গত সপ্তাহের পর শনিবার ফের ফ্রান্স জুড়ে শুরু হয়েছে বিক্ষোভ কর্মসূচি। স্কুলগুলির জন্য তহবিলে ঘাটতি, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি এবং নাগরিক পরিষেবার বেহাল দশা নিয়ে ক্রমশ ক্ষোভ বাড়ছে ফ্রান্সের সাধারণ জনতার মনে। তার প্রতিবাদে শনিবার রাজধানী প্যারিস-সহ ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে জমায়েত শুরু করেন বিক্ষোভকারীরা। গত সপ্তাহের বিক্ষোভ চলাকালীন বেশ কিছু গোলমাল এবং লুটপাটের অভিযোগও উঠে এসেছিল। তার জেরে শনিবার শুরু থেকেই সজাগ ছিল ফ্রান্সের প্রশাসন। বিক্ষোভকারীদের সামাল দিতে মোতায়েন করে ৭০ হাজার পুলিশকর্মী। প্যারিসে বন্ধ করে দেওয়া হয় বিভিন্ন মেট্রো স্টেশনও।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিক্ষোভ কর্মসূচি শুরুর আগে থেকেই জায়গায় জায়গায় পুলিশি অভিযান শুরু হয়। চলে ধরপাকড়ও। শনিবার দুপুরের আগেই (স্থানীয় সময়ে) ফ্রান্সে গ্রেফতার হন অন্তত ১৩৫ জন বিক্ষোভকারী। তাঁদের মধ্যে অনেককেই পাকড়াও করা হয় পুলিশের আগাম তল্লাশির সময়ে। এ দিন বিক্ষোভ কর্মসূচির জেরে মধ্য প্যারিসে দৃশ্যত এক অঘোষিত লকডাউনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। বন্ধ করে দেওয়া হয় দোকানপাট। জাদুঘরও বন্ধ থাকে। প্যারিসের অন্তত ২০টি মেট্রো স্টেশন শনিবার বন্ধ করে রাখা হয়।
এ দিনের কর্মসূচির জন্য ফ্রান্স জুড়ে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল। যা গত সপ্তাহের চেয়ে প্রায় ১০ হাজার বেশি। এ দিনের মূল প্রতিবাদ মিছিলটি আয়োজিত হয় প্যারিসে। আইনি টানাপ়ড়েনের পর অবশেষে পুলিশের প্রস্তাবমতো মিছিলের পথ পরিবর্তন করতে রাজি হন আন্দোলনকারীরা। প্রথমে ঠিক ছিল প্যারিসের একেবারে কেন্দ্রী ভাবে মিছিল হবে। কিন্তু পুলিশ তা মধ্য প্যারিস থেকে সরিয়ে শহরের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। প্যারিসের মূল মিছিলটি শান্তিপূর্ণ ভাবে শুরু হলেও ফ্রান্সের অন্য কিছু প্রান্তে বিক্ষিপ্ত উত্তেজনার খবর মিলেছে। ফ্রান্সের তৃতীয় বৃহত্তম শহর লিওঁতে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাসের শেল ফাটায় পুলিশ।
২০১৮ সালের নভেম্বরে ফ্রান্সে জ্বালানির কর বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রতিবাদে এক স্বতঃস্ফূর্ত গণ-আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। ফরাসি ট্র্যাফিক আইন অনুযায়ী চালকদের গাড়িতে বাধ্যতামূলক ভাবে যে হলুদ রঙের রিফ্লেক্টিভ জ্যাকেট বা ভেস্ট রাখতে হয়, মূলত সেটি পরেই রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ দেখিয়েছিলেন সাধারণ মানুষ। সেই থেকেই এই প্রতিবাদের নাম হয় ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলন। মাকরঁ সরকারের আর্থিক নীতির বিরুদ্ধে সেই সময়ের ব্যাপক জনরোষের স্মৃতিকেই বর্তমান বিক্ষোভে ফের উস্কে দিতে চাইছেন আন্দোলনকারীরা।
গত সপ্তাহে প্যারিস, লিয়ঁ, মার্সেই-সহ একাধিক শহরে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের খণ্ডযুদ্ধের ঘটনায় অন্তত ২,৪০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়। ওই বিক্ষোভ চলাকালীন প্রায় ৩,০০০ দোকান ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও লুঠপাট চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে ‘ফেডারেশন অফ ট্রেড অ্যান্ড রিটেল’। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে প্যারিসের একাধিক বিলাসবহুল বুটিক এবং মার্সেই শহরের ‘অলিম্পিক দে মার্সেই’ ফুটবল ক্লাবের অফিশিয়াল স্টোরও রয়েছে। হিংসার আঁচ গিয়ে পড়ে সরকারি ভবনেও । মধ্য ফ্রান্সের লিমোজ় শহরে উনিশ শতকে তৈরি ঐতিহাসিক পুরভবনে (সিটি হল) আগুন ধরিয়ে দেন বিক্ষোভকারীরা। আগুনে ছাদ ধসে পড়ে ভবনটি প্রায় ধ্বংসের মুখে।
ফরাসি প্রশাসনের সামনে এখন অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হল জনরোষের প্রকৃত কারণগুলি অনুধাবন করে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের থেকে সুবিধাবাদী লুটেরাদের আলাদা করা। বিপুল সরকারি ঋণের বোঝা এবং আর্থিক দুরবস্থার মধ্যে এই ধারাবাহিক বিক্ষোভ ২০২৭ সালের আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে মাকরঁ সরকারের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে।
