মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ ২০১৯-এর মঞ্চ থেকে উঠে আসেন রাফাহ নানজীবা তোরসা। অভিনয় করেছেন তৌকীর আহমেদের ‘হালদা’ সিনেমাতেও। এবার তোরসা অভিনীত ইফফাত জাহান মম পরিচালিত ‘কাট-পিস’ সিনেমা মুক্তি পেয়েছে। এতে মিরপুর ঝুটপট্টির চঞ্চল নারী মালা হয়ে পর্দায় এসেছেন তিনি। সিনেমার মুক্তি ও অন্যান্য প্রসঙ্গে দৈনিক খবরের কাগজের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আরফান হোসাইন রাফি¬
নায়িকা হিসেবে আপনার প্রথম সিনেমা ‘কাট-পিস’। অনুভূতি কেমন?
আমার মধ্যে অসম্ভব ভালোলাগা কাজ করছে। অনেস্টলি বলতে গেলে, এ কয়দিন এক ধরনের নার্ভাসনেস কাজ করলেও আজ মনে হচ্ছে, ট্রেইলার বা অন্যান্য কিছু মানুষ যেমন দেখেছে, তেমনি সিনেমাটিও দেখবে। সত্যি বলতে, আমিও আজ প্রথম সিনেমাটি দেখব। পরিচালক আমাদের আগে দেখতে দেননি, ফলে এই আনন্দটা এখন টের পাচ্ছি। এ ছাড়া আমরা পুরো বাংলাদেশে ২৪টি হল পেয়েছি। মুক্তির প্রথম দিনেই জানতে পেরেছি, লায়ন্স সিনেমা হল হাউসফুল। মিরপুরেও খুব ভালো ভিড় ছিল এবং চট্টগ্রামে আমার বাসা হওয়ায় ওখানকার রেসপন্সও খুব ভালো পেয়েছি। সব মিলিয়ে আমি খুবই এক্সাইটেড।
সিনেমাটির সঙ্গে কীভাবে যুক্ত হলেন?
কিছু চরিত্র থাকে, যেগুলো অলরেডি আর্টিস্টকে বেছে নেয়। আবার কিছু চরিত্র আর্টিস্ট নিজেই বাছাই করেন। ডিরেক্টরের কাছে মালা চরিত্রটির জন্য রাফাহ নানজীবা তোরসা ছিলেন ফার্স্ট ও লাস্ট চয়েস। মূলত ‘মাটি’ সিনেমার শুটিং শেষ করে ঢাকায় ফেরার পর রাতে আপু আমাকে বেশ কয়েকবার ফোন দেন। এর আগেও অন্য একটা কাজ নিয়ে তার সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল। সকালে কলব্যাক করার পর তিনি আমাকে সিনেমার বিষয়ে অফিসে দেখা করতে বলেন। অফিসে যাওয়ার পর সিফাতের সঙ্গে আমার পরিচয় হয় এবং লাইনআপটি শোনানো হয়। সাসপেন্স বজায় রাখার জন্য তখন পুরো গল্পটা আমাদের জানানো হয়নি, শুধু লাইনআপটা শোনানো হয়েছিল। ডিরেক্টর চেয়েছেন, আমরাও হলে গিয়ে সিনেমা দেখে গল্পটা জানি। পরে মালা চরিত্রটির জন্য অন্য কাউকে ভাবতে পারছেন না জেনেই আমি পুরো বিষয়টি শুনি এবং কাজটিতে অনবোর্ড হই।
পর্দায় মালাকে ফুটিয়ে তুলতে তোরসাকে কতটা বদলাতে হয়েছে বা চ্যালেঞ্জ কী ছিল?
মালা চরিত্রটি সিনেমার সমস্ত রাফনেস ও অ্যাকশনের মাঝে একটা স্নিগ্ধ বাতাসের মতো, যার মধ্যে কোনো রাফ বা ইঙ্গিতপূর্ণ বিষয় নেই। পর্দায় মালা হয়ে উঠতে আমাকে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছেন আমার ডিরেক্টর, কারণ তিনিই এটা এনশিওর করেছেন, যেন পর্দায় তোরসা নয়, মালাই ফুটে ওঠে। অভিনয় করার দিক থেকে আমার জন্য সবচেয়ে ডিফারেন্ট ছিল মালার কথা বলার ধরন। তোরসা যেভাবে প্রমিত ভাষায় কথা বলে, মিরপুরের গল্পের প্রেক্ষাপটে মালার ভাষা বা টোনটা একদম আলাদা। মিরপুরের ঝুটপট্টি বা ওই এলাকায় ছোট থেকে বড় হওয়া মানুষের যে একটা মিরপুরিয়ান টোন থাকে, সেটাকে রেগুলারিটির মধ্যে আনা, যাতে আরোপিত মনে না হয়—সেটা আমার জন্য বেশ ইন্টারেস্টিং একটি ব্যাপার ছিল। আমার সহশিল্পী সিফাত মিরপুরের লোক হওয়ায় তাকে প্রচুর জ্বালাতন করেছি। যেকোনো সময় ফোন দিয়ে উচ্চারণ বা সংলাপের ভুলগুলো শুধরে নিয়েছি। অল্প সময়ের জার্নি হওয়া সত্ত্বেও সাধ্যমতো ঘুমানো বাদ দিয়ে, আমি ভাষা ও উচ্চারণের দিকটা সাবলীল করার চেষ্টা করেছি।
মালার এমন কোনো গুণ কি আছে, যা আপনি মনে করেন তোরসার মধ্যেও থাকা জরুরি?
হা হা! না, ওরকম কিছু মনে হয়নি আমার। তোরসা অনেক বেশি স্ট্রেইট ফরোয়ার্ড এবং নিজের মতো থাকতে পছন্দ করে, কিন্তু সেভাবে দুষ্টুমি করে না। অন্যদিকে মালা অনেক দুষ্টু-মিষ্টি টাইপের।
একসময় কলকাতার সিনেমার প্রস্তাব ফিরিয়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে নিজের জায়গা তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এবার কি দুই বাংলার সিনেমাতেই নিজের কাজের পরিধি বাড়াতে চান?
কোভিড বা অন্যান্য কারণে কলকাতার দুটি সিনেমা এবং তামিল সিনেমার একটা কাজও করা হয়ে ওঠেনি। কলকাতার কাজের প্রস্তাবের ক্ষেত্রে তারা চেয়েছিলেন, আমি যেন কলকাতায় গিয়ে এক বছর থাকি, যাতে দুই বাংলার ভাষার টান ও টোনের পার্থক্যটা আয়ত্ত করতে পারি। কিন্তু আমার সিনেমার শুরুটা বাংলাদেশেই হোক, এই ভেবে আমি তখন সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলাম।
সিনেমার বাইরে যদি একটু যাই, অভিনেতা স্বাধীন খসরু দ্বারা যৌন হেনস্তা বা ব্যাড টাচের শিকার হওয়ার অভিযোগ সামনে এনেছেন। হঠাৎ করেই এমন একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে কথা বলার বিশেষ কোনো কারণ আছে?
এখানে কোনো ভুল তথ্য বা বিভ্রান্তির সুযোগ নেই। আমি ২০২০ সালের পর থেকেই বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বলে এসেছি যে আমি এমন একটি অপ্রীতিকর ঘটনার মুখোমুখি হয়েছিলাম। ঘটনার কথা একাধিকবার বলেছি, কিন্তু কেবল ওই ব্যক্তির নাম উল্লেখ করিনি। ২০২০ সালের ২৮ সেপ্টেম্বরও আমি সোশ্যাল মিডিয়ায় এক পোস্টের মাধ্যমে আমাকে হেনস্তার বিষয়টি জানিয়েছিলাম। ফলে তার সত্যতা ও প্রমাণ ২০২০ সাল থেকেই রয়েছে।
ঘটনাটি ঘটার পরই আপনি ওই ব্যক্তির নাম প্রকাশ্যে আনেননি কেন?
তখন আমার জন্য ঢাকা শহর, চারপাশের মানুষ, পরিবেশ এবং ইন্ডাস্ট্রি—সবকিছুই একদম নতুন ছিল। এমনিতে আমি প্রতিবাদী এবং যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলি; কিন্তু নতুন এক পরিবেশে এসে এ রকম ঘটনার মুখোমুখি হওয়ার পর মানসিকভাবে আমি ভীষণ ধাক্কা খেয়েছিলাম। আইনি পদক্ষেপ নেওয়া বা নাম প্রকাশ করার কথা ভাবলেও নিজের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করতে হয়েছিল। তখন ঢাকায় আমি একাই ছিলাম। আমার মা তখন পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে আমাকে সাময়িকভাবে শান্ত থাকতে বলেছিলেন। এসব কারণেই তখন মানসিকভাবে সেই ধাক্কা সামলে উঠে নাম প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি।
তাহলে এখন এসে নাম প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত কেন নিলেন?
আমার মনে হয়েছে সত্য গোপন রাখা বা লুকোচুরি করার কোনো অর্থ নেই। এতদিন ঘটনাটি বললে নাম বলিনি, এবার মনে হয়েছে নামটাও বলে দেওয়া উচিত, তাই বলেছি। এটি কোনো হুট করে নতুন গল্প বানানো নয়। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, কেন ২০২০ সালে না বলে ২০২৬ সালে বলছি? এটি একটি অত্যন্ত অসংগত প্রশ্ন। একজন মানুষ ট্রমার কারণে তৎক্ষণাৎ নাম বলতে না পারলে ভবিষ্যতে কখনোই তা বলতে পারবেন না, এমন কোনো নিয়ম নেই।
