইডের পাশাপাশি অন্যান্য খাতের আরো দুই শতাধিক কর্মীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
কুয়াকাটা পৌর প্রশাসক ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইয়াসীন সাদেক বলেন, পাঁচ দিনের সরকারি ছুটি ও বিচ কার্নিভালকে কেন্দ্র করে কুয়াকাটাকে নতুন রূপে সাজানো হচ্ছে। থানা পুলিশ, ট্যুরিস্ট পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে পর্যটকদের নিরাপত্তা জোরদারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
ট্যুরিস্ট পুলিশের কুয়াকাটা জোনের ইনচার্জ নাজমুল আহসান জানান, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইতোমধ্যে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। ট্যুরিস্ট পুলিশ, জেলা পুলিশ ও বন বিভাগের পাশাপাশি সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হবে। আগত পর্যটকেরা যাতে নিরাপদে ভ্রমণ করতে পারেন, সেজন্য নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
