কওমি মাদরাসায় ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষা একই ক্যাম্পাসে দরসে নেজামি, স্কুল-কলেজ ও বিজ্ঞানচর্চা; সুন্নাহভিত্তিক জীবনাচরণের সঙ্গে আধুনিক জ্ঞানের সমন্বয়
পড়নে সাদা জুব্বা, মাথায় সাদা পাগড়ি। হাতে বিজ্ঞানের বই, সামনে কম্পিউটার। কেউ ব্যস্ত বিজ্ঞানাগারে পরীক্ষা-নিরীক্ষায়, কেউ শিখছে তথ্যপ্রযুক্তি ও কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের প্রাথমিক ধারণা। আবার দিনের নির্দিষ্ট সময়ে তারা বসছে কোরআন-হাদিস, ফিকহ ও আরবি ভাষার পাঠে। শেষ রাতে তাহাজ্জুদ, নিয়মিত নামাজ ও সুন্নাহভিত্তিক জীবনাচরণও তাদের শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ধর্মীয় অনুশীলন, আধুনিক বিজ্ঞানচর্চা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনের এমন সমন্বিত চিত্র দেখা যাচ্ছে রাজধানীর তুষারধারায় অবস্থিত জামেয়া কাশিফুল উলূম ঢাকায়।
প্রচলিত কওমি মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থায় কোরআন-হাদিস, ফিকহ, আরবি ভাষা ও ইসলামী জ্ঞানচর্চা প্রধান বিষয়। এর পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার সুযোগ প্রতিষ্ঠানভেদে ভিন্ন হয়ে থাকে। সময়ের পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ধর্মীয় শিক্ষার মূল ধারা বজায় রেখে সাধারণ ও ব্যবহারিক জ্ঞানচর্চার সুযোগ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে জামেয়া কাশিফুল উলূম ঢাকা।
প্রতিষ্ঠানটিতে দরসে নেজামির পাশাপাশি স্কুল ও কলেজের পাঠ্যক্রম চালু রয়েছে। শিক্ষার্থীরা কওমি মাদরাসার নিয়মিত পড়াশোনার সঙ্গে সাধারণ শিক্ষার বিজ্ঞান বিভাগেও অধ্যয়ন করছে এবং এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। একই শিক্ষাজীবনে ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) এবং অন্যান্য সাধারণ বিষয়ে পাঠ গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে তারা। প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রমে দিনের বেলায় মাদরাসার নিয়মিত পাঠদান এবং রাতে স্কুল ও কলেজ বিভাগের ক্লাস পরিচালনার ব্যবস্থা রয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
জামেয়া কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর প্রতিষ্ঠানটির এসএসসি পরীক্ষার্থীরা শতভাগ পাস করেছে। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি জাতীয় শিক্ষাক্রম অনুসরণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার পথ সম্প্রসারণ এবং ভবিষ্যতের জন্য বহুমুখী যোগ্যতা তৈরির লক্ষ্য নিয়ে এ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহারিক শিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠানটিতে রয়েছে সায়েন্স ল্যাব ও কম্পিউটার ল্যাব। শিক্ষার্থীদের কম্পিউটার গ্রাফিকস ডিজাইন, আউটসোর্সিং, ডিজিটাল মার্কেটিং ও ভিডিও এডিটিংয়ের মতো বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পাশাপাশি লাইটিং ও ক্যামেরা পরিচালনা, ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিকসের ব্যবহারিক শিক্ষার ব্যবস্থাও রয়েছে। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও কর্মমুখী দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রেও রয়েছে বিশেষ গুরুত্ব। আরবি ভাষায় দক্ষতা অর্জনের জন্য মাদানী নেসাবের আলোকে বলা, পড়া ও লেখার অনুশীলন করানো হয়। আরবি কথোপকথনের পাশাপাশি ইংরেজি ভাষায় যোগাযোগের দক্ষতা বাড়াতে চালু রয়েছে ইংলিশ ল্যাংগুয়েজ ক্লাব। ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি দেশ-বিদেশের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ এবং ভবিষ্যতের উচ্চশিক্ষায় ভাষাগত সক্ষমতা তৈরিকে এসব কার্যক্রমের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে দেখছে প্রতিষ্ঠানটি।
পাঠ্যবইয়ের বাইরেও শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, নেতৃত্ব ও সামাজিক দায়িত্ববোধ বিকাশের জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়। শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে বাংলা ও আরবি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করা হয়। রয়েছে আর্টস ও ক্যালিগ্রাফি বিভাগ। শারীরিক সক্ষমতা বাড়াতে মার্শাল আর্টসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও পরিচালিত হয়।
সামাজিক দায়িত্ববোধ তৈরির অংশ হিসেবে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন মানবিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, সপ্তাহে একদিন পথশিশুদের জন্য খাবার রান্না করা হয়। ‘পথশিশুদের মক্তব’ কর্মসূচির মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের খাবার দেওয়ার পাশাপাশি ইসলামের প্রাথমিক শিক্ষাও দেওয়া হয়। জাতীয় দিবস পালন এবং পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমেও শিক্ষার্থীরা অংশ নেয়। এসবের পাশাপাশি আমল-আখলাক, সুন্নাহর অনুসরণ ও দাওয়াহভিত্তিক কার্যক্রমকে শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
জামেয়া কাশিফুল উলূম ঢাকার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে কওমি মাদরাসার সিলেবাস ও কারিকুলাম নিয়ে কাজ করছেন বলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তাঁর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এ জামিয়ায় ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে সাধারণ শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কারিগরি প্রশিক্ষণ যুক্ত করা হয়েছে।
সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ কালবেলাকে বলেন, ‘একটি মুসলিম দেশের নতুন প্রজন্মকে কোরআন ও হাদিসের শিক্ষার পাশাপাশি জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও আধুনিক মননচর্চায় দক্ষ করে গড়ে তোলা সময়ের দাবি। আমরা এমন শিক্ষার্থী তৈরি করতে চাই, যারা দ্বীনের জ্ঞান ধারণের পাশাপাশি আধুনিক বিশ্ব সম্পর্কে জানবে এবং দেশ ও সমাজের জন্য কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের শুধু সনদনির্ভর শিক্ষায় সীমাবদ্ধ রাখতে চাই না। তারা যেন জ্ঞান, চরিত্র ও দক্ষতায় সমৃদ্ধ হয় এবং ভবিষ্যতে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে, আমাদের শিক্ষা পরিকল্পনায় বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।’

