‘তুমিহীনতায় দমবন্ধ হয়ে আসে আমার আর তোমাকে দেখলেই আমার হৃদয়ে জন্ম নেয় বসন্ত ঋতু’— প্রেমিকার কাছে লেখা এক চিঠিতে এমনই স্বীকারোক্তি করেছিলেন শামসুর রহমান। যে কবির কলমে স্বাধীনতা পেয়েছে প্রতিবাদের ভাষা, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে জেগে উঠেছে শব্দ, সেই কবিরই ব্যক্তিগত চিঠিতে অপেক্ষা, স্পর্শ আর ভালোবাসার এমন আকুলতা। নয়টি প্রেমপত্রের সূত্র ধরে সামনে আসে এক অচেনা শামসুর রহমান। শুধু বিপ্লবের কবি নন যিনি, প্রেমের কাছেও ছিলেন গভীরভাবে ঋণী।
২০০৭ সালে সময় প্রকাশন থেকে বদরুল আলম আমিনের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘শামসুর রাহমানের পত্র ও প্রেমপত্র’। বইটিতে স্থান পেয়েছিল এক অজ্ঞাতনামা প্রেমিকাকে লেখা কবির নয়টি চিঠি। সেখানে প্রেমিকার পরিচয় প্রকাশিত হয়নি, কখনো ছদ্মনামে, কখনো উপমায় তাকে সম্বোধন করেছেন শামসুর রহমান। এই চিঠিগুলোর সূত্র ধরেই ২০২২ সালে অনুসন্ধানে নামেন সাংবাদিক ফারজানা সিদ্দিকা।
সেই অনুসন্ধানে উঠে আসে কবি তুষার করের নাম। শামসুর রাহমানের ঘনিষ্ঠ অনুরাগী ও তার অনেক লেখার এ সংগ্রাহকের কাছে সংরক্ষিত ছিল কবির দুর্লভ কাগজপত্র। নয়টি প্রেমপত্রের প্রাপকের পরিচয়ও তার জানা ছিল বলে জানান ফারজানা। পুরনো কাগজপত্র ঘাঁটতে গিয়ে তিনি বের করে আনেন আরো কিছু চিঠি এবং একটি রঙিন ভাঁজপত্র— যার ভেতরে লুকিয়ে ছিল কবির প্রেমের আরেক অধ্যায়।
সেই ভাঁজপত্রের নাম ‘গোধূলিতে হৃদয়ের ধ্বনি’। ১৯৯৪ সালে বিদ্যাপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত এই ক্ষুদ্র কাব্যগ্রন্থে ছিল এক তরুণীকে উদ্দেশ করে লেখা আটটি কবিতা। তাদের প্রথম দেখা শিলাইদহে, রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদের একটি আয়োজনে। তরুণী গান জানতেন, আবৃত্তি করতেন, অভিনয়ও করতেন। পরিচয়ের পর দুজনের ঠিকানা হয়ে ওঠে দুই শহর। কবি ঢাকায়, তরুণী রাজশাহীতে। দূরত্ব ঘুচত চিঠিতে, কখনো টেলিফোনে। আর কবি সুযোগ পেলেই ছুটে যেতে চাইতেন সেই শহরে, যেখানে তার জন্য অপেক্ষা করতেন প্রিয় মানুষটি।
রাজশাহীর বিমানবন্দর তখন আর কেবল একটি সাধারণ স্থাপনা নয়। প্রিয় মানুষের উপস্থিতি তাকে কবির কাছে করে তুলেছিল চিরপ্রিয়। ভাঁজপত্রের ‘বিমান বন্দর’ কবিতায় তিনি লিখেছিলেন, “সেই বিমান বন্দর বন্দনীয়/ এবং চিরপ্রিয়/ হয়ে ওঠে আমার শুধু তুমি ছিলে ব’লে/ আমাকে স্পর্শ করেছিলে ব’লে কথাচ্ছলে।” স্থানটির গুরুত্ব তার স্থাপত্যে নয়, বরং সেখানে জমে থাকা স্মৃতিতে। প্রেম কীভাবে একটি শহর, একটি বিমানবন্দর কিংবা একটি পথকে ব্যক্তিগত মানচিত্রে বদলে দেয়, এই কয়েকটি পঙক্তি তারই সাক্ষ্য।
কিন্তু প্রেমের এই গল্পের পথ মসৃণ ছিল না। তত দিনে শামসুর রাহমান জাতীয় ব্যক্তিত্ব। জনসমক্ষে তার চলাফেরা, এমনকি নিজের বাড়িতে নিরিবিলি সময় কাটানোও সহজ ছিল না। কবির সঙ্গে দেখা করতে তরুণীকে কখনো কবিতার অনুরাগীর পরিচয়ে তার বাড়িতে যেতে হতো। সাক্ষাতের সময় ছিল সামান্য, বিদায়ের বেদনা থেকে যেত দীর্ঘক্ষণ। ‘যাচ্ছো, যাও’ কবিতায় সেই অসহায়তার ভাষা হয়ে ওঠে বিদীর্ণ হৃদয়— যে হৃদয় জানে, ভালোবাসার মানুষটিকে চলে যেতে দিতে হয়, অথচ তার চলে যাওয়াই সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়।
এই প্রেমের গল্পে আরো বেদনাদায়ক হয়ে ওঠে স্বাধীনতার প্রশ্ন। ১৯৯৪ সালের ২৯ মার্চ তারিখযুক্ত একটি চিঠিতে তরুণী তুষার করকে লিখেছিলেন, কবি লিখতে বসলে তাকে পাহারা দেয়া হয়— কাকে লিখছেন, কেন লিখছেন, সেই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় তাকে। চিঠিতে আক্ষেপ করেছিলেন, ভালোবাসার অধিকার যেন সমাজে সবার জন্য সমান নয়; বিশেষ করে একজন নারী কাকে ভালোবাসবেন, তা নিয়েও যেন বিধিনিষেধের শেষ নেই। তার কথায়, “তুষার’কে ভালোবাসতে দোষ নেই মানা নেই, তমা’কে বাসলেই যত বিপত্তি।”
এখানে প্রেমের ব্যক্তিগত বেদনা গিয়ে মেশে সামাজিক বাস্তবতায়। যে কবি সারাজীবন মানুষের মুক্তি ও ব্যক্তিস্বাধীনতার পক্ষে লিখেছেন, তার নিজের ভালোবাসাও ঘরের ভেতর নজরদারি ও সামাজিক সংকীর্ণতার মুখোমুখি হয়েছিল। প্রেমিক হিসেবে তার এই অভিজ্ঞতা কবির বিপ্লবী সত্তাকে খণ্ডিত করে না, বরং স্বাধীনতার প্রশ্নটিকে আরো ব্যক্তিগত করে তোলে।
১৯৯৪ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল এই প্রেমের অধ্যায়। তরুণীকে ‘তমা’ নামে সম্বোধন করতেন কবি। পরে তার জীবনে কী ঘটেছিল, সেই গল্পও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে— ব্যক্তিগত শোক, প্রথম বিয়ে ভেঙে যাওয়া, সন্তানকে নিয়ে জীবনের সংগ্রাম এবং নতুন করে সংসার গড়ার অভিজ্ঞতা। ১৯৯৬ সালে তুষার করকে লেখা তার শেষ চিঠিতে কবির প্রসঙ্গ আর আসেনি। সময়ের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের স্মৃতিও যেন অন্য জীবনের ভেতর সরে গিয়েছিল।
তবে এই নয়টি প্রেমপত্রের প্রাপক এবং তমাকে ঘিরে ১৯৯৪ সালের প্রেমের অধ্যায় একই সম্পর্কের অংশ কিনা, তা নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রকাশিত প্রমাণ নেই। প্রেমের আরেকটি চিঠিতে কবি লিখেছিলেন, ‘যে তুমি আমার স্বপ্ন, রূপময়ী, সর্বস্ব আমার’। আবার একসময় তিনি লিখেছেন, ‘তোমাকে দেখলেই আমার হৃদয়ে জন্ম নেয় বসন্ত ঋতু।’ এটি ওই নয়টি চিঠির একটি বলে নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত নয়; কিন্তু কবির প্রেমিকসত্তার আরেকটি প্রত্যক্ষ দলিল হিসেবে এর গুরুত্ব আছে।
শামসুর রহমানকে আমরা মনে রাখি ‘আসাদের শার্ট’, ‘স্বাধীনতা তুমি’ কিংবা ‘বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’র কবি হিসেবে। তার শব্দে একটি জাতির ক্ষোভ, আকাঙ্ক্ষা ও মুক্তির স্বপ্ন ধরা পড়েছে। অথচ ব্যক্তিগত চিঠিতে তিনি অপেক্ষা করেছেন একটি ফোনের, একটি চিঠির, প্রিয় মানুষের সামান্য স্পর্শের। বিপ্লবের ভাষা যার কলমে এত দৃঢ়, প্রেমের ভাষায় তিনিই কখনো অসহায়, কখনো অভিমানী, কখনো একেবারে সাধারণ একজন মানুষ।
হয়তো এই বৈপরীত্যই শামসুর রহমানকে আরো মানবিক করে তোলে। ইতিহাস তাকে দিয়েছে প্রতিবাদের কবির পরিচয়, তার চিঠি ও প্রেমের কবিতা মনে করিয়ে দেয়, সেই প্রতিবাদী মানুষেরও ছিল একান্ত ব্যক্তিগত আকুলতা। নয়টি চিঠির সব রহস্য আজও উন্মোচিত হয়নি। কিন্তু তাদের অস্তিত্বই জানিয়ে দেয়— কবির জীবনে এমন কিছু অনুভূতি ছিল, যেগুলো জনতার সামনে উচ্চারিত হয়নি, রয়ে গিয়েছিল কাগজের ভাঁজে, গোপন সম্বোধনে, আর এমন এক ভালোবাসায়, যা প্রকাশের অধিকার চেয়েছিল নিঃশব্দে।
