জরুরি তেলের মজুদ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়া এবং উচ্চ ঋণের চাপে বিশ্ব অর্থনীতি দ্রুতই তার সহনশীলতার শেষ প্রান্তে পৌঁছে যেতে পারে বলে কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটির ষাণ¥াসিক ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাতের তীব্রতা সত্ত্বেও গত ছয় মাসে বিশ্ব অর্থনীতি ধারণার চেয়েও ভালো স্থায়িত্ব দেখিয়েছে। কৌশলগত জ্বালানি মজুদ উন্মুক্ত করা এবং হরমুজ প্রণালির বিকল্প পথে তেল সরবরাহ নিশ্চিত করার কারণে বিশ্ববাজারে তেল ও জ্বালানির দাম তাৎক্ষণিকভাবে লাগামহীন হতে পারেনি।
তবে আইএমএফ হুশিয়ারি দিয়েছে, এসব জরুরি তেলের মজুদ এখন প্রায় নিঃশেষ হয়ে এসেছে।
একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে আকাশচুম্বী সরকারি ঋণ ও বাজেট ঘাটতির কারণে যে কোনো নতুন অর্থনৈতিক বা ভূরাজনৈতিক আঘাত সামাল দেওয়া কিংবা ভোক্তাদের সুরক্ষা দেওয়া সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।
আইএমএফের শীর্ষ অর্থনীতিবিদ সিলভানা টেনরেইরো ব্যাংককে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, বিশ্ব অর্থনীতি এতদিন সংকট কাটিয়ে টিকে থাকলেও এখন সেই সক্ষমতা সীমার কাছাকাছি চলে এসেছে। ফলে কেবল পরিস্থিতি সামাল না দিয়ে বিশ্বনেতাদের এখন টেকসই পুনর্গঠনের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। একই বার্তা দিয়ে আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভাও দেশগুলোকে অহেতুক ব্যয় সংকুচিত করে কঠোর নীতি গ্রহণের তাগিদ দিয়েছেন।
প্রতিবেদনে চলতি বছরের বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সামান্য বাড়িয়ে ৩.১ শতাংশ করা হয়েছে, তবে পরবর্তী বছরের প্রবৃদ্ধি ৩.৪ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধি ২৩ শতাংশে স্থিতিশীল থাকলেও যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় দেশগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ সুদের হার ও আকাশচুম্বী জ্বালানি খরচের কারণে বিনিয়োগ ও ব্যবহার কমে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ ছাড়া আমেরিকার কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ ১৯৮২ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে পড়েছে। জ্বালানির মূল্য কমাতে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভøাদিমির পুতিনের মধ্যে রাশিয়ান ডিজেল আমদানির ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা তোলার সমঝোতা হলেও তা বাজারে খুব একটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগজনক বার্তা দিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার সংঘাতের জেরে ২০২৬ সালে এই অঞ্চলের অর্থনীতি ০.৩ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে যা গত এপ্রিলে প্রাক্কলিত ১.৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস থেকে এক বড় ধস। বিশেষ করে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় কুয়েত (১৬.৭%), ইরাক (১৬%) এবং কাতারের (১৫.৬%) প্রবৃদ্ধিতে দ্বি-অঙ্কের বড় পতন ঘটার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ইরানের অর্থনীতি ৭.৬ শতাংশ এবং সৌদি আরবের অর্থনীতি ৩.৩ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতির জন্য প্রধান ঝুঁঁকি হিসেবে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের দীর্ঘসূত্রতা বা নতুন করে উত্তেজনার বৃদ্ধিকে চিহ্নিত করেছে আইএমএফ। এর ফলে খাদ্য ও জ্বালানির দামে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা মূল্যস্ফীতিকে আরও দীর্ঘায়িত করবে। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরে বিশ্বজুড়ে গড় মূল্যস্ফীতি ৪.৭ শতাংশে গিয়ে দাঁড়াবে। জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি সাইবার হামলা, বিরূপ আবহাওয়া এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে শেয়ারের অতিমূল্যায়নজনিত পতন বা ‘শেয়ারবাজার ধস’-এর মতো উদীয়মান ঝুঁকিগুলো নিয়ে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে সতর্ক ও প্রস্তুত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
