রাজধানী শহরের সবচেয়ে বড় বস্তির নাম করাইল বস্তি। সরকারি জমিতে (টিঅ্যান্ডটি/বিটিসিএল) প্রায় ১৬০ একর (বা প্রায় ৯০ একর বিভিন্ন জরিপ অনুযায়ী) জায়গা জুড়ে এটি বিস্তৃত। এখানে ৩ লাখের বেশি মানুষ এবং প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার পরিবার বসবাস করে তাদেরকে বাসকারী না বলে বলা যেতে পারে কোন রকমে মাথা গুজে থাকেন। তবে তাদের গুণতে হয় বড় অঙ্কেও টাকা।
সেটি পানি বিদ্যুত গ্যাস এমনকি বের হবার সবকটুখানি স্বাধীনতার জন্য গুণতে হয় ট্যাক্স। সেই নিয়মে তারা ঘুরে বেড়ানোর সময় ও স্বাধীনতা লাভ করেন এবং তারাই মূলত জমিদার হিসেবেই পরিচিত। যদিও তাদের এই বস্তির কোন মালিকানার কাগজপত্র বা দলিল নেই তবে তারা দখলসূত্রে একই সঙ্গে নিজস্ব বাহিনী গড়ে তোলার জন্য একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রনের মালিকানা পেয়েছেন। এই বস্তির কোন মালিকানা নেই।
তবে মাথার উপর ছায়া হয়ে রয়েছে প্রভাবশালী চক্র। এদিকে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে রয়েছে তাদেও নিজস্ব পোষাগুণ্ডা বাহিনী। তাদের কাজ হচ্ছে বিভিন্ন মাধ্যমে বস্তিবাসীকে জিম্মি করে টাকা আদায় করা। চোরই বিদ্যুত গ্যাস লাইন ও পানি ব্যবহার করে সেটি থেকে তারা নিজেদের মত করে বস্তিবাসীর কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায় করে থাকেন। ইউনিট প্রতি তাদের আদায়কৃত টাকা সরকারি হিসেবের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি তারপরেও তারা এজন্য সরকারকে কোন রাজস্ব দেন না। যেমনটি বলছিলেন কড়াইল বস্তির বাসিন্দা এক গৃহকর্মী । নাম না প্রকাশের শর্তে তিনি জানান, তিনি এক কক্ষের ঘরে একটি বাতি ও একটি পাখা ব্যবহার করতে মাসে ৬০০ টাকা দেন। অথচ সরকারি বিদ্যুতের শুল্কহার অনুযায়ী, তার আনুমানিক বিদ্যুৎ ব্যবহারের খরচ ৪৫০ টাকারও কম হওয়ার কথা।
এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। সরাসরি সংযোগ না থাকায় ঢাকার বস্তিগুলোর হাজারো নিম্ন আয়ের পরিবার বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির জন্য অননুমোদিত সেবা সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভরশীল। এসব সরবরাহকারী সরকারি নির্ধারিত দরের চেয়ে অনেক বেশি টাকা আদায় করেন।
বস্তিবাসীর অভিযোগ, স্থানীয় ব্যক্তি ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী লোকজনের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট এসব ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে। সরকার আসে, সরকার যায়, কিন্তু আমাদের দুর্ভোগের শেষ হয় না বলেন, কল্যাণপুর পোড়া বস্তির বাসিন্দা মো. জনি।
স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ সালমা এ শফি বলেন, নিম্ন আয়ের মানুষের এসব বসতি নিয়ে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা নেই। এসব মানুষের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। তিনি বলেন, বস্তির জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাসিন্দারা বাড়তি খরচে মৌলিক চাহিদা মেটাতে অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থার আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কর্তৃপক্ষের নজরদারি কম থাকায় এসব অবৈধ ব্যবস্থা স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়।
সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বৃহত্তম বস্তি কড়াইলে প্রায় ১৭ হাজার পরিবার বসবাস করে। ভাসানটেক বস্তিতে পরিবারের সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার, আর কল্যাণপুর পোড়া বস্তিতে তিন হাজারের বেশি পরিবার থাকে। প্রতিটি পরিবারে গড়ে পাঁচজন সদস্য। তিনটি বস্তিই ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) আওতাধীন এলাকায় অবস্থিত।
মে থেকে জুলাইয়ের মধ্যে এই প্রতিবেদক তিনটি বস্তির ৫০ জনের বেশি বাসিন্দা, অবৈধ ইউটিলিটি নেটওয়ার্কের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানির (ডেসকো) এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, একটি বস্তিতে একটি প্রধান বিদ্যুৎ মিটারের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ২০টি পরিবারকে বিদ্যুৎ দেওয়া হতে পারে। এ ক্ষেত্রে আবাসিক গ্রাহকদের জন্য নির্ধারিত হারেই বিল করা হয়।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সাবেক সদস্য মিজানুর রহমান বলেন, ক্ষমতাসীন দলের পরিচয় দেওয়া কিছু লোক বাণিজ্যিক লাভের জন্য বস্তিতে এসব ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। অন্যদিকে, বৈধ ব্যক্তিগত সংযোগ না থাকায় অনেক বাসিন্দা সহজে বিদ্যুৎ পাওয়ার জন্য তাদের ওপর নির্ভর করেন।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম শফিকুজ্জামান বলেন, সরকার পরিবর্তন হলেও ব্যবস্থা আগের মতোই চলছে। বস্তিবাসীরা সরকারি সরবরাহ লাইন থেকে বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস ব্যবহার করেন, কিন্তু এসব সেবা পেতে সিন্ডিকেটকে টাকা দিতে হয়।
সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে কড়াইল বস্তি: জুন থেকে কার্যকর ডেসকোর সর্বশেষ বিদ্যুতের শুল্কহার অনুযায়ী, আবাসিক গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ব্যবহারভেদে ৫ টাকা ৩২ পয়সা থেকে ১৭ টাকা ৩৫ পয়সা। মিজানুর রহমানের হিসাব অনুযায়ী, ৬৫ ওয়াটের একটি পাখা দিনে ২২ ঘণ্টা এবং ৪০ ওয়াটের একটি বাতি দিনে আট ঘণ্টা ব্যবহার করলে মাসে প্রায় ৫২ দশমিক ৫ ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ হয়। এই হিসাব অনুযায়ী, জান্নাতের মাসিক বিদ্যুৎ বিল ৪৫০ টাকার কম হওয়ার কথা। জান্নাত বলেন, আমার ঘরভাড়া পাঁচ হাজার টাকা। পানির জন্য মাসে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা এবং একটি চুলার গ্যাস সংযোগের জন্য ৫০০ টাকা দিতে হয়।
কড়াইল বস্তির আরও কয়েকজন বাসিন্দা জানান, এর একটি জামালের নামে নিবন্ধিত। ওই মিটারের মাধ্যমে তিনি ১৭৯টি পরিবারকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করেন। বাসিন্দাদের আরও অভিযোগ, অতীতে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও জামাল এখন বিএনপির অনুসারীদের একটি গোষ্ঠীর সঙ্গে সমঝোতা করে অবৈধ ইউটিলিটি ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। যোগাযোগ করা হলে জামাল বলেন, তার ১৩৯ জন গ্রাহকের সাবমিটার রয়েছে। বাকি ৪০ জনকে সরাসরি লাইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ দেওয়া হয়।সাবমিটার ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে তিনি প্রতি ইউনিটে ১৩ টাকা এবং অন্যদের কাছ থেকে প্রতিটি বৈদ্যুতিক যন্ত্রের জন্য ২৫০ টাকা নেন।
সরকার বদলালে পুরাতনদের জার্সি বদল: ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে কড়াইলের কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করতেন দলটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিয়ন্ত্রণ চলে যায় বিএনপির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হাতে। তারা জানান, বিএনপির বনানী থানা মহিলা দলের যুগ্ম আহ্বায়ক আসমা বেগম তার ছেলে মো. কাইয়ুম সরকারের নামে ইস্যু করা বিলের মাধ্যমে প্রায় ২০০ পরিবারে বিদ্যুৎ সরবরাহ তদারক করেন। যোগাযোগ করা হলে আসমা বলেন, আগে ডেসকো একাধিক পরিবারকে একটি মিটারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করত। পরে তার স্বামীর নামে একটি প্রধান মিটার নেওয়া হয়, যাতে সুবিধাভোগী পরিবারগুলোকে সাবমিটার দেওয়া যায়।
অবৈধ গ্যাস সংযোগ : কড়াইল বস্তির বাসিন্দাদের অভিযোগ, জামালের নেতৃত্বে একটি গোষ্ঠী অবৈধ গ্যাস সংযোগ দেয়। এ কাজে সহায়তা করেন বনানী থানার ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপির সদস্য পরিচয় দেওয়া মো. শাহাবুদ্দিন। এক চুলার গ্যাস সংযোগের জন্য বাসিন্দাদের মাসে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা এবং দুই চুলার জন্য এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকা দিতে হয়। এ বিষয়ে জামাল বলেন, গ্যাসের বিল থেকে আদায় করা সব টাকা আমি শাহাবুদ্দিনকে দিই। লাইন সে নিয়ন্ত্রণ করে। টাকা সংগ্রহ করতে সে প্রতি মাসে আসে। তিনি আরও বলেন, বস্তিতে প্রায় ৫০টি পরিবারকে তিনি গ্যাস সংযোগ দিয়েছেন।
অবৈধ পানির পাইপলাইন : ঢাকা ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী, ব্র্যাক, দুঃস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্র (ডিএসকে) ও অন্যান্য এনজিও’র সহায়তায় কড়াইল বস্তিতে প্রায় দেড় হাজার মিটারযুক্ত পানির সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে। বাসিন্দারা জানান, স্থানীয় কয়েকটি গোষ্ঠী অনুমোদিত পানির সংযোগ থেকে অবৈধভাবে লাইন নিয়ে বিভিন্ন পরিবারের ঘরে পানি সরবরাহ করে এবং এ জন্য টাকা আদায় করে।জামাল বলেন, কড়াইলে তিনি ৪০টি পরিবারকে মাসে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকার বিনিময়ে পানি সরবরাহ করেন। পোশাকশ্রমিক কাঞ্চনা বেগম বলেন, ‘আমরা যত কম পানিই ব্যবহার করি না কেন, তিন সদস্যের পরিবারের জন্য মাসে ৩০০ টাকা দিতে হয়।
যা বলছেন কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা : ডেসকোর পরিচালনা বিভাগের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাশেদুর রহমান বলেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সব পরিবারের জন্য মিটার স্থাপনের কাজ চলছে। প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ হলেও এর বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপক শাহ নেওয়াজ চৌধুরী বলেন, তিতাসের কর্মীরা অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পর স্থানীয় সিন্ডিকেটগুলো বারবার সেগুলো পুনঃসংযোগ দেয়। তিতাসের কিছু কর্মকর্তা অবৈধ ব্যবসায় জড়িত থাকতে পারেন বলেও স্বীকার করেন তিনি।
বিআলো/অর্নব