ইউরোপীয় ফুটবলে এখন রাজত্ব পিএসজির। মাঠে তাদের দাপট, আক্রমণের ধার আর দলীয় সমন্বয়ের সামনে অসহায় দেখাচ্ছে প্রতিপক্ষকে। এবার সেই দাপটের শিকার ম্যানচেস্টার সিটি। বুধবার (১৪ অক্টোবর) রাতে ইতিহাদ স্টেডিয়ামে স্বাগতিকদের ৪-২ গোলে হারিয়ে টানা তৃতীয় চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা জয়ের শক্ত বার্তা দিয়েছে প্যারিসের ক্লাবটি। ম্যাচের প্রথমার্ধেই তিন গোল করে সিটির আত্মবিশ্বাসে বড় ধাক্কা দেয় লুইস এনরিকের দল।
ইউরোপের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন পিএসজি যে শুধু তারকানির্ভর দল নয়, বরং দলীয় ফুটবলের অনন্য উদাহরণ, সেটিও আবার দেখিয়েছে তারা। বিপরীতে, ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে দুর্দান্ত শুরু করা সিটিকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের বাস্তবতা বুঝিয়ে দিয়েছে ফরাসি ক্লাবটি।
প্রথমার্ধেই সিটির রক্ষণে ধস
ইতিহাদে ম্যাচের আগে আলোচনায় ছিলেন পেপ গার্দিওলা। ম্যানচেস্টার সিটির কোচের দায়িত্ব ছাড়ার পর প্রথমবারের মতো নিজের পুরোনো মাঠে ফিরেছিলেন তিনি। প্রিমিয়ার লিগে ম্যানসিটির বিরুদ্ধে মামলার রায় প্রকাশের পর নিজেদের মাঠে প্রথম ম্যাচে দলকে সমর্থন জানাতেই এসেছিলেন গার্দিওলা। কিন্তু সাবেক শিষ্যদের পারফরম্যান্সের বদলে তাকে দেখতে হয়েছে পিএসজির ফুটবলশৈলী।
আরও পড়ুন
প্রথমার্ধে মাত্র ১৯ মিনিটের ঝড়ে তিন গোল করে বসে পিএসজি। ডিজায়ার দুয়ে, উসমান দেম্বেলে ও ভিতিনহার গোলে বিরতিতে ৩-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় সফরকারীরা।
বিশেষ করে দুয়ের পারফরম্যান্স ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রথম গোলে দূরের পোস্টে শট নেওয়ার ভান করে কাছের পোস্ট দিয়ে বল জালে পাঠান তিনি। এরপর চাপের মধ্যেও দুর্দান্ত গতি ও নিখুঁত ক্রসে দেম্বেলেকে দিয়ে গোল করান। ম্যানসিটির ডান প্রান্তের রক্ষণ সামলাতে হিমশিম খেতে হয় আবদুকোদির খুসানভকে।
আরও পড়ুন
হালান্ডের রেকর্ডেও বাঁচেনি সিটি
বিরতির পর তিনটি পরিবর্তন আনেন সিটির কোচ এনজো মারেস্কা। তাতে কিছুটা গুছিয়ে ওঠে স্বাগতিকেরা। গোলের দেখা পান আর্লিং হালান্ড। ম্যাচে জোড়া গোল করেন নরওয়েজিয়ান স্ট্রাইকার।
এই দুই গোলের মাধ্যমে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ম্যানসিটির সর্বোচ্চ গোলদাতা হন হালান্ড। পাশাপাশি প্রতিযোগিতাটিতে ৬০ গোলের মাইলফলক স্পর্শ করেন সবচেয়ে কম বয়সী খেলোয়াড় হিসেবে। এ ক্ষেত্রে লিওনেল মেসির রেকর্ড এক দিন কম বয়সে ভেঙে দেন তিনি।
তবে হালান্ডের রেকর্ড গড়ার রাতেও ম্যাচে ফেরার সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি সিটিজেনরা। পিএসজির হয়ে ম্যাগনেস আকলিউশের গোল স্বাগতিকদের প্রত্যাবর্তনের আশায় বড় ধাক্কা দেয়। শেষ দিকে ফেররান তোরেস পেনাল্টি থেকে গোল করতে ব্যর্থ হন। তার শট ঠেকিয়ে দেন গোলরক্ষক জিয়ানলুইজি দোন্নারুম্মা। ফলে ব্যবধান কমানোর আর সুযোগ পায়নি ম্যানসিটি।
গার্দিওলা নাকি লুইস এনরিকে, সেরা কে?
গার্দিওলা ও লুইস এনরিকে, দুজনই আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সফল কোচ। দুজনেরই চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের সংখ্যা তিনটি। বার্সেলোনাকে ট্রেবল জেতানোর কৃতিত্বও রয়েছে তাদের। তবে পরপর দুই মৌসুমে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের অভিজ্ঞতা এখন পর্যন্ত এনরিকেরই রয়েছে।
গত মৌসুমে পিএসজিকে শিরোপা ধরে রাখতে সাহায্য করেছেন তিনি। এবারও টানা তৃতীয় শিরোপার পথে এগিয়ে যাচ্ছে দলটি। সেটি করতে পারলে চারটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা নিয়ে কোচ হিসেবে গার্দিওলাকে ছাড়িয়ে যাবেন এনরিকে। একই সঙ্গে টানা তিনবার ইউরোপসেরা হওয়ার বিরল কীর্তিও গড়বে তার দল।
গার্দিওলার সাফল্য নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। তবে পিএসজির সাম্প্রতিক দাপট প্রশ্ন তুলছে, এই প্রজন্মের সেরা কোচের আসনে কি এখন এনরিকেকেই বসানো উচিত?
তারকানির্ভর নয়, পিএসজির শক্তি পুরো দল
চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ইতিহাসে সেরা দল কোনটি, সেই আলোচনাতেও জায়গা করে নিচ্ছে বর্তমান পিএসজি। লিওনেল মেসি, জাভি ও আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার বার্সেলোনা কিংবা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর রিয়াল মাদ্রিদকে এত দিন এই আলোচনায় এগিয়ে রাখা হতো।
বার্সেলোনার সাফল্যের কেন্দ্রে ছিলেন মেসি। রিয়াল মাদ্রিদের শিরোপা অভিযানে রোনালদোর গোল ছিল বড় শক্তি। কিন্তু এনরিকের পিএসজিতে নির্দিষ্ট একজন তারকার ওপর নির্ভরতা নেই। দেম্বেলে, দুয়ে ও খভিচা কাভারাসখেলিয়া যেমন আক্রমণে গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি মাঝমাঠে ভিতিনহা ও ফাবিয়ান রুইজ এবং রক্ষণে আশরাফ হাকিমি ও মার্কুইনহোসের অবদানও সমান মূল্যবান।
দলীয় সমন্বয়, বলের দখল, গতিময় আক্রমণ এবং বল ছাড়া খেলোয়াড়দের চলাফেরা, সব মিলিয়েই পিএসজিকে ভয়ংকর করে তুলেছে। ইতিহাদে সিটির বিপক্ষে সেই শক্তিরই প্রদর্শনী দেখিয়েছে তারা।
ইংলিশ ক্লাবগুলোর জন্য পিএসজি এখন বড় আতঙ্ক
ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবগুলোর বিপক্ষে সাম্প্রতিক সময়ে পিএসজির সাফল্যও চোখে পড়ার মতো। ২০২৪-২৫ মৌসুমের শুরু থেকে ইংলিশ ক্লাবগুলোর বিপক্ষে ১৬ ম্যাচে এটি তাদের ১১তম জয়। এই সময়ে তাদের রেকর্ড ১১ জয়, ২ ড্র ও ৩ হার।
এর আগে আর্সেনাল, লিভারপুল, টটেনহাম ও চেলসির মতো দলগুলোর বিপক্ষেও নিজেদের শক্তি দেখিয়েছে পিএসজি। ২০২৫ চ্যাম্পিয়ন্স লিগের কোয়ার্টার ফাইনালের ফিরতি লেগে অ্যাস্টন ভিলা তাদের হারালেও দুই লেগ মিলিয়ে শেষ পর্যন্ত বিদায় করতে পারেনি ফরাসি ক্লাবটিকে।
অনিক/
