রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার পর্যটন কেন্দ্র সাজেকে অবরোধ, সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনায় উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। এতে অচল হয়ে পড়েছে স্থানীয়দের স্বাভাবিক জনজীবন।
একদিকে সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা বন্ধ ও নিরাপত্তার দাবিতে স্থানীয় দুই সংগঠনের অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ; অন্যদিকে অবরোধ চলাকালে হামলার অভিযোগ এবং তার প্রতিবাদে কঠোর কর্মসূচি- সব মিলিয়ে অস্থির পরিস্থিতি বিরাজ করছে সেখানে, যা ছড়িয়ে পড়ছে পাহাড়জুড়ে। বন্ধ রয়েছে সাজেক পর্যটন কেন্দ্র। দোকানপাট ও যান চলাচল ব্যাহত হওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটন ব্যবসায়ীরা। ধস নেমেছে স্থানীয়দের অর্থনীতিতে।
এ পরিস্থিতিতে সংকট নিরসনে সংলাপের উদ্যোগ নিয়েছে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন। এ লক্ষ্যে রোববার (২৫ অক্টোবর) জেলার হেডম্যান ও কারবারিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করে প্রশাসন। সভায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনা করতে তিন সদস্যের একটি সংলাপ কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সকাল ১০টায় জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও খাগড়াছড়ির সংসদ-সদস্য আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন রাঙামাটির সংসদ-সদস্য ও সাবেক পার্বত্যমন্ত্রী দীপেন দেওয়ান। এছাড়া পুলিশ সুপার মুহম্মদ আবদুর রকিবসহ জেলার হেডম্যান, কারবারি, সামরিক, বেসামরিক ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা এতে উপস্থিত ছিলেন।
সভায় রাঙামাটির সাজেকে চলমান আন্দোলন ও উদ্ভূত পরিস্থিতি নিরসনের লক্ষ্যে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংলাপের জন্য সিএইচটি হেডম্যান নেটওয়ার্কের সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট ভবতোষ দেওয়ান, সাধারণ সম্পাদক শান্তি বিজয় চাকমা এবং সিএইচটি হেডম্যান অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক জ্যোতির্ময় চাকমা কেরোলকে নিয়ে সংলাপ কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে দ্রুত আলোচনা শুরুর সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে।
সভা শেষে আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া সাংবাদিকদের জানান, সাজেকের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ লক্ষ্যে তিন সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে। এ কমিটি দ্রুত সময়ের মধ্যে আন্দোলন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আলোচনার প্রস্তাব দেবে। এছাড়াও বাঘাইছড়ির উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমেনা মারজান ও খাগড়াছড়ির হেডম্যান-কারবারিদের প্রতিনিধি এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকবেন। আন্দোলনকারীদের মতামতের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, সাজেকের চলমান আন্দোলনের সঙ্গে কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের নাম আসায় হেডম্যান ও কারবারিদের নিয়ে এ উদ্যোগ। আন্দোলনের শুরু থেকেই সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনায় বসার চেষ্টা করা হচ্ছে। আন্দোলনের প্রথম দিন থেকেই গণমাধ্যমের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের আলোচনায় বসার আহ্বান জানানো হয়েছিল। তবে তখন আলোচনা শুরু করা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে আন্দোলনকারীদের একটি বিবৃতির মাধ্যমে আলোচনায় বসার আগ্রহের বিষয়টি সামনে আসে। এতে সংলাপের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিরসনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কমিটির অন্যতম সদস্য অ্যাডভোকেট ভবতোষ দেওয়ান বলেন, আমরা দ্রুত সময়ে আলোচনার ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছি। আশা করছি, দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে চলমান সংকটের সমাধান হবে। এর মধ্য দিয়ে সাজেকে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে আসবে এবং পর্যটকদের জন্য দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রটি আবারও উন্মুক্ত করা সম্ভব হবে বলে প্রত্যাশা।
এদিকে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের অভিযোগ, সাজেকের বিভিন্ন এলাকায় জনসংহতি সমিতির সন্তু লারমা-সমর্থিত সশস্ত্র সদস্যদের তৎপরতায় স্থানীয় বাসিন্দারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। নিরীহ মানুষকে নানা ধরনের হুমকি বন্ধ, বাড়িঘরে তল্লাশির নামে হয়রানি বন্ধ এবং অভিযুক্ত সশস্ত্র সদস্যদের এলাকা থেকে সরিয়ে দেওয়ার দাবিতে তারা অবরোধ চালিয়ে যাচ্ছে। তবে জনসংহতি সমিতি সাজেকে তাদের সশস্ত্র গোষ্ঠী থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
গত ২২ অক্টোবর উজোবাজার এলাকায় অবরোধকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষ ও পরে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় কয়েকজন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ আন্দোলনকারীদের মধ্যে ৭০ জন আহত হওয়ার দাবি করা হয়। পরিস্থিতির মধ্যে আটকে পড়া প্রায় তিন হাজার পর্যটককে নিরাপত্তা বাহিনীর সহায়তায় খাগড়াছড়িতে সরিয়ে নেওয়া হয়। এ ঘটনায় বর্বরোচিত হামলার প্রতিবাদে ২৪ অক্টোবর রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে আধাবেলা সড়ক ও নৌপথ অবরোধের কর্মসূচি পালন করে ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ।
পর্যটন ব্যবসাসংশ্লিষ্টরা জানান, সাজেকে অবরোধ ও পর্যটন কেন্দ্র বন্ধের কারণে পর্যটন ব্যবসায়ও বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। রিসোর্ট-কটেজের বুকিং বাতিল করতে হয়েছে। ক্ষতির মুখে পড়ছেন পর্যটননির্ভর ব্যবসায়ীরা। এখন প্রশাসনের সংলাপ উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়, তার ওপর নির্ভর করছে পরিস্থিতির উত্তরণ। স্থানীয়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সব পক্ষের সঙ্গে কার্যকর আলোচনার মাধ্যমে সংকটের স্থায়ী সমাধান জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
এ ব্যাপারে সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নতুন জয় চাকমা বলেন, সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগের বিষয়ে কিছুটা শুনেছি। তারা ইতোমধ্যে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আলোচনা করবেন বলে জানিয়েছেন। আমরা সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য সমাধান আশা করি। আমরা বারবার প্রশাসনের কাছে আমাদের দাবি জানিয়ে আসছি; কিন্তু এর মধ্যে স্থানীয় প্রশাসন আশ্বাস দিলেও তারা তা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে। আমাদের দাবি এখন পাঁচ দফা। এসব দাবি পূরণে ইতিবাচক সাড়া দেওয়া হলে কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যাবে।
সাজেকবাসীর ৫ দফা দাবির প্রতি পাঁচ সংগঠনের সমর্থন:
রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকে চলমান সড়ক অবরোধে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। পর্যটন, পরিবহণ, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ স্থানীয় বিভিন্ন খাত অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে সাজেক থেকে জেএসএস (সন্তু লারমা) গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে দেওয়া ও আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারসহ পাঁচ দফা দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাঁচটি সংগঠন।
রোববার (২৫ অক্টোবর) গণমাধ্যমে পাঠানো এক যৌথ বিবৃতিতে গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের সভাপতি জিকো ত্রিপুরা, পার্বত্য চট্টগ্রাম নারী সংঘের সভাপতি কনিকা দেওয়ান, ইউনাইটেড ওয়ার্কার্স ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের সহ-সাধারণ সম্পাদক প্রমোদ জ্যোতি চাকমা, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সভাপতি নীতি চাকমা ও বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের সভাপতি সমর চাকমা এ সমর্থনের বিষয়টি ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে অবিলম্বে দাবিগুলো মেনে নিতে সরকার ও প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান তারা।
বিবৃতিতে নেতারা অভিযোগ করেন, গত ২২ অক্টোবর সাজেকের উজো বাজারে শান্তিপূর্ণ অবরোধ চলাকালে সেনাবাহিনী ও পুলিশ হামলা চালায়। এতে ৭০ জনের বেশি নারী-পুরুষ ও বয়স্ক ব্যক্তি আহত হন। এ সময় ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও সাজেক কলেজে ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগও করেন তারা। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়নি।
পর্যটকদের ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনায় আইএসপিআর ও রাঙামাটি জেলা পুলিশের বক্তব্যকে মিথ্যা দাবি করে এর প্রতিবাদ জানান পাঁচ সংগঠনের নেতারা। এছাড়া আন্দোলনের সমর্থনে বক্তব্য দেওয়ার কারণে এসএসসি পরীক্ষার্থী ঝরণা চাকমাকে গ্রেফতারের চেষ্টার অভিযোগেও নিন্দা জানান তারা।
বিবৃতিতে বলা হয়, শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশ, অবরোধ ও মতপ্রকাশ নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার। আলোচনার মাধ্যমে দাবি পূরণ না করে বলপ্রয়োগ করা হলে পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হতে পারে। এতে পর্যটনসহ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সাজেকবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়া এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারসহ পাঁচ দফা দাবি মেনে নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন নেতারা।