অতীতের সহিংসতা ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়, তবে সেই ইতিহাস সম্পর্কে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে পারে শিক্ষা। এ লক্ষ্য সামনে রেখে গণহত্যা ও অতীতের সহিংসতার ইতিহাস পাঠদানের বিষয়ে ১১টি দেশের নীতিনির্ধারকদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো।
গত ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে ১ অক্টোবর পর্যন্ত কম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেনে ‘ইন্টারন্যাশনাল প্রোগ্রাম অন হলোকাস্ট অ্যান্ড জেনোসাইড এডুকেশন’ (আইপিএইচজিই) কর্মসূচির আওতায় চার দিনের এ প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়।
বিজ্ঞাপন
কর্মশালার মূল লক্ষ্য ছিল, শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের অতীতের সহিংস ঘটনা সম্পর্কে সমালোচনামূলকভাবে চিন্তা করতে শেখানো এবং শান্তি, , সহমর্মিতা ও পুনর্মিলনের সংস্কৃতি গড়ে তোলা।
কম্বোডিয়ার তিনটি স্মৃতিবিজড়িত স্থান—তুওল স্লেং গণহত্যা জাদুঘর, চোউং এক গণহত্যা কেন্দ্র এবং সাবেক এম-১৩ কারাগারকে ঘিরে প্রশিক্ষণটির আয়োজন করা হয়। ২০২৫ সালে স্থানগুলো ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত খেমার রুজ শাসনামলে সংঘটিত অপরাধের ইতিহাস বহন করছে এসব স্থান।
ইউনেস্কো ও যুক্তরাষ্ট্রের হলোকাস্ট মেমোরিয়াল মিউজিয়ামের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত কর্মশালায় কম্বোডিয়া, অস্ট্রেলিয়া, বাংলাদেশ, ভারত, কেনিয়া, নামিবিয়া, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, রুয়ান্ডা, স্পেন ও তিমুর-লেস্তের শিক্ষা খাতের নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন। বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের পাশাপাশি ভিন্ন ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে সহিংস অতীতের ইতিহাস কীভাবে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়।
কম্বোডিয়ার শিক্ষা, যুব ও ক্রীড়ামন্ত্রী এবং উপপ্রধানমন্ত্রী হাং চুয়োন ন্যারন উদ্বোধনী বক্তব্যে বলেন, শিক্ষা মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া, মানবিক মর্যাদা, সহমর্মিতা ও সমালোচনামূলক চিন্তার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে এটি শান্তির প্রতি সবার অভিন্ন অঙ্গীকার গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
তিনি বলেন, ভিন্ন ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার নীতিনির্ধারক, শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের একত্র করার গুরুত্ব রয়েছে। প্রতিটি সমাজের অভিজ্ঞতা আলাদা হলেও শিক্ষা মানুষকে অতীত স্মরণ, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা এবং পুনর্মিলন ও শান্তির পথে এগিয়ে যেতে সাহায্য করতে পারে।
সংবেদনশীল ইতিহাস পাঠদানে শিক্ষকদের প্রস্তুতি
ইউনেস্কোর মতে, অতীতের সহিংসতার ইতিহাস পড়ানো মানে কেবল ঐতিহাসিক তথ্য তুলে ধরা নয়। এ ধরনের বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে শিক্ষকদের সংবেদনশীল প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার উপযুক্ত দক্ষতা থাকতে হয়। একই সঙ্গে কঠিন আলোচনা পরিচালনা এবং কোন পরিস্থিতি ও সিদ্ধান্ত সহিংসতার দিকে নিয়ে যেতে পারে, তা শিক্ষার্থীদের বুঝতে সহায়তা করাও তাদের দায়িত্ব।
কর্মশালায় আলোচনা করা হয়, কীভাবে পেশাগত প্রশিক্ষণ, ইতিহাস শিক্ষা ও নাগরিকত্ববিষয়ক পাঠদানের মাধ্যমে শিক্ষকদের এ দায়িত্ব পালনের জন্য প্রস্তুত করা যায়। শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন এবং স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পাঠদানের পদ্ধতি কীভাবে সাজানো যায়, তা নিয়েও আলোচনা হয়।
এ প্রশিক্ষণে ইউনেস্কোর অ্যাড্রেসিং ভায়োলেন্ট পাস্টস থ্রু এডুকেশন: আ পলিসি গাইড শীর্ষক নীতিনির্দেশনার সুপারিশ অনুসরণ করা হয়। পাশাপাশি ২০২৩ সালে গৃহীত শান্তি ও মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক বোঝাপড়া, সহযোগিতা, মৌলিক স্বাধীনতা, বৈশ্বিক নাগরিকত্ব এবং টেকসই উন্নয়নবিষয়ক শিক্ষা সুপারিশের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এতে ইতিহাস সম্পর্কে তথ্যভিত্তিক শিক্ষা এবং শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।
গণহত্যার স্মৃতিবিজড়িত স্থান পরিদর্শন
প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে অংশগ্রহণকারীরা তুওল স্লেং গণহত্যা জাদুঘর ও চোউং এক গণহত্যা কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। এ ছাড়া কম্বোডিয়ার আদালতের বিশেষ চেম্বারের (ইসিসিসি) রিসোর্স সেন্টার ঘুরে খেমার রুজ শাসনামল এবং ওই সময়ের নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কিত নথি ও শিক্ষাসামগ্রী সম্পর্কে জানেন তাঁরা।
এসব কার্যক্রমে স্মৃতিবিজড়িত স্থান, আর্কাইভ ও ঐতিহাসিক নথি কীভাবে শিক্ষা কার্যক্রমে কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়। একই সঙ্গে সংবেদনশীল ইতিহাস পড়ানোর সময় ভুক্তভোগীদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সংবেদনশীলতা বজায় রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।
তুওল স্লেং পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস শিক্ষা বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক ও কর্মশালার বক্তা জেসন টড বলেন, স্থানটি তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। একসময় সেখানে একটি স্কুল ছিল। ভবনগুলোতে শ্রেণিকক্ষ ও উঠান ঘিরে বারান্দা রয়েছে। কিন্তু কাঁটাতার এবং সেখানে সংঘটিত অপরাধের ইতিহাস সেই পরিচিত পরিবেশকেও অসহনীয় করে তুলেছে।
তিনি বলেন, স্থানটিকে কীভাবে দেখা উচিত, তা নিয়ে তার মনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল—এটি কি ধ্বংসাবশেষ, জাদুঘর, স্মৃতিসৌধ, অপরাধস্থল, নাকি একটি স্কুল?
টডের এই অভিজ্ঞতা নৃশংস অপরাধের ইতিহাস পড়ানোর জটিলতা তুলে ধরে। কর্মশালায় আলোচনা করা হয়, কীভাবে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের এমন সহিংসতা সম্ভব করে তুলেছিল—এমন প্রতিষ্ঠান, পরিস্থিতি ও সিদ্ধান্তগুলো বিশ্লেষণ করতে সাহায্য করতে পারেন। একই সঙ্গে এসব ইতিহাসের আবেগগত জটিলতা মোকাবিলায়ও তাদের সহায়তা করা প্রয়োজন।
বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বিনিময়
১১টি দেশের নীতিনির্ধারক ও শিক্ষা খাতের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের ফলে কঠিন ইতিহাস পাঠদানের বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ তৈরি হয়। বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া শিক্ষা কীভাবে শিক্ষা নীতি ও বাস্তব প্রয়োগে কাজে লাগানো যায়, তা নিয়েও আলোচনা হয়।
ইউনেস্কোর গণহত্যা শিক্ষা ও প্রতিরোধবিষয়ক অনানুষ্ঠানিক একাডেমিক নেটওয়ার্কের সদস্য এবং বিভিন্ন শিক্ষাবিদের অংশগ্রহণে আলোচনা আরও সমৃদ্ধ হয়। কর্মশালার পাশাপাশি নেটওয়ার্কটির বার্ষিক সভাও অনুষ্ঠিত হয়।
কম্বোডিয়ায় ইউনেস্কোর প্রতিনিধি ও কার্যালয়প্রধান ফ্লাভিও বনেত্তি সমাপনী বক্তব্যে সংলাপ ও জ্ঞান বিনিময়ের জন্য এমন আয়োজনের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, কর্মশালায় শুরু হওয়া অভিজ্ঞতা বিনিময় ও আলোচনা নির্ধারিত সময়ের বাইরেও অব্যাহত থাকবে।
রুয়ান্ডা থেকে অংশ নেওয়া ওলেগ অলিভিয়ের কারামবিজি বলেন, কয়েক দিনের এ আয়োজন ছিল স্বল্প সময়ের হলেও তা গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। তুওল স্লেং ও চোউং এক পরিদর্শন, বিভিন্ন দেশের ক্ষত ও আশা নিয়ে আলোচনা এবং স্মরণকে কীভাবে প্রতিরোধের শক্তিতে রূপ দেওয়া যায়, সে বিষয়ে শেখার অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে বিশেষ অর্থবহ।
প্রশিক্ষণের শিক্ষা বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ
প্রশিক্ষণ শেষে নিজ নিজ দেশে ফিরে পাওয়া অভিজ্ঞতাকে শিক্ষা নীতি ও পাঠদানের বাস্তব পদ্ধতিতে প্রয়োগ করাই অংশগ্রহণকারীদের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নিজ নিজ দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পদ্ধতি তৈরি করা গেলে সহিংস অতীত এবং তার দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি মোকাবিলায় শিক্ষা ব্যবস্থার ভূমিকা আরও জোরদার হতে পারে বলে মনে করছে ইউনেস্কো।
২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের হলোকাস্ট মেমোরিয়াল মিউজিয়ামের সঙ্গে যৌথভাবে আইপিএইচজিই কর্মসূচি চালু করে ইউনেস্কো। এ কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন দেশের জ্যেষ্ঠ শিক্ষা খাতের কর্মকর্তাদের স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সংঘটিত সহিংসতার ইতিহাস নিয়ে শিক্ষাক্রম প্রণয়নে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এখন পর্যন্ত ইউনেস্কোর সব অঞ্চলের ৩৪টি সদস্যরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা এ কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা সরকার কর্মসূচিটিকে সহায়তা দিচ্ছে।
কম্বোডিয়ার শিক্ষা, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং সংস্কৃতি ও চারুকলা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ইউনেস্কোর চলমান অংশীদারত্বের অংশ হিসেবেও এ প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। এর লক্ষ্য উন্নত পাঠ্যসামগ্রী, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং ইতিহাস সম্পর্কে উপলব্ধি, সহমর্মিতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়ক শিক্ষাপদ্ধতির মাধ্যমে গণহত্যা বিষয়ে শিক্ষাকে শক্তিশালী করা।
এ উদ্যোগ কম্বোডিয়ায় ইউনেস্কোর কোরিয়া আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (কোইকা)-অর্থায়িত চলমান ‘পিস’ প্রকল্পের শান্তি শিক্ষাবিষয়ক কার্যক্রমের পরিপূরক হিসেবেও কাজ করছে। আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক—উভয় ধরনের শিক্ষাব্যবস্থায় শান্তি শিক্ষার উপকরণ তৈরি এবং তা কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানো এ প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য।
সূত্র: www.unesco.org
