দেশ যখন আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় ক্যাশলেস বা নগদবিহীন লেনদেনের যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে, ঠিক তখনই এক জেলা থেকে অন্য জেলায় গিয়ে কেবল ‘বিশ্বাস’-এর ওপর ভর করে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছেন এক ধনুকর (লেপ-তোশক কারিগর)। শীতের আমেজ শুরু হতেই গ্রামে গ্রামে গিয়ে বাকিতে লেপ-তোশক তৈরি করে দিচ্ছেন তিনি। শীত শেষে ফিরে যাওয়ার সময় গ্রাহকরাও তার এই উপকারের কথা মনে রেখে পাওনা পরিশোধ করে দেবেন।
আধুনিক যুগে এসেও মানুষের প্রতি মানুষের এই পারস্পরিক বিশ্বাসের দারুণ নজির সৃষ্টি হয়েছে দিনাজপুর সদর উপজেলার ৬ নম্বর আউলিয়াপুর ইউনিয়নের ঘুঘুডাঙ্গা এলাকায়। ওই ব্যক্তির নাম শরিফুল ইসলাম (৫০)। তার বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জে হলেও দিনাজপুরে এসে এই পেশায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন।
বিজ্ঞাপন
সরেজমিন ঘুঘুডাঙ্গা এলাকার ফকিরপাড়া এলাকায় দেখা যায়, ধনুকর শরিফুল ইসলাম ও তার সঙ্গীরা লেপ তৈরির কাজে ব্যস্ত। তাদের ছবি তোলার সময় এক নারী এসে লেপের মাপ বলে তুলা, কাপড় ও মজুরিসহ কত টাকা খরচ হবে জানতে চান। তখন ধনুকর শরিফুল ইসলাম বলেন, দুই হাজার ৩০০ টাকা। এসময় ওই নারী বলেন, ‘নগদ কত, আর বাকি কত?’।
ধনুকর শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘আমি পরিশ্রম করে অর্থ উপার্জন করি। সুদ খাই না। নগদ নেন আর বাকিতে নেন, আপনার সঙ্গে যা দাম হবে তাই দিতে হবে। এরপরই বেরিয়ে আসে বাকিতে লেপ তৈরি করে দিয়ে শীতের মৌসুম শেষে ফিরে যাওয়ার সময় টাকা তুলে নিয়ে যাওয়ার গল্প। যেখানে আছে আস্থা ও বিশ্বাস।
বিজ্ঞাপন

বিশ্বাসের হাত ধরে কর্মসংস্থান
বর্তমান সময়ে যেখানে নগদ টাকা ছাড়া কোনো ধরনের বেচাকেনা বা সেবা পাওয়া কল্পনাই করা যায় না, সেখানে এই ধনুকর শরিফুল ইসলামের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ সবাইকে অবাক করেছে। তিনি এক জেলা থেকে অন্য জেলায় গিয়ে ঘুরে ঘুরে গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী লেপ, তোশক ও বালিশ তৈরি করে দেন। অনেক সময় গ্রাহকের তাৎক্ষণিক টাকা দেওয়ার সামর্থ্য না থাকলেও তিনি কাজ আটকে রাখেন না। সম্পূর্ণ বাকিতে কাজ করে দিয়ে আসেন। মৌসুম শেষে ফিরে যাওয়ার আগে সবার কাছ থেকে টাকা তুলে ফিরে যান নিজের পরিবার- পরিজনের কাছে।
ধনুকর শরিফুল ইসলাম জানান, ৫-৬ বছর ধরে লেপ, তোশক ও বালিশ তৈরির কাজ করছেন। ঘুঘুডাঙ্গা বাজারে একটি দোকান নিয়েছেন। সেখানে লেপ, তোশক ও বালিশ তৈরির সামগ্রী রাখাসহ থাকা ও রান্না-বান্নার কাজ করে থাকেন।
তিনি বলেন, ভাদ্র মাসের শেষের দিকে মালামালসহ সঙ্গীদের নিয়ে ঘুঘুডাঙ্গা এলাকায় চলে আসেন। পৌষ মাসের শেষে শীত বিদায় নিলে তিনিও বিদায় নিয়ে নিজ জেলায় ফিরে যান।
বিজ্ঞাপন
এক মৌসুমে ২৫০-৩০০ লেপ-তোশক বাকিতে তৈরি করে দিয়ে মুখে মুখেই সব হিসাব রাখেন এই ধনুকর। ফিরে যাওয়ার সময় হলে একইভাবে গ্রামে গ্রামে ঘুরে ফিরে যাওয়ার তারিখ জানিয়ে দেন। গ্রামের মানুষও সেই মোতাবেক তাকে বকেয়া টাকা দিয়ে দেন।
এক প্রশ্নের উত্তরে শরিফুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘৫-৬ বছর ধরে ধার-বাকিতে লেপ, তোশক ও বালিশ তৈরি করে দিচ্ছি। খাতা-কলম কিছুই লাগে না, মুখ দেখলেই বলে দিতে পারি কার কাছে কত টাকা পাওনা আছে। তাছাড়া গ্রামের মানুষ আমাকে কোনোদিন ঠকায়নি। আমার প্রতি তাদের আস্থা আছে। বাকি চাইলে না করবে না। আমার বিশ্বাস আছে গ্রামের মানুষ যাদের আমি উপকার করছি, তারা আমাকে ঠকাবে না।’
বিজ্ঞাপন
তার সঙ্গে থাকা কারিগর হেলাল আলী বলেন, ‘ফকিরপাড়া গ্রামে সাতটি লেপের অর্ডার পেয়েছি। সারাদিন এখানেই কাজ করতে হবে। আশপাশে কোনো হোটেল নেই। দুপুরে যাদের লেপ, তোশক ও বালিশ তৈরি করে দেব, তারাই সবাই মিলে খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করেন। আমরা তাদের আন্তরিকতা ও ভালোবাসার মায়ায় প্রতিবছর চলে আসি।’

সততা ধরে রেখেছেন গ্রাহকরাও
কথা হয় ফকিরপাড়া গ্রামের শহর বানু ও ঘুঘুডাঙ্গা জমিদারবাড়ি এলাকার জুয়েল ইসলামের সঙ্গে। তারা বলেন, ‘ধনুকর শরিফুল ইসলাম এই এলাকার সব শ্রেণির মানুষের কাছে পরিচিত মুখ। শীত এলেই শরিফুল ইসলামের চিরচেনা কণ্ঠে ভেসে আসে হাঁকডাক—‘লেপ-তোশক বানাবেন, লেপ-তোশক?’। তিনি ধনী-গরিব সবাইকে বাকিতে লেপ, তোশক ও বালিশ তৈরি করে দেন। তাই এই এলাকার মানুষ তাকে আপন করে নিয়েছে। ফিরে যাওয়ার সময় তার পাওনা বুঝিয়ে দেন।’
তারা আরও বলেন, ‘এই যুগে এসে এখনো এমন মানুষ পাওয়া সৌভাগ্যের ব্যাপার। যেখানে পুরো লেন-দেনটাই হয় আস্থার ওপর।’
বিজ্ঞাপন
বিশিষ্ট লেখক ও কলামিস্ট আজাহারুল আজাদ জুয়েল জাগো নিউজকে বলেন, ‘ডিজিটাল বাংলাদেশে যখন সব ধরনের লেনদেন হাতের মুঠোয় চলে আসছে, তখন প্রত্যন্ত অঞ্চলের এই ধনুকর ও সাধারণ মানুষের মধ্যকার এই সম্পর্কটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের মধ্যকার বিশ্বাসের মূল্য যেকোনো প্রযুক্তির চেয়ে অনেক বেশি। কোনো লিখিত চুক্তি বা জামানত ছাড়াই বছরের পর বছর ধরে চলা এই লেনদেন সমাজকে একটি ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।’
এএমএইচএম/এসআর/এএসএম
ফলো করুন
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন jagofeature@gmail.com ঠিকানায়।
