দাতা সংস্থার ঋণনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসার কথা বলছে সরকার। অথচ বাজেটের ঘাটতি মেটানো, জ্বালানি ভর্তুকি ও অর্থনৈতিক চাপ সামাল দিতে আবারও নতুন বিদেশি ঋণের আলোচনা চলছে। আইএমএফের কাছে সম্ভাব্য নতুন ঋণ কর্মসূচি, বিশ্বব্যাংকের কাছে অতিরিক্ত অর্থায়নের প্রস্তাব—সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে, ঋণনির্ভরতা কমানোর পথ আসলে কোথায়? অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, ঋণের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অর্থ ব্যয়ের হিসাব। তাঁরা বলছেন, রাজস্ব আদায় বাড়ানো, ব্যয়ের দক্ষতা নিশ্চিত করা ও ঋণের অর্থ উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহারের বিকল্প নেই।
উন্নয়ন ব্যয়, ভর্তুকি ও বাজেটের ঘাটতি মেটাতে বাড়ছে অর্থের চাহিদা। রাজস্ব আয় দিয়ে ব্যয়ের পুরোটা মেটানো যাচ্ছে না। ফলে দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে সরকারকে।
আইএমএফের কাছে নতুন ঋণ কর্মসূচির বিষয়ে সাড়ে চার থেকে পাঁচশ কোটি ডলারের ঋণ নিয়ে আলোচনা চলছে। অন্যদিকে, আগামী তিন বছরে নিয়মিত সহায়তার বাইরে বিশ্বব্যাংকের কাছে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন চেয়েছে বাংলাদেশ। এ নিয়ে থাইল্যান্ডে চলমান আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভায় দফায় দফায় বৈঠক চলছে।
প্রশ্ন উঠছে, ঋণ নিয়ে সাময়িক অর্থসংকট সামাল দেওয়া গেলেও দীর্ঘ মেয়াদে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বাড়ছে কতটা? গত অর্থবছরে বিদেশি ঋণের বিপরীতে বাংলাদেশের পরিশোধের চাপও বেড়েছে। রাজস্ব আদায় দুর্বল থাকলে নতুন ঋণের অর্থ দিয়ে পুরোনো দায় ও চলতি ব্যয় সামলানোর চাপ বাড়তে পারে।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, দেশের রাজস্ব আদায় জিডিপির মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশ। দুর্বল রাজস্ব আহরণ সরকারের উন্নয়ন ব্যয় ও সামাজিক সুরক্ষার উদ্যোগ বাস্তবায়নের সক্ষমতাও সীমিত করছে। অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. ওয়ারেসুল করিম বলছেন, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা ও বিনিয়োগে স্থবিরতা অর্থনীতির চাপ বাড়াচ্ছে।
গবেষণা সংস্থা পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের মতে, ঋণ নেওয়া নিজেই সংকট নয়। সংকট তৈরি হয় যখন ঋণের অর্থ থেকে প্রত্যাশিত আয়, কর্মসংস্থান কিংবা উৎপাদনশীলতা বাড়ে না। তাই প্রকল্প বাছাইয়ে কঠোর যাচাই, ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো এবং রাজস্ব ফাঁকি বন্ধ করতে হবে।
ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের মতে, বিদেশি ঋণ কমানোর টেকসই পথ শুধু নতুন ঋণ এড়িয়ে চলা নয়; বরং নিজস্ব রাজস্ব বাড়ানো, অপচয় কমানো এবং ঋণের বিপরীতে অর্থনৈতিক সুফল নিশ্চিত করা। তা না হলে ঋণের বোঝা কমার বদলে ভবিষ্যৎ বাজেটের চাপ বাড়তে পারে।
পাশাপাশি করের আওতা বাড়ানো, কর অব্যাহতির যৌক্তিক পর্যালোচনা, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণ জরুরি। ঋণের অর্থ এমন খাতে বিনিয়োগ করতে হবে, যা ভবিষ্যতে আয় ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন বাড়াবে।
যে আই
