বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার সান্তাহারে পরিবেশগত ছাড়পত্র নবায়ন না করা, শর্ত ভঙ্গ এবং তরল বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি) ছাড়াই অটোমেটিক চালকল পরিচালনার অভিযোগে ১৩টি চালকলকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এসব প্রতিষ্ঠানের অপরিশোধিত বর্জ্যপানি খাল-বিল ও ফসলি জমিতে ফেলার অভিযোগও রয়েছে।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর সরেজমিন তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সাত দিনের মধ্যে জবাব দিতে নির্দেশ দিয়েছেন বগুড়া পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মাহথীর বিন মোহাম্মদ। শোকজের আওতায় থাকা চালকলগুলোর মধ্যে বুশরা, সালমান, বৈশাখী, সুন্দরী, মৌ, ইছামতী ও রহমানসহ মোট ১৩টি অটোমেটিক চালকল রয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সন্তোষজনক জবাব দিতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে প্রচলিত পরিবেশ আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এদিকে, গত ১৪ অক্টোবর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় থেকে চালকলমালিকদের পাক্ষিক ছাঁটাই ক্ষমতা অনুযায়ী ধান-চালের মজুদ এবং পরিবেশ, ফায়ার, বয়লার ও বিএসটিআই লাইসেন্স হালনাগাদ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সংবাদ প্রকাশের পর তদন্ত, এর আগে গত ৩০ সেপ্টেম্বর ও ১ অক্টোবর ‘আদমদীঘিতে বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি) ছাড়াই চলছে চালকল, দূষিত হচ্ছে খাল-ফসলি জমি’ শিরোনামে বিভিন্ন জাতীয়, আঞ্চলিক ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্তের উদ্যোগ নেয়। গত ৪ অক্টোবর সরেজমিন পরিদর্শনের পর ৭ অক্টোবর উপজেলার ১৩টি চালকলকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।
তবে শুধু নোটিশ জারি করেই যেন কার্যক্রম সীমাবদ্ধ না থাকে, সে জন্য নিয়মিত তদারকি এবং পরিবেশদূষণ রোধে আইন অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন এলাকাবাসী। জনস্বার্থে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার দাবিতে গত ৭ অক্টোবর বগুড়া জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন তাঁরা। তবে অভিযোগ দেওয়ার পরও এ বিষয়ে দৃশ্যমান কার্যক্রম শুরু হয়নি বলে অভিযোগ তাঁদের।
খাল ও ফসলি জমিতে বর্জ্যপানি, স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আদমদীঘি উপজেলার অধিকাংশ মানুষ কৃষি ও মাছচাষের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বিভিন্ন কলকারখানার ধোঁয়া ও অপরিশোধিত তরল বর্জ্যের কারণে কৃষি ও জলজ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সান্তাহার এলাকায় কয়েকটি অটোরাইস মিলের বর্জ্য সরাসরি খাল ও ফসলি জমিতে গিয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, বুশরা, সুন্দরী, ইছামতী, মৌ, রহমান, সালমান ও বৈশাখীসহ কয়েকটি অটোরাইস মিলের ধান সিদ্ধ ও ধোয়ার কাজে ব্যবহৃত পানি অপরিশোধিত অবস্থায় খাল, জলাশয় ও ফসলি জমিতে ফেলা হচ্ছে। পরিবেশগত বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও এসব বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় যথাযথ নিয়ম মানা হচ্ছে না বলে দাবি স্থানীয়দের।
সরেজমিনে দেখা যায়, বুশরা অটো রাইস মিলের বর্জ্যপানি রেলের জায়গা দিয়ে ফসলি জমির পাশ ঘেঁষে ইরামতি খালে পড়ছে। অন্যদিকে সালমান ও বৈশাখীসহ কয়েকটি অটোরাইস মিলের বর্জ্যপানি ড্রেনের মাধ্যমে ফসলি জমি পেরিয়ে খাড়িতে যাচ্ছে। অন্যান্য কয়েকটি চালকলের বিরুদ্ধেও একইভাবে বর্জ্যপানি নিষ্কাশনের অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এভাবে বর্জ্যপানি নিষ্কাশনের ফলে খাল ও জলাশয়ের পানি দূষিত হচ্ছে এবং আবাদি জমি ও জলজ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাঁদের দাবি, ইটিপি স্থাপন ও কার্যকরভাবে পরিচালনা বাধ্যতামূলক হলেও সংশ্লিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানে দৃশ্যমান পরিশোধনব্যবস্থা নেই।
পানির নমুনা পরীক্ষায় উদ্বেগজনক তথ্য, সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, মিলের বর্জ্যপানি ও খালের পানির নমুনা সংগ্রহ করে সান্তাহার মৎস্য গবেষণাগারে পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষার তথ্যে পানির দ্রবীভূত অক্সিজেন (ডিও), পিএইচ, অ্যামোনিয়া ও অ্যালকালিনিটির মাত্রায় অস্বাভাবিকতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দ্রবীভূত অক্সিজেনের স্বাভাবিক মাত্রা প্রতি লিটারে ৩ থেকে ৬ মিলিগ্রাম উল্লেখ করা হলেও মিলের পানিতে পাওয়া গেছে ১ দশমিক ৪ মিলিগ্রাম এবং খালের পানিতে ১ দশমিক ২ মিলিগ্রাম। পানির পিএইচের স্বাভাবিক মাত্রা ৭ দশমিক ৫ থেকে ৮ দশমিক ৫ বলা হলেও পরীক্ষায় মিলের পানিতে ৭ দশমিক ৩ এবং খালের পানিতে ৬ দশমিক ৮ পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া অ্যামোনিয়ার স্বাভাবিক মাত্রা প্রতি লিটারে ০ দশমিক ০৫ থেকে ০ দশমিক ৫ মিলিগ্রাম উল্লেখ করা হয়েছে। পরীক্ষার তথ্যে মিলের পানিতে অ্যামোনিয়ার পরিমাণ ১০ মিলিগ্রামের বেশি এবং খালের পানিতে ১২ মিলিগ্রামের বেশি পাওয়া গেছে বলে জানানো হয়।
অ্যালকালিনিটির স্বাভাবিক মাত্রা ২০ থেকে ৫০ মিলিগ্রাম উল্লেখ করা হলেও মিলের পানিতে পাওয়া গেছে মাত্র ০ দশমিক ৩ মিলিগ্রাম এবং খালের পানিতে শূন্য। এসব পরীক্ষার ফল পানির গুণগত মান নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। লাইসেন্স হালনাগাদের নির্দেশ, আদমদীঘি উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আবুল বাসার জানান, মিলারদের পাক্ষিক ছাঁটাই ক্ষমতা অনুযায়ী ধান-চালের মজুদ এবং পরিবেশ, ফায়ার, বয়লার ও বিএসটিআই লাইসেন্স হালনাগাদ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা অনুসরণ না করলে বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর সতর্কতা অবলম্বন করা হবে।
এ বিষয়ে বগুড়া পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মাহথীর বিন মোহাম্মদ জানান, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় ১৩টি চালকলকে শোকজ করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সন্তোষজনক জবাব দিতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে প্রচলিত পরিবেশ আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, পরিবেশদূষণ বন্ধে নিয়মিত তদারকি, ইটিপির কার্যকারিতা যাচাই এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় কৃষিনির্ভর জনপদের মাটি, পানি ও জলজ পরিবেশের ক্ষতি আরও বাড়তে পারে।
The post আদমদীঘিতে ইটিপি ছাড়াই চালকল পরিচালনা, ১৩ প্রতিষ্ঠানকে শোকজ appeared first on ভোরের চেতনা.
