শারদীয় দুর্গোৎসবকে ঘিরে নীলফামারীর ডিমলায় চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। কোথাও প্রতিমায় রং-তুলির শেষ আঁচড়, কোথাও চলছে মণ্ডপ সাজানো ও আলোকসজ্জার কাজ।
শিল্পীদের নিপুণ হাতে মাটির প্রতিমায় ফুটে উঠছে দেবী দুর্গার রূপ। উৎসবকে ঘিরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে বিরাজ করছে আনন্দ-উচ্ছ্বাস। অন্যদিকে, পূজা নির্বিঘ্নে উদযাপন এবং ভক্ত ও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ প্রস্তুতি নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ। এবার উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের ৭৮টি পূজামণ্ডপে চার স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসব উদযাপিত হবে।
উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এবার ডিমলায় ৭৮টি মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় একটি বেশি। ইউনিয়নভিত্তিক হিসাবে ডিমলা সদর ইউনিয়নে ২২টি, পশ্চিম ছাতনাইয়ে দুটি, বালাপাড়ায় নয়টি, খগাখড়িবাড়ীতে ছয়টি, গয়াবাড়ীতে ১০টি, নাউতারায় ১০টি, খালিশা চাপানিতে ১৩টি, ঝুনাগাছ চাপানিতে পাঁচটি এবং টেপাখড়িবাড়ীতে একটি মণ্ডপ রয়েছে। পূর্ব ছাতনাই ইউনিয়নে সনাতন ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা কম হওয়ায় সেখানে কোনো পূজামণ্ডপ নেই।
পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং দর্শনার্থীদের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন পদক্ষেপ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি মণ্ডপ কমিটির স্বেচ্ছাসেবকেরাও দায়িত্ব পালন করবেন। ঝুঁকিপূর্ণ মণ্ডপগুলোতে বিশেষ নজরদারির পাশাপাশি সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে থাকবে মনিটরিং সেল।
উপজেলা প্রশাসনের তদারকিতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় প্রতিটি পূজামণ্ডপের জন্য ৬০০ কেজি করে চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পূজা শুরুর আগেই এসব চাল মণ্ডপ কমিটির কাছে হস্তান্তরের কথা রয়েছে।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিমাশিল্পীরা খড়, বাঁশ, সুতলি ও কাদামাটি দিয়ে প্রতিমার কাঠামো তৈরির পর রং-তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তুলছেন দেবী দুর্গার প্রতিচ্ছবি। দেবীর পাশাপাশি তৈরি করা হচ্ছে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ ও অসুরের প্রতিমা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগর ও আয়োজকেরা। প্রতিমা তৈরির পাশাপাশি মণ্ডপ সাজানো, আলোকসজ্জা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজও চলছে।
আয়োজকেরা জানান, উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি, আর্থিক সংকট ও দক্ষ কারিগরের অভাবে অনেক মণ্ডপে প্রতিমা তৈরিতে সমস্যা হচ্ছে। এ কারণে নীলফামারী, দিনাজপুর, পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও জেলা থেকেও কেউ কেউ প্রতিমা সংগ্রহ করেছেন। একটি প্রতিমা তৈরি করতে প্রায় এক থেকে দেড় মাস সময় লাগে। তাই সামর্থ্য অনুযায়ী প্রতিমা সংগ্রহ ও মণ্ডপ সাজানোর কাজ করছেন তাঁরা।
ডিমলা সদরের বাবুরহাট কেন্দ্রীয় সর্বজনীন দুর্গাপূজা মণ্ডপের সভাপতি অনিল চন্দ্র রায় বলেন, তাঁদের মণ্ডপে প্রতিমা তৈরি ও সাজসজ্জার কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ভক্ত ও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে নির্বিঘ্নে পূজা উদযাপনে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
গয়াবাড়ী ইউনিয়নের শুটিবাড়ি বাজার সর্বজনীন দুর্গামণ্ডপের সভাপতি ভোলানাথ রায় বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ মন্দির ও মণ্ডপ চিহ্নিত করে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, মনিটরিং সেল চালু এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশেষ মোবাইল টিমের মাধ্যমে টহল জোরদার করা উচিত।
নাউতারা ইউনিয়নের নাউতারা বাজার সর্বজনীন দুর্গাপূজা মণ্ডপের সাধারণ সম্পাদক অনল কুমার রায় বলেন, প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসীর সহযোগিতায় এবারও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পূজা উদযাপিত হবে বলে তাঁরা আশাবাদী।
ডিমলা উপজেলা হিন্দু, বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান কল্যাণ ফ্রন্টের আহ্বায়ক উৎপলকান্তি সিং বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজা উদযাপিত হয়ে আসছে। উপজেলা প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসীর সহযোগিতায় এবারও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পূজা উদযাপিত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সংগঠনটির সদস্যসচিব জ্যোতি রঞ্জন রায় জানান, এবার ডিমলা উপজেলায় ৭৮টি মণ্ডপে দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গত বছরের তুলনায় এবার মণ্ডপের সংখ্যা বেড়েছে একটি।
জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সাবেক সদস্য ও ডিমলা উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম রব্বানী প্রধান বলেন, শারদীয় দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপনে প্রশাসনের পাশাপাশি রাজনৈতিক দল, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা যাতে নির্বিঘ্নে তাঁদের ধর্মীয় উৎসব উদযাপন করতে পারেন, সে জন্য সবাইকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।
ডিমলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশরাফুল ইসলাম বলেন, শারদীয় দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপনে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। চার স্তরের নিরাপত্তার পাশাপাশি পূজামণ্ডপ কমিটির স্বেচ্ছাসেবকেরাও দায়িত্ব পালন করবেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইমরানুজ্জামান বলেন, পূজামণ্ডপগুলোতে পুলিশ, আনসার-ভিডিপি, বিজিবি ও এসআরবি সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। ট্যাগ কর্মকর্তাদের মাধ্যমে মণ্ডপগুলো পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি সার্বিক পরিস্থিতি নজরদারিতে থাকবে মনিটরিং সেল। এ ছাড়া ‘দুর্গাপূজা পরিচালনা টিম-২০২৬’ নামে একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খোলা হয়েছে। পূজাসংক্রান্ত কোনো সমস্যা বা অভিযোগ পাওয়া গেলে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পূজার সূচি অনুযায়ী, ১০ অক্টোবর শুভ মহালয়ার মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজার ক্ষণগণনা শুরু হয়েছে। আগামী ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হবে দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা। এরপর ঢাকের বাদ্য, কাঁসর ও উলুধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠবে পূজামণ্ডপগুলো। ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে পাঁচ দিনের এ উৎসব।
The post রং-তুলিতে দেবী দুর্গার রূপ, ডিমলায় ৭৮ মণ্ডপে উৎসবের প্রস্তুতি appeared first on Dhaka Protidin.
