দুর্যোগ এলেই সুযোগ খোঁজে সিন্ডিকেট"-এটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত বাস্তব এবং চেনা একটি চিত্রে পরিণত হয়েছে।
দুর্যোগ এলেই সুযোগ খোঁজে সিন্ডিকেট"-এটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত বাস্তব এবং চেনা একটি চিত্রে পরিণত হয়েছে। যেকোনো প্রাকৃতিক বা সামাজিক দুর্যোগে যেমন: বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, মহামারি বা রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেট চক্র সাধারণ মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে অবৈধ মুনাফা লুটতে সক্রিয় হয়ে ওঠে। দুর্যোগের সময় এই সিন্ডিকেটগুলো মূলত নানাভাবে কাজ করে এবং সাধারণ মানুষকে বিপদে ফেলে।
দেখা গেছে দুর্যোগের আভাস পাওয়ার সাথে সাথেই চক্রটি মানুষের অসহায়ত্বকে কাজে লাগিয়ে অবৈধ পন্থায় বিপুল অংকের মুনাফা লুটে নেয়। এই পরিস্থিতি দেখা গেছে মহামারিকালীন করোনার সময়েও। সরবরাহ কমে যাওয়ার অজুহাতে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে পণ্যের দাম দ্বিগুণ বা তিনগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, চিকিৎসা সামগ্রী এবং সেবামূলক খাতে অসৎ ব্যবসায়ী এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের সিন্ডিকেট বা কালোবাজারি চক্র অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে। তারা মূলত মানুষের অসহায়ত্ব এবং অতি-প্রয়োজনীয়তাকে পুঁজি করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করত। করোনা মহামারির সময় মাস্ক, স্যানিটাইজার বা নির্দিষ্ট কিছু ওষুধের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়।
একইভাবে অন্য সময়েও বাজার থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য (যেমন: চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ, আলু, শুকনা খাবার ও ওষুধ) গুদামজাত বা মজুদ করে ফেলে। বাজারে পণ্যের সরবরাহ হঠাৎ কমিয়ে দিয়ে তারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। বন্যার সময় প্রত্যন্ত অঞ্চলে মোমবাতি, দিয়াশলাই বা খাওয়ার পানির দাম বহুগুণ বেড়ে যায়। দুর্যোগের অজুহাতে বা সরবরাহ লাইনে সাময়িক বিঘœ ঘটিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা চাল, ডাল, পেঁয়াজ, শাকসবজি এবং ভোজ্যতেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম একরাতেই আকাশচুম্বী করে তোলে।
দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া বা সংকটের সময়ে সবচেয়ে বেশি অস্থিরতা দেখা যায় জ্বালানি খাতে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি করার অভিযোগ প্রতিনিয়ত বাড়ছে।
দুর্যোগের সময় পণ্য পরিবহন বা মানুষের যাতায়াতের জন্য নৌকা, ট্রাক বা অন্যান্য যানবাহনের ভাড়াও সিন্ডিকেটের মাধ্যমে একলাফে অনেক বাড়িয়ে দেওয়া হয়। ফলে উপদ্রুত অঞ্চলের মানুষের কষ্ট আরও বাড়ে এবং সেখানে ত্রাণ পৌঁছানোও ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। যখন মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই প্রধান হয়ে দাঁড়ায়, তখন এই সিন্ডিকেটের কারণে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো চরম খাদ্য ও চিকিৎসা সংকটে পড়ে। এটি কেবল একটি অর্থনৈতিক অপরাধ নয়, বরং চরম অমানবিকতা।
দুর্যোগের সময় বিভিন্ন পানিবাহিত বা সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটলে প্রয়োজনীয় ওষুধ, স্যালাইন বা জীবন রক্ষাকারী সামগ্রীর কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়। সাধারণ মানুষ নিরুপায় হয়ে চড়া দামে এগুলো কিনতে বাধ্য হন, যা সরাসরি ভোক্তার ওপর চরম আর্থিক মানসিক চাপ সৃষ্টি করে।
এদিকে সরকারি বা বেসরকারিভাবে আসা ত্রাণসামগ্রী অসহায় মানুষের হাতে না দিয়ে কালোবাজারে বিক্রি করে দেওয়া বা নিজেদের গুদামে লুকিয়ে রাখার অভিযোগ প্রায়ই ওঠে। নকল ও নিম্নমানের সামগ্রী বিতরণ: অনেক সময় ত্রাণের নামে মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার, নিম্নমানের টিন বা ওষুধ বিতরণ করে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়। সহায়তার নামে ভুয়া ফান্ড বা প্রতারণা: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অসহায় মানুষের ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করে ভুয়া বিকাশ, নগদ বা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে সাহায্য চাওয়া হয়, যা আসলে সরাসরি প্রতারকদের পকেটে যায়।
বর্তমান সময়ে এসে হাম এবং ডেঙ্গুর মহামারির সময়ে অসাধু ব্যবসায়ী রোগীদরে জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার ও ফলের বাজারে অযৌক্তিক সিন্ডিকেট তৈরি করে গলাকাটা ব্যবসার অভিযোগ রয়েছে। আক্রান্ত রোগীদের শারিরীক দুর্বলতা কাটাতে এবং তরল খাবাররে চাহিদা মেটাতে চিকিৎসকরা ডাব ও বিভিন্ন ফল খাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। আর এই উচ্চ চাহিদাকে পুঁজি করে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
দেখা যাচ্ছে ডেঙ্গু ও হামের কারণে বাজারে ডাবের চাহিদা আকাশচুম্বী। এই সুযোগে খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতারা সিন্ডিকেট করে একেকটি ডাব ১৮০ থেেক ২০০ টাকায় বিক্রি করছে; যার পাইকারি দাম অনেক কম। একইকারণে বাজারে মাল্টা, কমলা, এবং লেবুর মতো ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ ফলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হয়েছে। রোগীর পুষ্টির জোগান দিতে গিয়ে সাধারণ মানুষ সিন্ডিকেটের কারণে কিনতে হিমসিম খাচ্ছে।
একদিকে দ্বৈত সংক্রমণ মোকাবিলায় হাসপাতালগুলোতে রোগীর তীব্র চাপ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে কিছু ক্ষেত্রে জ্বর বা ব্যথানাশক অতিপ্রয়োজনীয় ওষুধ ও স্যালাইনরে কৃিত্রম সংকটের অভিযোগ ওঠেছে। মাঝে মাঝে এসব ওষুধ বাজার থেকে হাওয়া করে দিয়ে বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন ভোক্তা অধকিার এবং বাজার মনটিরংি ব্যবস্থা জোরদার না হওয়ায় সাধারণ মানুষ এই স্বাস্থ্য সংকটরে মুহূর্তেও আর্থিক শোষণের শিকার হচ্ছে। এক্ষেত্রে কঠোর নজরদারি ও অভিযান, ওপেন মার্কেট সেল (ওএমএস) বৃদ্ধি, মজুদদারির বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং কালোবাজারি ও অবৈধ মজুদদারদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিসহ ডিজিটাল ট্র্যাকিংব্যবসথা চালু করা দরকার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সিন্ডিকেটগুলো দীর্ঘদিন ধরে আইনি ফাঁকফোকর এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় টিকে রয়েছে। দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক করতে বাজার থেকে এই "সিন্ডিকেট-তন্ত্র" উপড়ে ফেলা বর্তমান সময়ের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক সংস্কারের দাবি।
