নাগরিকদের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিশ্বের অন্যতম বিস্তৃত কল্যাণব্যবস্থা গড়ে তুলেছে ফ্রান্স। তবে ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণ, পেনশন ব্যয় ও বাজেট ঘাটতির কারণে এই ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সামাজিক সুবিধা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি সরকারি অর্থের ভারসাম্য রক্ষা করা এখন দেশটির নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফ্রান্সের জাতীয় পরিসংখ্যান ও অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটির বাজেট ঘাটতি মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়ায়। একই সময়ে সরকারি ঋণের পরিমাণ বেড়ে জিডিপির ১১৫ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছায়। ঋণের এই উচ্চ হার ভবিষ্যতে সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।
সরকারি ব্যয়ের বড় একটি অংশ পেনশন পরিশোধে চলে যাওয়ায় অন্যান্য খাতেও চাপ বাড়ছে। রয়টার্সের ১৩ অক্টোবর ২০২৬-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্রান্সের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাজেটের ৩২ শতাংশ, অর্থাৎ ২৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ইউরো, সরকারি কর্মচারীদের পেনশন তহবিলে ব্যয় হয়। ফলে শিক্ষা খাতের অন্যান্য কার্যক্রম এবং জনসেবার উন্নয়নে অর্থ বরাদ্দের সুযোগ সীমিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা, বেকারভাতা, পারিবারিক সহায়তা এবং অবসরকালীন আর্থিক নিরাপত্তা ফ্রান্সের কল্যাণরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এসব সুবিধার মাধ্যমে নাগরিকদের জীবনমান ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়। কিন্তু জনসংখ্যার বার্ধক্য, অবসরপ্রাপ্ত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং সামাজিক খাতে ব্যয় বাড়তে থাকায় বিদ্যমান ব্যবস্থার অর্থায়ন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
রয়টার্সের ১৫ জুলাই প্রকাশিত প্রতিবেদনে উদ্ধৃত পূর্বাভাস অনুযায়ী, কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ২০৩০ সালে ফ্রান্সের বাজেট ঘাটতি জিডিপির প্রায় ৭ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। একই সময়ে সরকারি ঋণ জিডিপির ১৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। তবে এগুলো সম্ভাব্য পরিস্থিতির পূর্বাভাস, নিশ্চিত ফলাফল নয়। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, উৎপাদনশীলতা উন্নয়ন, সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা নিশ্চিত করা এবং পেনশন ব্যবস্থার সংস্কারকে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সরকারি অর্থের অপচয় কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনা জোরদার করার প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে।
তবে পেনশন বা অন্যান্য সামাজিক সুবিধা কমানোর উদ্যোগ রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। ফ্রান্সে সামাজিক অধিকার ও কল্যাণমূলক সুবিধা নাগরিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়ায় এসব ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা নীতিনির্ধারকদের জন্য সহজ হবে না। সব মিলিয়ে ফ্রান্সের সামনে এখন দুটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য—নাগরিকদের সামাজিক সুরক্ষা বজায় রাখা এবং সরকারি ঋণ ও বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে আনা। এই দুইয়ের মধ্যে কার্যকর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানো এবং সামাজিক ব্যয়ের টেকসই অর্থায়ন নিশ্চিত করার ওপরই দেশটির কল্যাণরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করবে।
The post ঋণ ও পেনশন ব্যয়ের চাপে ফ্রান্সের কল্যাণরাষ্ট্র, বাড়ছে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ appeared first on ভোরের চেতনা.