সাহিত্যের পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা সেই গভীর আবেগ, টানাপড়েন আর ভালোবাসার মোড়কে রইল এমন ৬ উপন্যাসের গল্প, যা ছুঁয়ে যাবে আপনার ভিতরের মানুষটাকে।

৬ উপন্যাসছবি : এআই
বই শুধু পাতার সমষ্টি নয়, বই মানে একেকটা জীবন্ত অনুভূতি, বুকের ভিতর জমিয়ে রাখা চাপা দীর্ঘশ্বাস আর না বলা কথার ভিড়। কখনও ইতিহাসের চেনা পথ ছেড়ে অচেনা রোমহর্ষক উজানযাত্রায় গা ভাসাতে ইচ্ছে করে, কখনও বা শহরের কোলাহলে হারিয়ে যাওয়া একটা খেয়ালি কলোনির রোজনামচা ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করে। সাহিত্যের পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা সেই গভীর আবেগ, টানাপড়েন আর ভালোবাসার মোড়কে রইল এমন ৬টি উপন্যাসের গল্প, যা ছুঁয়ে যাবে আপনার ভিতরের মানুষটাকে।
অনুপ্রবেশ — তৃষ্ণা বসাকছবি : সংগৃহীত।
কখন যে সন্তর্পণে বর্তমানের শরীরে ঘটে যায় অতীতের অনুপ্রবেশ, তা হয়তো কেউ টেরই পায় না। কখনও উত্তাল হাংরি আন্দোলনের হাওয়া, কখনও বিদ্যাপতির মিথিলার কাজলকালো মেঘ, রাধার অনন্ত অভিসার, আবার কখনও সীতার অন্তহীন নিষ্ক্রমণ — কত না স্তরের ইতিহাস এসে ভিড় করে আমাদের এই সমসময়ে। এই দ্বান্দ্বিক মেলবন্ধনে গড়া কাহিনি কি আদতে কোনও থ্রিলার, নাকি ইতিহাসের এক অন্যরকম উজানযাত্রা? আর তার রুদ্ধশ্বাস পাতার ফাঁকে ফাঁকে নারী-নারীতে বা পুরুষে-পুরুষে সমপ্রেমের আদিম আকুতি কিংবা ইতিহাস-বিদিত নানা যৌনতা আমাদের মনে বারবার জাগিয়ে তোলে পুরোনো সব প্রশ্ন।
অদৃশ্য জনপদ — মৃত্তিকা মাইতিছবি : সংগৃহীত।
শহরের গায়ে যেন একটা পুরোনো আঁচিলের মতো লেপ্টে থাকা একসময়ের উদ্বাস্তু কলোনি। সময়ের হাত ধরে যার ভিতর-বাইরে ঘটেছে কত না বদল। এখানেই তাপস নামের এক সরল-সোজা ছেলে বাড়ি বাড়ি ডিম বিক্রি করে বেড়ায়। আর তার সেই স্নিগ্ধ চোখে ভেসে ওঠে একেকটা পরিবারের না বলা কষ্ট, সময়ের রূঢ় রূপান্তর আর রাজনীতির মারপ্যাঁচ। একদিকে মন্দিরে ঘণ্টার ধ্বনি, মসজিদে আজান, আর গাছে গাছে কাঠবেড়ালির লুকোচুরি, অন্যদিকে গাছ কেটে, কুয়ো বুজিয়ে ঘরবাড়ি বানানোর নিষ্ঠুর প্রতিযোগিতা। কর্পোরেশনের জল নিয়ে ঝগড়াঝাটি, পারুল ও শেখরের ঘড়ি ধরে সময় মেলানোর নিখাদ চেষ্টা, আর ক্লাবের ছেলেদের আধা-মস্তান হয়ে দাপিয়ে বেড়ানো। কালী বাজারে চায়ের দোকান সামলানোর ফাঁকে তাপসের মনেও জড়িয়ে থাকে এক অদ্ভুত মায়াময় সম্পর্ক। ভণ্ডুলে ও তার দলবল শিস দিয়ে পায়রা ওড়ায়, আর বৃদ্ধ শান্তিরঞ্জন যেন কোনও বাতিল মানুষের মতো আচ্ছন্ন থাকেন স্মৃতির গভীর গভীরে। সাতচল্লিশের দেশভাগের ক্ষত বয়ে বেড়ানো মানুষগুলো আজও দিশেহারা — আসলে কোনটা তাদের নিজের দেশ? জনপদ আজও খুঁজে ফেরে তার উত্তর।
পাক সার জমিন সাদ বাদ — হুমায়ুন আজাদছবি : সংগৃহীত।
ষাটের দশকে বাংলাদেশ তখন এক পরাধীন উপনিবেশ। চারিদিকে সামরিক শাসনের বুটজুতোর শব্দ, আর উর্দু গানের রেশে ক্ষতবিক্ষত হতে থাকে মানুষের কান। ১৯৭১ সালের এক রক্তক্ষয়ী মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ — আমাদের অহংকার। কিন্তু কে জানত, সেই জয়ের আনন্দ ছাপিয়ে অন্ধ প্রতিক্রিয়াশীল অন্ধকারের শক্তিগুলো আবার টেনে নিয়ে যেতে চাইবে মধ্যযুগের সেই অন্ধকার গহ্বরে? বাঙলাদেশকে করে তুলতে চাইবে এক অপপাকিস্তান। দিকে দিকে মৌলবাদের সেই হিংস্র রূপ, ত্রাস আর আতঙ্কের এক ভয়ঙ্কর ছবি নিপুণ শিল্পিত আবেশে ফুটিয়ে তুলেছেন হুমায়ুন আজাদ। ২০০৩ সালে প্রথম প্রকাশের পরই প্রগতিশীল মন একে স্বাগত জানালেও মৌলবাদীরা নেমে আসে হিংস্র আক্রমণে। এ কেবল এক উপন্যাস নয়, এ আমাদেরই ঘুরে দাঁড়ানোর এক রক্তাক্ত দলিল।
কেউ কেউ কথা রাখে — মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিনছবি : সংগৃহীত।
অস্থির আর ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ এক সময়ে ঘটে যাওয়া এক নির্মম খুনের রহস্য ভেদ করতে নামে দুই ভিন্ন স্বভাবের মানুষ। অনেক কষ্টে এক সন্দেহভাজনকে জালে জড়ানো গেলেও খুনের আসল জট কিছুতেই খোলে না। আর এই একটিমাত্র ঘটনা বদলে দেয় সেই তদন্তকারী দুই মানুষ-সহ আরও অনেকের জীবন। কেটে যায় দুই যুগ। স্মৃতিতে ভারাক্রান্ত এক লেখক হঠাৎ এসে দাঁড়ান সেই অমীমাংসিত অতীতের মুখোমুখি। সামনে এসে দাঁড়ায় বুক কাঁপানো এক সত্য। কিন্তু সেই বিস্ময়কর সত্য জানার পরেও তিনি পড়ে যান এক কঠিন সঙ্কটের মুখে। শেষ পর্যন্ত সেই সত্য প্রকাশের ভার তাকে ছেড়ে দিতে হয় নির্বাক প্রকৃতিরই করুণার উপর।
দেয়াল — হুমায়ূন আহমেদছবি : সংগৃহীত।
ভাদ্র মাসের এক পড়ন্ত বিকেল। আকাশে জমে আছে মেঘের দল — লালচে, খয়েরি, হলুদের এক অপূর্ব আলো-আঁধারি খেলা, যে মেঘে বৃষ্টি নামে না, শুধু মায়াকান্না ঝরে। এমন এক সিদ্ধান্ত না নেওয়ার আবহ দিয়েই শুরু হয়েছিল হুমায়ূন আহমেদের জীবনের শেষ কালজয়ী উপন্যাস ‘দেয়াল’। সদ্য স্বাধীন হওয়া এক জাতির ভাগ্যাকাশের চরম অনিশ্চয়তা আর টানাপড়েনকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এর ক্যানভাসে। কিছু চরিত্র একেবারে রক্তমাংসের মানুষের মতো বাস্তব, নাম-ধাম ও ইতিহাস থেকে তুলে আনা; আবার কিছু চরিত্র লেখকের তুলিতে গড়া কাল্পনিক। এতসব ঘটনার ঘনঘটার মাঝেও একটুও মলিন হয়নি জীবনের আসল সৌন্দর্য আর পরম সত্যের সন্ধান। ইতিহাস আর কল্পনার বুননে এটি এক বুকভরা দীর্ঘশ্বাসের উপাখ্যান।
শেষ প্রশ্ন — শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ছবি : সংগৃহীত।
শরৎচন্দ্রের সবথেকে সাহসী এবং মননশীল সৃষ্টিগুলোর একটি এই উপন্যাস। প্রকাশিত হওয়ার পরই রক্ষণশীল সমাজের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল এটি, কুড়িয়েছিল সমালোচকদের কটাক্ষ, কিন্তু সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে স্বাধীনচেতা নারীদের অন্তরে গভীর জায়গা করে নিয়েছিল। উপন্যাসের মূল চরিত্র কমল — সে কালের তুলনায় বড্ড বেপরোয়া, বড্ড অন্যরকম। সে একা একা ঘুরে বেড়ায়, নিজের শর্তে জীবন বাঁচে, বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে স্বাধীন সম্পর্ক রাখে এবং বুক ফুলিয়ে দারিদ্র্য ও সমাজের চোখ রাঙানির মুখোমুখি দাঁড়ায়। সমস্ত প্রথার খাঁচা ভেঙে সে কথা বলে মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার। আগ্রার সেই প্রবাসী বাঙালি সমাজের পটভূমিতে কমল যেন আজও এক বিদ্রোহের নাম।
